কঙ্কাল নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগ

বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মানব কঙ্কাল নিয়ে রমরমা বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং কবরস’ান কেন্দ্রিক একাধিক চক্র মূলত এই কঙ্কাল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কারা কঙ্কাল পাচারের সাথে জড়িত?
লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় মেডিক্যাল কলেজের চতুর্থ শ্রেুীর কর্মকর্তা কর্মচারী এমনকি শিক্ষার্থীরাও এতে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পুলিশের।
সমপ্রতি ঢাকা, টাঙ্গাইল ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স’ান থেকে কঙ্কাল উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে মাঝে মধ্যে কেউ ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যায় ধোরাছোঁয়ার বাইরে।ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার কোতোয়ালী থানার এসআই নাজিম উদ্দিন জানান, এই সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা মূলত কবর থেকে অবৈধভাবে লাশ উত্তোলন এবং হাসপাতালের বেওয়ারিশ লাশগুলো অবৈধ উপায়ে খালাস করার মাধ্যমে কঙ্কাল সংগ্রহ করে।তারা রাসায়নিকের মাধ্যমে মাংস থেকে হাড় আলাদা করে কঙ্কালগুলো মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের কাছে মোটা অঙ্কে বিক্রি করে বলে জানান এসআই নাজিম। মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সাধারণত উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা কঙ্কালগুলো নতুন শিক্ষার্থীরা কিনে নিয়ে ব্যবহার করে।
বেশিরভাগ সেই পুরনো কঙ্কাল দিয়ে কাজ সারলেও অনেক শিক্ষার্থী মেডিকেলের চতুর্থ শ্রেুীর কর্মচারীর মাধ্যমে নতুন কঙ্কাল কিনে থাকেন।
‘কঙ্কাল বেচাকেনার নীতিমালা নেই’
কঙ্কালের এই বেচাকেনা নিয়ে দেশে সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা না থাকায় ব্যবসায়ীদের লাগামহীন বেঁধে দেয়া দাম দিয়ে কঙ্কাল কিনতে গিয়ে ভোগান্তির মুখে পড়েন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা।
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের অধ্যাপক লায়লা আঞ্জুমান বানু জানান, ‘অ্যানাটমি বিভাগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য কঙ্কালের প্রয়োজন হয়। যা কিনতে অনেক খরচ পড়ে। কঙ্কাল কেনাবেচার ব্যাপারে সরকারিভাবে কোন বিধিমালা না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা যে যেভাবে পারে কঙ্কাল সংগ্রহ করে।’
অধ্যাপক লায়লা বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী মৃত্যুর আগে কেউ তার দেহ দান করে গেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ওই লাশ প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে কঙ্কাল বের করে থাকে। এছাড়া হাসপাতালে আসা বেওয়ারিশ লাশগুলোর এক সপ্তাহের মধ্যে কোন ওয়ারিশ পাওয়া না গেলে লাশের ছবি তুলে রেখে তা ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করা হয়।’
তবে বেওয়ারিশ লাশগুলো কাঁটা ছেড়ার জন্য না রেখে সেগুলোর যথাযথ সৎকারে সরকারকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান অধ্যাপক লায়লা।
কঙ্কাল নিয়ে কোন সংঘবদ্ধ চক্র যেন বাণিজ্য গেড়ে না বসে সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আরও সজাগ দৃষ্টি দেয়ার কথাও জানান তিনি।
কঙ্কাল কেনাবেচা, এর সংরক্ষণ সেইসঙ্গে দেহদান সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক লায়লা বলেন, চিকিৎসা শিক্ষায় মানব কঙ্কাল যদি ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে এর সংরক্ষণের ব্যবস’া করতে হবে। যেন বার বার কারো কঙ্কাল কেনার প্রয়োজন না হয়।
এছাড়া সাময়িকভাবে কঙ্কালের মডেল বা ডামি দিয়ে কাজ চালানো যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক লায়লা।
কঙ্কাল সংগ্রহ করতে খরচ কেমন?
জানা গেছে, কবর থেকে চুরি করা একটা মানবদেহের পূর্ণাঙ্গ কঙ্কালের দাম দিতে হয় ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
কাটা-ছেঁড়ার জন্য একটি বেওয়ারিশ লাশ কিনতে অন্তত দেড়/দুই লাখ টাকা গুনতে হয়। কখনও কখনও লাশের সঙ্কট থাকলে দাম আরও বেড়ে যায়।
কঙ্কালের চাহিদা কেমন?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মেডিক্যাল শিক্ষার্থী জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিবছরই নতুন কঙ্কালের প্রচুর চাহিদা থাকে। এ অবস’ায় হাসপাতালে কোন বেওয়ারিশ লাশ আনা হলে মর্গের কর্মচারীরা সেটি সংরক্ষণ করে ।
পরে যে কোনো ব্যক্তিকে ওই লাশের ওয়ারিশ সাজিয়ে লাশটি হাসপাতালের বাইরে নেয়া হয়।
পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে লাশটি বিক্রি করে দেয়া হয় বিভিন্ন মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষার্থীর কাছে।
কঙ্কাল পাচারে শাস্তির বিধান কী?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে করব খুড়ে লাশ ও কঙ্কাল চুরি চরম অনৈতিক কাজ বলে গণ্য হলেও দেশের প্রচলিত আইনি ব্যবস’ায় এ ব্যাপারে কোন বিচার বা শাস্তির স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। কিছুক্ষেত্রে অপরাধী ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকরে তারা পার পেয়ে যায় সহজেই।