জনবল নিয়োগ কার্যক্রম

কালোবিড়ালের থাবামুক্ত হচ্ছে না রেলওয়ে

ভূঁইয়া নজরুল

কালো বিড়ালের থাবা থেকে মুক্ত হচ্ছে না রেলওয়ের জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া। চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তদবিরের সাথে সাথে চলছে ঘুষ লেনদেনের অফার। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির একেকটি পদে নিয়োগে ঘুষের পারদ উঠছে চার থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত। আর নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে সরগরম রেলওয়ে অঙ্গন। সাধারণ, পোষ্য, মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী সকল কোটাতেই এই ঘুষ বাণিজ্যের দৌড় রয়েছে।
ঘুষের কথা স্বীকার না করলেও তদবিরে অতিষ্ঠ রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক গতরাতে সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশের মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, সাংবাদিক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এমন কেউ বাকি নেই যে রেলে চাকরির জন্য তদবির করছে না। সবাই তালিকা পাঠাচ্ছে।’
যারা তদবির করে তাদের কি জবাব দেন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আপনাদের ডিও লেটার আমি নিয়োগ কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেবো। আর কোনো একটি পদে লোক নিয়োগ দেবো ১০০ জন কিন’ তদবির করে প্রায় দুই থেকে তিন হাজারের বেশি। অপরদিকে পরীক্ষা দেয় ২০ থেকে ৩০ হাজার। সম্প্রতি রেলের বুকিং সহকারী পদে ১৩২টি পদের বিপরীতে পরীক্ষা দিয়েছে ৮২ হাজার প্রার্থী। আর তাদের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৩০৩ জন।’
কিন’ অভিযোগ রয়েছে ৮২ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩০৩ জন বাছাই করতে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যাদের নাম তালিকায় ছিল শুধু তাদের পাস করানো হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার্থী বেশি হলেও যদি তারা পরীক্ষার খাতায় পাস করার মতো উত্তর না লেখেন তাহলে কিভাবে হবে।’
তদবিরের যেসব তালিকা আপনার কাছে জমা হচ্ছে সেসব তালিকা কি করেন জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি সব তালিকা নিয়োগ কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেই। নিয়োগ কমিটি জেলা কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা কিংবা পোষ্য কোটা বিবেচনা করে নিয়োগ দিয়ে থাকে। নিয়োগ বিধিসম্মত হচ্ছে কিনা এর দায়দায়িত্ব নিয়োগ কমিটির।’
এ বিষয়ে পূর্বাঞ্চলী রেলওয়ের একাধিক নিয়োগ কমিটির আহবায়কের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, নিয়োগ নিয়ে তারা মূলতঃ ভয়ের মধ্যে আছেন। যেসব পদে কম লোক নেওয়া হবে সেসবের চাইতে যেগুলোতে বেশি লোক নেয়া হবে সেগুলোতে বেশি চাপ। অনেকেই তদবির করছে। আর এই তদবিরের সাথে চলছে ঘুষ বাণিজ্য। ২০১১ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সময়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ আলী মৃধার মাধ্যমে একেকটি পদে নিয়োগের জন্য তিন থেকে চার লাখ টাকা করে নেয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন পে স্কেলের কারণে বেতন বেড়ে যাওয়ায় তদবিরে ঘুষের টাকার ফি বেড়ে গিয়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখে ঠেকেছে।
রেলে জনবল নিয়োগ রেল মন্ত্রীর কাছে তালিকা দেওয়ার কথা স্বীকার করে রেলওয়ে শ্রমিক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান আকন্দ বলেন, ‘রাজনীতি করার করণে আমাদের দলের সাথে যারা রয়েছে তাদের ছেলে-মেয়েদের পোষ্য কোটায় চাকরির জন্য তালিকা মন্ত্রীর কাছে দিয়ে থাকি। কিন’ অনেক সময়ে আমাদের সুপারিশ মন্ত্রী রাখেন না। তবে ওয়েম্যান ও খালাসি পদে বেশি লোক নিবে বলে সেগুলোতে তদবির বেশি হবে।’
বুকিং সহকারী নিয়োগ পরীক্ষায় ৮২ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩০৩ জন কিভাবে পাস করলো সেই প্রশ্ন রেখে হাবিবুর রহমান আকন্দ বলেন, ‘অনেকের মতো আমারো এই পাস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুনেছি ৬০ নম্বরের পরীক্ষায় যারা ৩০ পেয়েছে তাদের পাস করানো হয়েছে।’
আগে থেকে পাসকৃতদের নম্বর মনোনীত করে রেখেছিল বলে অনেকের অভিযোগ রয়েছে বলে একাধিক রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান। এ বিষয়ে রেলওয়ে সংগ্রাম পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সমন্বয়কারী মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘রেলের তালিকায় যারা পাস করেছে তাদেরকে সেই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হলে অনেকেই পাস করবে না। অর্থাৎ ইউসুফ আলী মৃধার সময়ে রেলে জনবল নিয়োগের কেলেঙ্কারির কালোবিড়াল থেকে রেল এখনো মুক্ত হতে পারছে না।’
এদিকে ১৩২ জন বুকিং সহকারী নিয়োগ কমিটির আহবায়ক পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অতিরিক্ত চীফ অপারেটিং সুপারেনটেনডেন্ট শহীদুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সরকারি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। গত ৯ অক্টোবর এই পদের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয় এবং ২৯ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে।
জানা যায়, রেলে যেসব পদে লিখিত পরীক্ষা হচ্ছে সেসব পদের তুলনায় যেগুলোতে শুধু মৌখিক পরীক্ষা হচ্ছে সেগুলোতে অনিয়মের সুযোগ বেশি।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রেলে বর্তমানে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়েতে ট্রেন কন্ট্রোলার পদে ৫ জন, ড্রইং শিক্ষক পদে ৫ জন, সুইপার পদে ১২১ জন, মশালচি পদে ১০ জন, সুইপার পদে ১২১ জন, ক্লিনার পদে ৩৩ জন, ওয়েটিং রুম বেয়ারার পদে ১০ জন, নিরাপত্তা প্রহরী পদে ১১৯ জন, এএসআই ১৩ জন ও এসআই পদে ৫ জনের পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও নিয়োগ চূড়ান্ত হয়নি। অপরদিকে পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছে ৮৬৫ জন খালাসি ও ২৭০ জন সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া। অপরদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে ৭৪ জন এমএলএসএস, ৭০ জন পোর্টার, ১১১৩ জন ওয়েম্যান ও ১৩২ জন বুকিং সহকারী নিয়োগের পরীক্ষা শেষ হলেও এখনো চূড়ান্ত নিয়োগ তালিকা ঘোষণা করা হয়নি। ইতিমধ্যে শেষ হওয়া পদগুলো হলো গার্ড গ্রেড-২, পার্শ্বেল সহকারী, টাইম কিপার, গুডস সহকারী গ্রেড-২ ও খালাসি।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল নগদ ৭০ লাখ টাকাসহ সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের এপিএস ওমর ফারুক, পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের জিএম ইউসুফ আলী মৃধা ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট এনামুল হক বিজিবির হাতে ধরা পড়ার পর রেলের নিয়োগ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে তৎকালীন রেলওয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের এসব টাকা প্রমাণিত হওয়ার পর রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় মামলা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক মামলাও দায়ের হয়েছিল। সেই ঘটনায় উপরোক্ত তিনজনসহ আরো তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে রেল কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে নিয়োগ কার্যক্রমে অনিয়মের দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া জিএম ইউসুফ আলী মৃধা, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী যান্ত্রিক হাফিজুর রহমান ও সিনিয়র পার্সোনেল অফিসার গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন