কাঠুয়ায় শিশু ধর্ষণ ও হত্যা তোলপাড় কেন এত পরে?

সুপ্রভাত বহির্বিশ্ব ডেস্ক

কাশ্মিরের কাঠুয়ায় ৮ বছরের এক শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক বছর আগে দিল্লিতে একই ধরনের ঘটনার মতোই ভারতে ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনে বিক্ষোভ হয়েছে ভারতের বিভিন্ন স’ানে, ক্ষমতাসীন দলের দুই শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেছেন, সর্বোচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করেছেন এবং বিরোধী দল নরেন্দ্র মোদিকে কোণঠাসা করতে উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল ২০১৮ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে। খবর বাংলাট্রিবিউনের।
ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার এই শিশুটি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের কাঠুয়া অঞ্চলের যাযাবর মুসলিম বাকারওয়াল গোষ্ঠীর মেয়ে আসিফা বানু। ১৭ জানুয়ারি একটি জঙ্গল থেকে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফেব্রুয়ারিজুড়ে পুলিশ আট ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, চার পুলিশ সদস্য ও এক তরুণ। তাদের আসিফাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীদের মতে, অভিযুক্তরা গ্রেফতারের পর স্বীকার করে জানিয়েছে, যাযাবর সমপ্রদায়কে আতঙ্কিত ও বিতাড়িত করার জন্যই তারা এই মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে।
শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘটনাটি নিয়ে শেষ পর্যন্ত মুখ খোলেন। বিরোধীরা তার নীরব থাকা নিয়ে সমালোচনা শুরু করার পরই মোদির এই অবস’ান প্রকাশ। তাও বক্তব্য ছিল একেবারে সংক্ষিপ্ত। কয়েকটি টুইটে তিনি বলেছেন, ধর্ষণের ঘটনায় দেশ লজ্জিত এবং আমাদের মেয়েরা অবশ্যই ন্যায় বিচার পাবে। ঘটনাটির বিস্তারিত প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভও বাড়তে থাকে। ভারতের অনেক বড় বড় চলচ্চিত্র তারকা তাদের ক্ষোভ জানাতে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জানুয়ারিতে যখন ঘটনাটি ঘটে তখন মেয়েটির মৃত্যু সংবাদ কাশ্মিরের স’ানীয় সংবাদমাধ্যম ছাড়া কোথাও স’ান পায়নি। শ্রীনগরে বিক্ষোভ করে বিশেষ তদন্তের দাবি জানানো হয়। এই নৃশংস অপরাধটি জম্মু ও কাশ্মির উপত্যকায় হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে সামনে নিয়ে আসে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উপত্যকায় ঘটনাটি দ্রুততা ও পারদর্শিতার সঙ্গে স’ানীয় সংবাদমাধ্যমে আড়াল করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে।
ভারতের সিপিআই(এম) এর পলিটব্যুরোর সদস্য ও রাজ্যসভার সাবেক এমপি ব্রিন্দা কারাত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে এক কলামে লিখেছেন, ‘ওই শিশুর ওপর সংঘটিত বীভৎস নৃশংসতার যে ভয়াবহ বিবরণ চার্জশিটে উঠে এসেছে, তা জেনে কোনও সত্যিকারের মানুষের পক্ষে কি চুপ করে থাকা সম্ভব? দোষীরা যে চূড়ান্ত নগ্ন নিপীড়ন চালিয়েছে, তাতে এমন কে আছে যে রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়বে না? তারা তাকে (আসিফাকে) গুম করেছে, চৈতন্যহীন বানিয়ে ধর্ষণ করেছে, মিরাট থেকে একজন সহযোগীকে ডেকে এনেছে বিকৃত যৌন বাসনা চরিতার্থ করতে… তারা তাকে খুন করা থেকে সাময়িকভাবে বিরত থেকেছে কেবল এই কারণে যে, তাদের একজন তাকে পুনর্বার ধর্ষণ করতে চেয়েছিল।’
অথচ এই ঘটনাটিই ভারতের জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে স’ান পায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অনেক পরে, এপ্রিলের মাঝামাঝিতে। কেন ঘটনাটি বিলম্বিত ক্ষোভ ও বিক্ষোভের জন্ম দিলো? কেন অভিযুক্তদের (যারাও হিন্দু) গ্রেফতারের ঘটনায় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রতিবাদের পরই এটা ঘটলো? কেন দিল্লিতে মধ্যরাতের মিছিলের মতো কর্মসূচি প্রধান বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে আয়োজিত হলো? কেনই বা ২০১২ সালে ২৩ বছরের নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের তুলনায় অনেক বেশি শান্ত?
ঘটনাটি ভারত নিয়ন্ত্রিত ও মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মিরে সংঘটিত হওয়ার ফলে এতো দেরিতে সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, এই কারণ অনুসন্ধানে যেসব জবাব পাওয়া গেছে তাতে আধুনিক ভারত সম্পর্কে নতুন কিছু বিষয় হাজির হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, দিল্লির সংবাদমাধ্যম জাতীয় আখ্যান (ন্যাশনাল ন্যারেটিভ) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অযাচিত প্রভাবের মুখোমুখি হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়নৃকত অঞ্চল কাশ্মিরের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে এসব সংবাদমাধ্যমের বড় অংশই পক্ষপাতমূলক ও বাছাই করে প্রকাশ করে।