কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা ও আগামীর তারুণ্য

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল। এই স্বাধীনতা অর্জন করতে এদেশের মানুষকে সংগ্রাম আর আন্দোলনের নানামাত্রিক অধ্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে উঠে আসা প্রায় ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই সুফলা জনপদটির মানুষ সুপ্রাচীনকাল থেকে স্বাধীনতাপ্রিয়। তারা সকল শোষণ, নির্যাতন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে কালে কালে। ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালিরা খুবই সহজ- সরল এবং সহিষ্ণু। শোষণ আর অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি বলে তারা এমন দিনে গর্জে উঠেছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে জনৈক বিদেশি সংবাদিক বলেছিলেন ওভ নষড়ড়ফ রং ঃযব ঢ়ৎরপব ড়ভ ভৎববফড়স, ইধহমষধফবংয যধং ড়াবৎ ঢ়ধরফ. রক্তই যদি স্বাধীনতার মূল্য বলে বিবেচিত হয়ে থাকে তাহলে বলতে হয় বাংলাদেশ খুবই বেশি পরিমাণ রক্ত দিয়েই স্বাধীনতা ক্রয় করেছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদান আমাদের গৌরবগাথা।
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আমরা বাঙালিরা গর্বিত, কারণ আমরা বিজয়ী জাতি। আত্মদান আমাদের গৌরবগাঁথা। যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। বাংলাদেশ অসামপ্রদায়িকতার ইতিহাস। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম সবাই মিলে আমরা এই দেশটা স্বাধীন করেছি। বর্তমানে দেশে প্রতিবছর গড়ে ১৩ লক্ষ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ এবং জিপিএ-৪ পাওয়া শিক্ষার্থীরা নিজের যোগ্যতা ও মেধা বলে দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে। তুলনামুলক কম মেধাবীরা থাকে দিক নির্দেশনাহীন। এদের অধিকাংশের পিতা-মাতা গরিব এবং তারা গ্রাম থেকে লেখাপড়া করে এতদূর পথ পাড়ি দিয়েছে। কম মেধা, অর্থ ও যোগাযোগের কারণে তারা আর সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। ডিপ্লোমা শিক্ষার অভাবে একটি কাজের সন্ধান পেতেও ব্যর্থ হয়। নিরুপায় হয়ে এক সময় বেকার জীবন ধারণ করে। মুকুল ফোটার আগে ঝরে পড়ে, কর্ম ও মেধাকে জাতীয়ভাবে সম্পৃক্ত করার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনামূলক পরিকল্পনা দেশের কর্ণধারেরা গ্রহণ করেনি। বছরে ৬ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর অতিক্রম করে এর ৬০ শতাংশ কর্মহীন দিন যাপন করে। পৃথিবীর সব দেশেই গরিব ও কম মেধাবী মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। নির্মাণ করা হয় ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নিজ বাড়িতে বসে কর্মকেন্দ্রীকপ্রযুক্তি শিক্ষা গ্রহণ করে নিজ গ্রামে শিল্প, খামার, হাসপাতাল গড়ে তুলে। তারা সকলের অজান্তে নব্য আবিষ্কৃত প্রযুক্তিগুলো তৃণমূলে হস্তান্তরের বাহক হিসাবে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে সাধারণ শিক্ষা ও ডিপ্লোমা শিক্ষা অঘোষিত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। যেসব দেশে ডিপ্লোমা শিক্ষার হার সাধারণ শিক্ষা থেকে অগ্রগামী সেই সব দেশে বেকার বলে কোন শব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না।
স্বাধীনতা অর্জনের যেখানে ৪৫ বছর পার হল সেখানে একটি স্বাধীন পেশাভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা দারুণ ব্যর্থ হয়েছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা সবসময় একটি কথা বলেন, আর তা হলো, আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি, আমরা পরাজয় বুঝিনা। আমাদের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে শিক্ষা সমাপনে বিজয় মুকুট পড়তে অবশ্যই প্রয়োজন কর্মের সংস্থান। প্রতিভাদীপ্ত শিক্ষাকেন্দ্রীক কর্ম নিশ্চিত করতে পারে শিক্ষার সাথে ডিপ্লোমা সংযোজন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তনয়ার নেতৃত্বে মাত্র ৪ দশকের ব্যবধানে আরোগ্যহীন রোগী এখন আন্তর্জাতিক সম্ভাবনার প্রতীক। জোড়াতালি দেওয়া মানবসম্পদ নামক অরক্ষিত ঝুড়িটিকে ডিপ্লোমা শিক্ষার মাধ্যমে কর্মক্ষম করতে পারলে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা ‘সিচুয়েশন রুমে’ই হোয়াইট ওয়াশ হবে। স্বাধীনতাকামীদের স্বপ্নের সেই আকাঙ্ক্ষা অবধারিতভাবে প্রস্ফূটিত হবে।

লেখকদ্বয় : প্রযুক্তি শিক্ষা আন্দোলনের সংগঠক