কাঁচামালের আমদানি শুল্ক কমালে গতি পাবে জাহাজ নির্মাণ শিল্প ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড এমডি মো. সাখাওয়াত হোসেন

shakawat-hossan

দেশের দ্রুত সম্প্রসারিত শিল্পখাতগুলোর অন্যতম জাহাজ নির্মাণ শিল্প। দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশেও জাহাজ রপ্তানি করছে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকলেও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজ নির্মাণ কাজ চালিযে যাচ্ছে।
দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়নে বাজেটে প্রস্তাব ও দাবি নিয়ে কথা হয় ‘অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিপ বিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ অব বাংলাদেশ’ (এইওএসআইবি) এর সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ব্যবস’াপনা পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন-এর সাথে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রমবিকাশমান শিল্প জাহাজ নির্মাণ শিল্প। হেভি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দেশের উন্নয়নে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জিডিপিতেও অবদান রয়েছে এ খাতের। জাহাজ নির্মাণের মাধ্যমে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে অপরদিকে অনেক মানুষের কর্মসংস’ান হয়েছে। আমরা এখন ‘শিপবিল্ডিং ন্যাশন’ হিসেবে পরিচিত হতে যাচ্ছি।’
মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বড় অংকের মূলধনের প্রয়োজন হয়। হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হয় এই শিল্প শুরু করতে। হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং ইয়ার্ড, যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্রযুক্তির জন্য ব্যয় করতে হয়।’
জাহাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর কর কমিয়ে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়নে সরকার সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জাহাজ নির্মাণের জন্য যেসব কাঁচামাল প্রয়োজন হয় তার অধিকাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কারণ দেশে এ ধরনের কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ তৈরি হয় না। বিদ্যমান কর কাঠামোর কারণে কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজের নির্মাণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে বেগ পেতে হচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে।’
শিপবিল্ডিং অ্যাসোসিয়েশনের এ নেতা বলেন, ‘বর্তমানে জাহাজ নির্মাণ করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ যেমন-ডেক মেশিনারি আমদানি করতে ২৬-৩৭%, একোমোডেশন আইটেমে ৩৭-৬০%, শিপ পেইন্টে ৬০%, নেভিগেশন ও কমিউনিকেশন আইটেমে ১০-৬০%, এমএস প্লেট, ফিটিংসসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে ৩১-৯০% পর্যন্ত কর পরিশোধ করতে হয় যা গড়ে ৩০-৪০%। ফলে জাহাজ নির্মাণ ব্যয়ের আধিক্যের কারণে অন্যান্য দেশ বাজারে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস’ানে রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কাঁচামাল আমদানি কর ৩-৫%-এ নিয়ে না আসলে বিশ্ববাজারে অন্যান্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে যাবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে কর আরোপ করা হয় না। আমরা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে চলতি অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের আমদানিযোগ্য কাঁচামালের ওপর অর্পিত কর কমানোর জন্য আবেদন করছি।’
মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘দেশের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে জাহাজ নির্মাণ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সামনে আরও যেসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য হাতে নেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নেও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তেল ও গ্যাস সেক্টরের উন্নয়ন এবং সমুদ্র ও নদী তীরবর্তী শিল্প উন্নয়নে জাহাজ নির্মাণ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, আগামীতেও করবে। এছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণে কাঁচামাল পরিবহনে যেসব ট্রাক, বোট, বার্জ ইত্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে তাও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অবদান। চট্টগ্রামে বে-টার্মিনাল নির্মাণেও জাহাজ নির্মাণ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এছাড়া হেভি স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্টিল স্ট্রাকচার তৈরিতে যে সক্ষমতা প্রয়োজন দেশের জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সে সক্ষমতা রয়েছে। সুতরাং, জাতীয় উন্নয়নে এ খাতের অবদান অবশ্যম্ভাবী।’
জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়ন হলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নতি ঘটলে বিদেশ থেকে আর জাহাজ কিনে নিয়ে আসতে হবে না ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে অন্যদিকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কর্মসংস’ান হবে এবং দেশের উন্নয়ন কাজ গতি পাবে।’
ওয়েস্টার্ন মেরিনের ব্যবস’াপনা পরিচালক আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অন্যান্য শিল্প খাতের মতো জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে বিবেচনা করা হয়। ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে প্রথম দুই বছর ‘গ্রেজ পিরিয়ড’ থাকলেও ৫-১০ বছরের মধ্যে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। যেহেতু জাহাজ নির্মাণ শিল্প থেকে ২-৫ বছরে আয় করা সম্ভব নয় সেহেতু এ সময়ের মধ্যে ঋণের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। ঋণ পরিশোধের এ সময় কমপক্ষে ১৮-২০ বছর করা প্রয়োজন যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ২৫-৩০ বছর। এছাড়া এ খাতের উন্নয়নে ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনা প্রয়োজন। সরকারের যথাযথ নির্দেশনা এ খাতের উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন