দেশের পাশাপাশি বিদেশের চাহিদাও মিটানো যাবে

কক্সবাজারে শুঁটকি তৈরির ধুম

এবার লক্ষ্যমাত্রা ৩০০ কোটি টাকা

দীপন বিশ্বাস, কক্সবাজার
Untitled-1

পর্যটন নগরী কক্সবাজারে এখন শুঁটকি তৈরি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন এর সাথে জড়িত অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক শ্রমিক। সংশ্লিষ্টদের ধারণা এবার ৩০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন হতে পারে। যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের চাহিদা মেটাতেও সক্ষম হবে। এসব মহালে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ শুঁটকি হংকং, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করা হচ্ছে। পোপা শুঁটকি বেশি রপ্তানি হচ্ছে হংকং এবং ইন্দোনেশিয়ায়। কারণ সেখানে পোপা শুঁটকি খুব জনপ্রিয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, শহরতলীর নাজিরারটেক, ফদনারডেইল, নুনিয়াছরা, সমিতিপাড়াসহ উপকূলীয় এলাকার কয়েকটি গ্রামে হাজার হাজার বিভিন্ন বয়সের মানুষ শুঁটকি উৎপাদনে ব্যস্ত। গভীর সাগর থেকে ট্রলারগুলো মাছ আহরণ করে নাজিরারটেক ও ফদনারডেইল ঘাটে ভিড়ছে। ট্রলারে আসা বিভিন্ন কাঁচা মাছ রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হচ্ছে শুঁটকি। বাঁকখালী নদীর তীরের বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার বসতঘরের ছাদে ও উঠানে মাচা বানিয়ে তৈরি হচ্ছে শুঁটকি। ছুরি, লইট্যা, পোয়া, ফাইস্যা, লাক্কা, মাইট্যা, রূপচাঁদা মাছসহ বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি উৎপাদিত হয়।
এছাড়া পর্যটকদের চাহিদা পূরণে নানান প্রতিকূলতা এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে কক্সবাজারের উপকূলীয় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুরোদমে চলছে শুঁটকি উৎপাদন। মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সোনাদিয়া, শহরের পার্শ্ববর্তী খুরুশকুল, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফের বাহারছড়া ও প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের শুঁটকি মহালে চলছে উৎপাদন।
বর্তমানে প্রতিকেজি রূপচাঁদা ১২শ’ থেকে আড়াই হাজার, মাইট্যা ৭শ’ থেকে ১ হাজার, কোরাল ৯শ’ থেকে দেড় হাজার, পোপা ৫শ’ থেকে ১ হাজার, চিংড়ি ১-২ হাজার টাকা, লইট্যা ৪শ’ থেকে ৮শ’, ছুরি ৬শ’ থেকে দেড় হাজার টাকা, অন্যান্য মাছ ২০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে, শুঁটকি ব্যবসায়ীদের দাবি এ কাজে তাদের সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা করা হয় না। জেলার সবচেয়ে শুঁটকি উৎপাদনের ঘাঁটি নামে পরিচিত সমুদ্র তীরবর্তী নাজিরার টেক এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। বিদ্যুৎ নেই, মানবেতর জীবনযাপন করে এই শিল্পের সাথে কাজ করতে হচ্ছে। যদি সরকারিভাবে তাদের ঋণ সহযোগিতা করা হতো তাহলে তারা আরও লাভবান হতে পারতো। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করারও দাবি জানান তারা।
কক্সবাজার শুঁটকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান জানান, প্রায় ২ মাসের বেশি সময় ধরে শুঁটকি উৎপাদন শুরু হয়েছে, তবে গত কয়েক দিন ধরে কার্যক্রম বেশি চলছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শুঁটকি উৎপাদনের স্থান কক্সবাজারের নাজিরার টেক। এখানে চলতি মৌসুমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদন হতে পারে। যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও শুঁটকির চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় এই শিল্পের জন্য সরকারি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এখানকার বড় সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও খুব নাজুক, বেশির ভাগ সময় লো ভোল্টেজ থাকে। সমস্যাগুলোর সমাধান করা খুবই জরুরি।
স্থানীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আমান উল্লাহ বলেন, ‘শুঁটকি উৎপাদন একটি অনেক বড় প্রক্রিয়া এটার সাথে কয়েক হাজার মানুষ জড়িত। কিন্তু এই ব্যবসা শিল্পের মর্যাদা পায়নি। আমরা খুবই কষ্ট করে ব্যবসা করে আসছি।’
মহেশখালীর শুঁটকি ব্যবসায়ি নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘মহেশখালীর শুঁটকি খুবই বিখ্যাত, আমাদের এখানে শতভাগ বিষমুক্ত এবং সুন্দর পরিবেশে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। মহেশখালীতে অন্তত ১৫-২০ হাজার মানুষ শুঁটকি ব্যবসার সাথে জড়িত। এখানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০টির বেশি শুঁটকি মহাল আছে।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন, ‘কক্সবাজারের শুঁটকির একটি বিশাল সুনাম আছে সেটা টিকিয়ে রাখতে হবে। মাঝেমধ্যে শুনা যায় শুঁটকিতে ক্ষতিকারক বিষ মিশিয়ে তারা কৃত্রিমভাবে শুঁটকি উৎপাদন করছে এটা খুবই দুঃখজনক।’ তবে শুঁটকি উৎপাদনে ব্যবসায়ীদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা হয় বলে তিনি জানান।