কাতার-সৌদি দ্বন্দ্ব : বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

হোসাইন আনোয়ার

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে আমেরিকানদের নজর একটু বেশিই থাকে। ইরাক ১৯৯০ সালের আগস্টে কুয়েত দখল করে নিলে কুয়েতের সমর্থনে এবং জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে মার্কিনিদের নেতৃত্বে ৩৯টি দেশের সেনাবাহিনী দখলদার ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে হটিয়ে ছিল। এরপর ইরাকের হাতে মারণাস্ত্র রয়েছে, এ অভিযোগ তোলা হয়। যা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ বলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরাক দখল করে ইরাককে ‘তছনছ’ করে। সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে ইরাক কার্যত তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এবং সেখানে জন্ম নেয় ইসলামিক স্টেটের মত জঙ্গি সংগঠন। যারা সিরিয়ার একটি অংশ দখল করে একটি ‘স্টেট’ প্রতিষ্ঠা করেছে। অথচ এ্‌ই ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীকে আজও সিরিয়া থেকে উৎখাত করতে পারেনি মার্কিনিরা।
কাতারের বিরুদ্ধে ইদানিংকালের সবচাইতে বড় অভিযোগ হচ্ছে, কাতার ইসলামিক ব্রাদারহুড ও হামাসের মতো কট্টরপন্থি ইসলামিক সংগঠনগুলোকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে আসছে, যা সৌদি-আরবের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মূল কারণ কিন্তু অন্যত্র। কাতারও সৌদি আরবের আসল দ্বন্দ্ব হচ্ছে নেতৃত্বের, ইসলামিক বিশ্বের নেতৃত্বকে দেবে কাতার না সৌদি-আরব? এ প্রশ্নে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে কাতারও সৌদি আরব।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ কাতার। বিশ্বের এলএনজি বাজারের বড় একটি অংশ দখল করে আছে কাতার। বিশ্বের এলএনজির বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষুদ্র দেশটি। ২০১৬ সালে প্রায় ৭ কোটি ৭২ লাখ টন এলএনজি রপ্তানি করেছে কাতার। কাতারের এলএনজির বড় ক্রেতা হচ্ছে এশিয়ার দেশসমূহ। জাপান-চীনের পাশাপাশি ভারতও বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে থাকে দেশটি থেকে।
বাংলাদেশেও কাতারের এলএনজির চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ তো বটেই, বিদেশি বিনিয়োগও চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। শিল্প-বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও আবাসিকসহ সবখাত মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা প্রতিদিন ৩৫শ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে ২৭শ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই হিসেবে প্রতিদিন ৮শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। দেশের বর্তমান গ্যাস সংকটের ভবিষ্যৎ সমাধানে সরকার কাতার থেকে লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির কথা ভাবছে। কিন্তু কাতারের বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিপাকে পড়বে বাংলাদেশ। এবং কাতারের বর্তমান সংকটে কাতারে অবস্থানরত প্রায় ৪ লাখ কর্মরত বাঙালি শ্রমিক দুঃশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।
সন্ত্রাসবাদের মদদ যোগানোর যে অভিযোগ কাতারের বিরুদ্ধে, তা প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার। কাতার, সরকার এক বিবৃতিতে সৌদি আরব, বাহরাইন, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেন ও মালদ্বীপ যৌথভাবে কাতারের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের অর্থ যোগানদাতার যে অভিযোগ তুলেছে, তাকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলেছে। বিবৃতিতে কাতার সরকার বলেছে, অনেকের চেয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান বেশি জোরালো। কাতার বলেছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা এ অঞ্চলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ‘স্বপ্ন’ দেখাচ্ছে। সিরিয়ার লাখো লাখো শরণার্থীকে শিক্ষিত করে তুলছে এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কমিউনিটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে আসছে। শুধু তাই নয়, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ৩৩টি মুসলিম দেশের যে সামরিক জোট গঠিত হয়েছিল (ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেররিজম তাতে কাতারও একটি সদস্য দেশ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে কাতার বিশ্বের ১০০ দেশে (যার মধ্যে মুসলমান দেশও রয়েছে) ৫২৪ মিলিয়ন পাউন্ড সাহায্য দিয়েছে যাতে ওই দেশগুলো এমজিডি অর্জন করতে পারে। অথচ সৌদি আরব এমন কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। কাতার-সৌদি আরব দ্বন্দ্বে মুসলিম বিশ্ব ইতিমধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অতিসম্প্রতি সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ফারমাজো ৮০ মিলিয়ন ডলারের একটি সৌদি সাহায্যের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সৌদি আরব ওই অর্থের বিনিময়ে সোমালিয়ায় সমর্থন আদায় করতে চেয়েছিল। কাতার-সৌদি দ্বন্দ্বে সোমালিয়া নিরপেক্ষ থাকার কথা বলেছে সোমালিয়াও ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোট ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স ফাইন টেররিজম এর সদস্য। কুয়েত ও ওমানের অবস্থানও অনেকটা নিরপেক্ষ।
সৌদি- কাতার দ্বন্দ্ব যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও কম নয়। পারস্য অঞ্চলে জ্বালানি সম্পদ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এ প্রশ্নটি এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। কাতারের রয়েছে বিশাল গ্যাস সম্পদ। বলা হয় বিশ্বের গ্যাস সম্পদের ১৪ শতাংশ রয়েছে কাতারের হাতে। এর পরিমাণ প্রায় ৮৯৬ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট। সবচেয়ে বেশি গ্যাসের রিজার্ভ রয়েছে রাশিয়ার, তারপর ইরানের অবস্থান। তারপরও বিশাল একটি গ্যাস ক্ষেত্র ইরান এবং কাতার ভাগাভাগি করে নিয়েছে। তাছাড়া, কাতার ও তুরস্কের পাইপ লাইনের মাধ্যমে কাতারের গ্যাস যাচ্ছে ইউরোপে এবং গ্যাস উত্তোলনে ইরান ও কাতারের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা রয়েছে, যা সৌদি আরবের একদম পছন্দ নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেন যেভাবে ইরানি প্রতিপত্তি বাড়ছে, তা সৌদি আরবের তা ভালো চোখে না দেখারই কথা। এর মধ্যে কাতারের সঙ্গে ইরানের দহরম মহরম সৌদি শাসকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সৌদি রাজপরিবার চাইছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কাতারকে ‘বধ’ করতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের পক্ষ নিয়েছেন এবং সন্ত্রাসে মদদ দেয়ার অভিযোগ এনেছেন কাতারের বিরুদ্ধে।
সৌদি-কাতার দ্বন্দ্ব কোন দিকে মোড় নিচ্ছে তা এখনও বলার সময় আসেনি। মনে রাখতে হবে কাতারে মার্কিনিদের বড় একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে প্রায় ১১ হাজার মার্কিন সেনা।
এদিকে কাতারের সঙ্গে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মুসলিম দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পর দেশটিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্ক এবং এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব তুরস্কের সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। প্রস্তাবটিতে তুরস্ক পার্লামেন্টের বিরোধী দল এসএইচপিও সমর্থন দেয় ক্ষমতাসীন একে পাটিকে। ইতিমধ্যেই তুরস্ক কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। ২০১৬ সালে ওই সময়কার তুর্কি প্রধানমন্ত্রী এই সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। তুরস্কের সামরিক ঘাঁটিতে বর্তমানে ৫০০ সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।
সৌদি রাজপরিবারের কেউ কেউ ‘স্বপ্ন’ দেখছেন আমেরিকান সৈন্যদের সহায়তায় কাতারের শাসনকর্তা আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল্‌্‌ খানির চেয়ার খানি উল্টেদিতে। কিন্তু কাজটি খুব কঠিন বলেই মনে হচ্ছে। কারণ এমন কিছু ঘটলে প্রথম ধাক্কাটা আসবে তুর্কিদের তরফ থেকে। এক্ষেত্রে ইরান যে চুপ করে বসে থাকবে না সে প্রমাণ ইরানও ইতিমধ্যে দিয়ে দিয়েছে। কাতার অবরোধের পর ইরান প্রায় প্রতিদিনই টনকে টন খাদ্য ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য পাঠাচ্ছে কাতারে। সামরিক অভ্যুত্থানের মতো কিছু ঘটলে ইরান তার সর্বশক্তি নিয়ে কাতারের পাশে দাঁড়াবে। কাতারের পাশে থাকবে চীন, ভারত, জাপান এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যাদের সঙ্গে কাতারের বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাশিয়াও কিন্তু কাতারের পক্ষে থাকবে।
কাতারকে নিয়ে রাজনীতির এই নতুন মেরুকরণে বাংলাদেশ কি কোন ভুল করছে? নাকি সঠিক পথে চলছে। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের। কারণ আমদানিকৃত এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যে মেগা প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে তা যদি ভন্ডুল হয়ে যায় তবে আমাদের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ দুটোই বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট