কিংবদন্তী রাজনীতিক মহিউদ্দিন চৌধুরী

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

বৃহস্পতিবার দুপুর তিনটায় ম্যাক্স হাসপাতালে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে আমার শেষ কথা হয়। তখন তিনি হাসি মুখে ছিলেন। আমাকে তিনি উনার জন্য দোয়া করতে বললেন। আমি বললাম, ‘আমাদের জন্যও দোয়া করবেন। এ কথা বলার পর দেখলাম, উনার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমি উনাকে বললাম, আপনাকে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। তিনি বললেন, ‘‘খেতে ইচ্ছে করছে না।’’
এর আগে সিঙ্গাপুর থেকে আনার পর মহিউদ্দিন চৌধুরীকে যখন ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো, হাসপাতালের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও আমি ফুল নিয়ে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমি উনার সাথে ছবি তুললাম। উনি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। আমি তাকে হাসতে বললাম। উনি হাসলেন; প্রায় এক মিনিট ধরে- এক অসাধারণ হাসি। আমি তাকে বললাম, আপনি না থাকলে আমি ছবি তুলবো কার সাথে?
মহিউদ্দিন চৌধুরীর চিন্তা-চেতনায় ছিল চট্টগ্রামের উন্নয়ন। শিক্ষকদেরকে তিনি খুব সম্মান করতেন। মর্যাদা দিতেন। স্যার বলে ডাকতেন। শিক্ষকদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন।
আমি মনে করি, শুধু চট্টগ্রাম নয়; সমগ্র বাংলাদেশের কিংবদন্তী রাজনীতিক ছিলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে পরিপুষ্ট এবং পরিপূর্ণ একজন দেশপ্রেমিক, গণমানুষ তথা মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন তিনি। তৃণমূল পর্যায়ের একজন কর্মী থেকে উনি নিজের সমস্ত কর্মকাণ্ড দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু নেতাই নন, উনি চট্টলবীর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
আমি প্রত্যক্ষভাবে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় নিহত মানুষের দুর্গন্ধে ভরা পচা লাশগুলো দাফন করতে দেখেছি। আর যারা বেঁচে ছিলেন, হাসপাতালে জায়গা পাচ্ছিল না, তাদের চিকিৎসার জন্য উনি মুসলিম ইনস্টিটিউটে এক বিরাট হাসপাতাল করে ফেলেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. আবু ইউসুফ আলম ও আমি নিয়মিত সেখানে গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে দেখেছি, উনি নিজ হাতে ডায়েরিয়া রোগীদের সেবা দিয়ে সুস’ করে তুলছেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- নিগৃহীত ও ঘৃণার চোখে দেখা মেথর বা হরিজন সম্প্রদায়কে অফিসিয়াল গেজেটের মাধ্যমে উনি সেবক নামে ভূষিত করে মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন। বান্ডেলরোড, মাদারবাড়ি, ফিরিঙ্গীবাজার ও ঝাউতলা মেথরপট্টিকে উনি সেবক কলোনি নাম দিয়েছেন। তাদের জন্য প্রাথমিক ও নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। পূজা-পার্বণ ও বিবাহ অনুষ্ঠানে উনি সেবকদের সাথে বসে খেতেন।
চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন যেন পরিকল্পিতভাবে হয়, সে জন্য মহিউদ্দিন চৌধুরী আমাদেরকে সাথে নিয়ে নগরীর জনসংখ্যা জরিপ করেছিলেন। ছয়টি সংবাদপত্রে নগরীর রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, জনসংখ্যার তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছিলেন। উনি চসিকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, শিক্ষা কার্যক্রম ও বিনামূল্যে বিদ্যুৎ বিতরণের কাজ করেছেন। ছয় মাস আগে একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে একটি শক্ত অবস’ানে দাঁড় করেছিলেন।’’
মহিউদ্দিন চৌধুরী শেখ হাসিনার আস’াভাজন ছিলেন এবং তারই নির্দেশনায় কাজ করতেন। বর্তমানে কিছু চক্র দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে, এর মধ্যে মহিউদ্দিন চৌধুরীর না ফেরার দেশে চলে যাওয়া, আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। বাস্তবতার কঠিন নির্মমতায় চট্টগ্রামবাসী তাদের একজন অভিভাবককে হারালো।
অনুলিখন: মোহাম্মদ আলী