৬ লেনের বহদ্দারহাট-কর্ণফুলী সেতু সংযোগ সড়ক

কার্যাদেশ দিতে মিললো কুয়েত সরকারের সম্মতি

ভূঁইয়া নজরুল
বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করতে বহদ্দারহাট এলাকার ভবনগুলো ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে-সুপ্রভাত
বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করতে বহদ্দারহাট এলাকার ভবনগুলো ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে-সুপ্রভাত

ছয় বছর অপেক্ষার পর অবশেষে শুরু হচ্ছে বহদ্দারহাট-কর্ণফুলী সেতু সংযোগ সড়কের ছয় লেনের নির্মাণ কাজ। সর্বনিম্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে দাতা হিসেবে কুয়েত সরকারের সম্মতিও পাওয়া গেছে। আগামী ১৮ জানুয়ারি সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদনের পর দেওয়া হবে ঠিকাদারের কার্যাদেশ।
২০১০ সালে চালু হওয়া কর্ণফুলী সেতুর উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে এই সংযোগ সড়কটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য টাকাও জমা রেখে দিয়েছিল কর্ণফুলী সেতুর দাতা কুয়েত সরকার।
বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত বিদ্যমান ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩০ ফুট চওড়া সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করতে ইতোমধ্যে বহদ্দারহাট এলাকার ভবনগুলো ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া সেতুর অন্যপার থেকে পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী সড়কের ওয়াই জংশন (মইজ্জারটেক) পর্যন্ত তিন কিলোমিটার সড়কটি হবে চার লেন।
প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী (সম্প্রতি বদলি হওয়া) রাশেদুল আলম বলেন, ‘আমরা সর্বনিম্ন ঠিকাদার শনাক্ত করে কুয়েত সরকারের অনুমোদনের জন্য চিঠি পাঠিয়েছিলাম। গত মাসে তা পেয়ে যাওয়ার পর আগামী ১৮ জানুয়ারি সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের কমিটির সভায় তা অনুমোদন হতে পারে। আর অনুমোদন হলেই আমরা ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দিতে আর কোনো বাধা থাকবে না।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে বহদ্দারহাট মোড় থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশের সব ভবন (প্রকল্পের আওতাধীন এলাকার) ভাঙার কাজ চলছে। এসব ভবন ও জায়গার ক্ষতিপূরণ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এক বছর আগেই মালিকদের পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে।’
গতকাল বিকালে বহদ্দারহাট মোড় এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কর্ণফুলী সেতুমুখী সড়কটির উভয়পাশে চলছে ভবন ভাঙার কাজ। কোথাও হ্যামার, আবার কোথাও স্কেভেটর দিয়ে চলছে ভবন ভাঙার কার্যক্রম। ভবন ভাঙার ঠিকাদার হিসেবে নিয়োজিত শেখ আহাম্মদ বলেন, ‘সওজ অধিদপ্তর থেকে একটি কোম্পানি সবগুলো ভবন ভাঙার জন্য নিলাম নিয়েছে। আমরা তাদের কাছ থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট হিসেবে কিছু ভবন ভাঙার কাজ নিয়েছি। সেগুলো ভাঙার কাজ চলছে। এ মাসের মধ্যে হয়তো ভবনগুলো ভাঙা হয়ে যাবে।’
বহদ্দারহাট এলাকার তাজ ভবনের পাশের একটি ভবনের নিচতলায় হার্ডওয়্যারের দোকান রয়েছে অপু দেবনাথের। তিনি বলেন, ‘গত ২০ ডিসেম্বর সব দোকানগুলোতে নোটিশ পাঠানো হয়েছে মালামাল খালি করার জন্য। আমরা নোটিশ পেয়েছি, ভবন ভাঙতে এলেই আমরা চলে যাবো।’
ভবন ভাঙায় নিয়োজিত শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনেক ভবন মালিক নিজ উদ্যোগে ভাঙছে, আবার কোথাও নিলামে পাওয়া ঠিকাদারের লোকজন ভাঙছে। মালিকরা নিজে কেন ভাঙছে -এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানায়, ঠিকাদার বুলডোজার বা স্কেভেটর দিয়ে ভাঙতে গেলে পুরো ভবনের ক্ষতি হবে, আর মালিক ভাঙলে যতটুকু ভাঙা দরকার ততটুকু ভাঙবে। এজন্য অনেক মালিক নিজ উদ্যোগে ভবন ভাঙার কাজ করছে।
এসময় কথা হয়, পাঁচতলা তাজ ভবনটির মালিক আমির হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমরা এক বছর আগেই ভবনের টাকা ও জায়গার টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়ে গেছি। গত এক বছর সওজ থেকে ভাঙতে না আসায় বোনাস হিসেবে ছিলাম। এখন ঠিকাদারের লোকজন নিজেরাই ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে।’
সওজ বিভাগের প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের ৩০৪ কোটি টাকার মধ্যে ২২৮ কোটি টাকা দেবে কুয়েত সরকার এবং ৭৬ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। মূল বাজেটের ৯৪ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ। বাকি টাকা উন্নয়ন বাবদ খরচ। আর এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত কোম্পানি মীর আখতার। এই কোম্পানিটি এর আগে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। মীর আখতারের সাথে কুয়েত ও চায়নার দুটি কোম্পানি যৌথভাবে ছয় লেনের এই সড়কটি নির্মাণের কার্যাদেশ পাচ্ছেন।
উন্নয়ন কাজের মধ্যে কী কী রয়েছে -জানতে চাইলে সওজ প্রকৌশলীরা জানান, বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী সেতু পর্যন্ত ৪টি ব্রিজ ও একটি কালভার্ট এবং তিনটি আন্ডারপাস হবে। রাহাত্তারপুল, কালামিয়া বাজার ও চাক্তাই রাজাখালি ব্রিজ এলাকায় আন্ডারপাস তিনটি নির্মিত হবে। এর মাধ্যমে উভয়পাশের রাস্তাগুলো আন্ডারপাস দিয়ে যুক্ত থাকবে। তবে ব্রিজের অন্যপ্রান্তে মইজ্জার টেক থেকে পরবর্তী তিন কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় সরাসরি চার লেন থাকবে। ছয় লেনের মধ্যে দুই পাশের চার লেন দিয়ে দ্রুতগামী যান চলাচল করবে। আর ফুটপাতের সাথে লাগোয়া দুই পাশের দুই লেন দিয়ে ধীরগতির গাড়ি চলাচল করবে।
প্রকৌশলীরা আরো জানান, শহর অংশের ছয় লেনের মধ্যে চারলেন হবে প্রধান সড়ক। আর দুই পাশে দুই লেনের দুটি সার্ভিস লেন থাকবে। বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রীর মহাসড়কের নতুন কনসেপ্ট অনুযায়ী প্রধান সড়কের পাশে একটি করে সার্ভিস লেন রাখা হবে রিকশা, অটোরিকশাসহ ছোটো আকারের যানবাহন চলাচলের জন্য। সেতুর অন্য অংশে এ ধরনের সার্ভিস লেন থাকবে না। সেখানে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় শুধু চার লেন হবে।
জানা যায়, কর্ণফুলী সেতু নির্মাণের পর কুয়েত ফান্ডের কিছু টাকা জমা ছিল। সেই টাকা কুয়েত সরকারের কাছে এতদিন ছিল। কর্ণফুলী সেতুর অ্যাপ্রোচ রোডের জন্য বরাদ্দ থাকা এই টাকাটি বাংলাদেশ সরকার রোড নির্মাণ না করা পর্যন্ত আনতে পারবে না। এজন্য রোড নির্মাণের কাজ শেষ করে স্লিপ জমা দিলেই কুয়েত ব্যাংক এই টাকা ছাড় দেবে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই টাকা ব্যবহারের সময় ছিল। পরবর্তীতে এর সময় বাড়ানো হয়।
২০১০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী সেতু উদ্বোধনের সময় থেকে এই সংযোগ সড়কটি নির্মাণের কথা বলা হচ্ছিল। ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণের পর তা অনেকটা বেমানানান হয়ে যায়। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার হচ্ছে চার লেনের। এক কিলোমিটারের যে স’ানে ফ্লাইওভারটি নেমেছে সেখানে রোডটি হলো দুই লেনের। তাই বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের সুবিধা পেতে ও কর্ণফুলী সেতুর সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে এই রোডটিকে চার লেনে উন্নীত করার প্রয়োজন ছিল।
একপর্যায়ে সওজ অধিদপ্তর রোডটি নিয়ে পৃথক প্রকল্প তৈরি করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এখন তা বাস্তবায়ন হলে কর্ণফুলী সেতুর সাথে যোগাযোগ অনেক সহজ হবে, কমবে যানজট।

আপনার মন্তব্য লিখুন