চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডেলিং

কমছে জিসিবিতে বাড়ছে এনসিটিতে

ভূঁইয়া নজরুল
Untitled-1

চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রফতানি বাড়লেও ধীরে ধীরে কমছে জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) কনটেইনার হ্যান্ডেলিং। বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য তিনটি টার্মিনাল (জিসিবি, সিসিটি, এনসিটি) রয়েছে। তবে গত এপ্রিল থেকে জিসিবিতে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং কমছে এবং জুন মাসে গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ হাজার একক কনটেইনার কম হয়েছে। অন্য দুই টার্মিনালের মধ্যে সিসিটিতে (চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল) তেমন না বাড়লেও এনসিটিতে (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) বেড়েছে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, মূলত তিন কারণে জিসিবিতে কমছে কনটেইনার পরিবহন। এই তিন কারণ হচ্ছে- খাদ্যপণ্যকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে জিসিবির কনটেইনারের বার্থে খাদ্যবাহী জাহাজ ভেড়ানো, জিসিবির বার্থগুলোর ড্রাফট কমে যাওয়া ও কম কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়া।
জিসিবির ৬টি বার্থে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করার কথা থাকলেও এখন তা কখনো কখনো ৫ বা ৪টিতে নেমে আসে বলে জানায় শিপিং এজেন্টরা। এ বিষয়ে কথা হয় বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডেলিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ফজলে ইকরাম চৌধুরীর সাথে। তিনি বলেন, ‘বাল্ক পণ্যবাহী জাহাজকে বেশি সুযোগ দিতে গিয়ে কনটেইনারবাহী জাহাজ কম ভিড়ছে জিসিবিতে। আগে জিসিবির ৬টি বার্থে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এখন তা কমে পাঁচটি আবার কখনো চারটিতে নেমে আসে। মূলত কয়েকমাস ধরে বাল্ক জাহাজের মধ্যে খাদ্যপণ্যবাহী জাহাজকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে কনটেইনার জাহাজ কম ভিড়ছে। আর এতেই হয়তো কনটেইনারের পরিমাণ কম মনে হচ্ছে।’
তবে জুন মাসে বেশি কমে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুন মাস ছিল রোজার মাস। তখন শ্রমঘণ্টা কম থাকায় জাহাজ দ্রুত জেটি থেকে বের হয়ে গেছে। এতে মাস শেষে হ্যান্ডেলিংয়েরর পরিমাণ কমে গেছে।
এদিকে বন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে জানা যায়, জিসিবিতে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর মাসভিত্তিক কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের পরিমাণ কমলেও সিসিটি ও এনসিটিতে কনটেইনারের সংখ্যা তেমন কমেনি। বরং এনসিটিতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়েছে এর সংখ্যা। গত বছরের এপ্রিলে জিসিবিতে ৮৩ হাজার ৪৪৮টি একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এ বছর হয়েছে ৭৯ হাজার ৮৫টি। সিসিটিতে গত বছর ৪৪ হাজার ৫২টি একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও চলতি বছর হয়েছে ৪৪ হাজার ৪০৩টি। আর এনসিটিতে গত বছর ৭১ হাজার ১৩৪ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও চলতি বছর হয়েছে ৮৪ হাজার ৬৫৫টি।
জিসিবিতে গত বছরের মে মাসে ৯৫ হাজার ৭০৮টি একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এ বছর হয়েছে ৭৯ হাজার ৬৯৯টি। সিসিটিতে গত বছর ৪১ হাজার ৯৯৭টি একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এবছর হয়েছে ৪৪ হাজার ৬৪৯টি। আর এনসিটিতে গত বছর ৫৬ হাজার ৮৫৩ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এবছর হয়েছে ৭৬ হাজার ১৩৩টি।
জিসিবিতে গত বছরের জুন মাসে ৯২ হাজার ৫৯টি একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এ বছর হয়েছে ৬৮ হাজার ৭০৮টি। সিসিটিতে গত বছরের ৪১ হাজার ৭৮টির স্থলে এ বছর হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৪টি। আর এনসিটিতে গত বছরের ৬৪ হাজার ৫০টির স্থলে এ বছর হয়েছে ৭৬ হাজার ৪৬৯টি।
জিসিবিতে গত বছরের জুলাই মাসে ৭৯ হাজার ৬৫২টি একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এ বছর হয়েছে ৮১ হাজার ৭৬টি। সিসিটিতে গত বছরের ৩৯ হাজার ৭৫৪টির স্থলে এ বছর হয়েছে ৩৩ হাজার ১৭টি। আর এনসিটিতে গত বছরের ৬৮ হাজার ২৪৫টির স্থলে হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৯৯৩টি।
গত বছরের আগস্ট মাসে জিসিবিতে ৯৮ হাজার ৫৬৯ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এ বছর হয়েছে ৮৫ হাজার ৩৩৮টি। সিসিটিতে গত বছরের ৫১ হাজার ১৩৩টির স্থলে এ বছর হয়েছে ৪৭ হাজার ৯৬৭টি। এনসিটিতে গত বছরের ৬৬ হাজার ৯১৬টির স্থলে এ বছর হয়েছে ৯৭ হাজার ৪২০টি।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জিসিবিতে ৮২ হাজার ৯৭১টি একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হলেও এ বছর হয়েছে ৮০ হাজার ২২টি। সিসিটিতে গত বছরের ৩৫ হাজার ৫৬টির স্থলে এ বছর হয়েছে ৪৪ হাজার ২৭৩টি। আর এনসিটিতে গত বছরের ৫০ হাজার ৮৭৪টির স্থলে এবছর হয়েছে ৭৩ হাজার ৬৯৯টি।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুন দুর্ঘটনায় সিসিটির দুটি গ্যান্ট্রি ক্রেন নষ্ট হওয়ার পর থেকে কনটেইনারবাহী জাহাজগুলো থেকে পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ে সিসিটির দুটি বার্থে গিয়ার্ড জাহাজ (যেসব জাহাজে নিজস্ব ক্রেন রয়েছে) ভেড়ানো হচ্ছে। এতে সিসিটির কনটেইনার হ্যান্ডেলিং ক্ষমতা কমে গেছে। অন্যদিকে খাদ্যবাহী জাহাজকে অগ্রাধিকার দিতে জিসিবিতে কনটেইনারের বার্থ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে বেশিরভাগ কনটেইনারবাহী জাহাজ গিয়ে ভিড়ছে এনসিটিতে। আর এ কারণে এনসিটিতে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘জিসিবিতে ১২টি বার্থ থাকলেও বাস্তবে ব্যবহার করা যায় ১০ থেকে ১১টি। কারণ ১৭০ মিটার জাহাজের দৈর্ঘ্য ধরে ১২টি বার্থ ধরা হয়েছে। কিন্তু এখন জাহাজের দৈর্ঘ্য ১৯০ মিটার। তাই বার্থের সংখ্যা কমে এসেছে। এর মধ্যে আবার এক নম্বর বার্থটিতে ড্রাফট না থাকায় তা অকার্যকর। দুই নম্বর বার্থের ড্রাফট ৭ দশমিক ৫ মিটার এবং বাকিগুলোর ৮ দশমিক ৫৫ মিটার। এতে সামগ্রিকভাবে জিসিবিতে কনটেইনার জাহাজ কম ভিড়ছে।’
এনসিটিতে কেন বাড়ছে -জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এনসিটিতে ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বেশি কনটেইনার নিয়ে ভিড়তে পারে। এছাড়া এই টার্মিনালে স্পেস বেশি থাকার কারণে বেশি পরিমাণে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করা যায়।’
তবে চট্টগ্রাম বন্দরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কনটেইনার পরিবহনকারী শিপিং সংস্থা এমএসসি’র সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘বিভিন্ন বন্দর থেকে আসা বিভিন্ন বন্দরে কনটেইনারের জট লেগে যাওয়ায় বেশি কনটেইনার একসাথে আনার জন্য বড় জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্রাফট সীমাবদ্ধতার কারণে বড় জাহাজগুলো জিসিবিতে ভেড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এতে হয়তো জিসিবিতে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং কমে যেতে পারে।’
উল্লেখ্য, দেশের আমদানি-রপ্তানীর ৯২ শতাংশ হ্যান্ডেলিং হয়ে থাকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর বাড়ছে, সেই হিসেবে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংও বাড়ছে। এ বছর জানুয়ারি মাসে ২ লাখ ১৫ হাজার ৭১৯ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং দিয়ে বছর শুরু হয়েছিল। গত বছর জানুয়ারি মাসে হ্যান্ডেলিং হয়েছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৫৩টি। বছরের শুরুতে বাড়তে থাকা এই কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের পরিমাণ গত মাসে হয় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯৪ একক কনটেইনার। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে তা হয়েছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯০১টি।