কাঁদছে কেন ফারজানা

কামরুল আলম
Untitled-1

ফারজানা আমের প্লেট থেকে দু টুকরো আম কাঁটা চামচে একসাথে গেঁথে নিল। বাধা দিলেন ওর মা। আদর করে বললেন, ‘একসাথে দু টুকরো আম মুখে দেওয়া ঠিক না মা।’
‘কেন মা, আমি রবিন ভাইকে দেখেছি আস্ত আমটা একসাথেই খেয়ে ফেলে!’
‘তাতে কী! রবিন তো গ্রামের ছেলে। তাছাড়া ও তো অনেক বড়ো। তুমি একপিস একপিস করেই খাও, কেমন?’
মায়ের উপদেশ ভালো লাগে না ফারজানার। সে এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছে। ক্লাস থ্রিতে পড়ছে। অথচ মা এখনও ওকে সেই ছোট্ট সোনামনি ভাবেন। সামান্য দু’টুকরো আমও খেতে গেলে বাধা দেন!
ফারজানাদের স্কুলের নাম ‘অথেনটিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’। স্কুলটি ইংলিশ মিডিয়াম। তবে ছাত্র-ছাত্রী সবাই বাঙালি। স্যার-মিসরাও বাঙালি। কোনো ইংরেজের আনাগোনা দেখা যায় না স্কুলটিতে। তবুও স্কুলটি ইংরেজি মাধ্যমের। সবাই ইংরেজিতে পড়াশোনা শিখছে। ক্লাস থ্রিতে পড়লেও ফারজানা এখনও বাংলায় নিজের নামটি সঠিকভাবে লিখতে পারে না। সেদিন ‘কচিকলি আর্ট স্কুলে’ একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়েছে ওকে। ঘোষক হঠাৎ করেই ঘোষণা দিলেন, ‘যাদের ছবি আঁকা শেষ তারা প্রত্যেকে ছবির পেছনে নিজের নাম, শ্রেণি এবং স্কুলের নাম বাংলায় লিখে জমা দিতে হবে।’ ফারজানার ছবি আঁকা প্রায় শেষ হওয়ার পথে তখন। ওর জন্য বিষয় ছিল ‘ইচ্ছেমতো’। তাই ও মনের মাধুরি মিশিয়ে ছবি আঁকছিল। একটি সবুজ গ্রামের দৃশ্য এঁকেছিল খুবই সুন্দর করে। গ্রামের একপাশ দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে। সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিমদিকে। আকাশে একঝাঁক উড়ন্ত পাখি ফিরে যাচ্ছে আপন নীড়ে। এমন চমৎকার দৃশ্যটি আঁকার পর কেবল ছবির নিচে নিজের নাম লিখতে না পারায় পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হতে হবে ওকে! ভাবতেই কান্না পেল ফারজানার। সে ছবি আঁকা বাদ দিয়ে চোখ মুছতে লাগলো। ঘোষক ভদ্রলোক নিজে একজন ছড়াশিল্পী। তাঁর চোখে বিষয়টি ধরা পড়তেই তিনি মাইকে ঘোষণা দিয়ে বসলেন- ‘কাঁদছে কেন ফারজানা
সমস্যাটা কার জানা?’
ফারজানা এত দুঃখের মধ্যেও হেসে উঠলো। এই লোক তার নাম জানলেন কী করে? নিশ্চয়ই তাকে চেনেন উনি। সে ওনার দিকে তাকালো। ভদ্রলোক মাইক্রোফোন হাতে নিয়েই ওর সম্মুখে চলে এলেন। উনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই ফারজানা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে জানালো, ‘আমি বাংলা লিখতে পারি না’। ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন, ‘অসুবিধা নেই। তুমি ইংরেজিতেই লেখো। যারা বাংলা লিখতে পারে না তাদের জন্য ইংরেজিতে লেখার সুযোগ রয়েছে।’ ফারজানা সেদিন কী যে খুশি হয়েছিল তা বলে বুঝানো যাবে না।
আরেকদিন ফারজানা শুনতে পেল ওর বড়োভাই জাহেদুল ইসলাম গড় গড় করে কী যেন পড়া মুখস্থ করছে। ফারজানার বেশ কয়েকবার কানে বাজলো- ‘রবীন্দ্রনাথ বলেছেন আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন।’ গাঁথুনি এবং পত্তন শব্দটি ফারজানার কাছে অপরিচিত হলেও ও ঠিক বুঝতে পারলো রবীন্দ্রনাথ ইংরেজির আগে বাংলা শিখতে উপদেশ দিয়েছেন। সেদিন ফারজানা ওর বাবাকে বিষয়টি খুলে বললো। সে বললো, ‘বাবা, আমি বাংলায় পড়াশোনা করতে চাই।’
‘তাই নাকি মা’মনি। তাহলে তো কোনো অসুবিধাই নেই।’
‘কিন্তু বাবা আমাদের স্কুলে তো বাংলা নেই। বাংলা পড়াকেও ইংরেজিতে পড়ানো হয়!’ ফারজানার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘এজন্যেই কি ব্রিটিশদের কবল থেকে এ দেশটিকে উদ্ধার করেছিল আমাদের পূর্ব পুরুষরা! এজন্যেই কি বাংলা ভাষার জন্য বায়ান্নতে জীবন দিয়েছিলেন রফিক সালাম বরকতরা?’ বিড় বিড় করে উচ্চারণ করলেন ফারজানার বাবা আহমদ ইবরাহিম। একটি অনলাইন গণমাধ্যমের সিনিয়র সাব এডিটর তিনি। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখিও করেন। মেয়ের কথায় আজ তাঁর চোখ খুলে গেল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন মেয়ের স্কুল পরিবর্তন করাবেন। ভালো মানের বাংলা মাধ্যম একটি স্কুলে মেয়েকে পড়াতে হবে। মেয়েটি নিশ্চয়ই বাংলায় লেখাপড়া করলেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারবে। পরের বছর ফারজানাকে একটি বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করা হলো।
ফারজানা এখন বাংলায় অনেক দক্ষ। সে বাংলা লিখতেও শিখে গেছে। এখনও ওর মনে পড়ে কচিকলি আর্ট স্কুলের সেই স্যারের কথা-
‘কাঁদছে কেন ফারজানা
সমস্যাটা কার জানা?’
ফারজানা বাংলা লিখতে পারে না বলে কেঁদেছিল। আজ সে বাংলায় নিজের নাম, স্কুলের নাম ইত্যাদি সবই লিখতে পারে। ফারজানা তাই একটি আর্টপেপারে বড়ো করে লিখে রাখলো-
‘কাঁদবে না আর ফারজানা
বাংলাভাষা তার জানা।’
এ লেখাটি দেখে অবাক হলেন সবাই।