ওসমান জামাল: তাঁর স্মৃতি

মুহাম্মদ সিকান্দার খান

১৯৬৯ সালে লীড্‌স্‌ শহরে পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্র সম্প্রদায়ের সংগে আমার যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রির জন্য নিবন্ধিত ছিলেন তাদের মধ্যে ঢাকা কলেজের ইংরেজীর মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল মোমেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের খায়রুল বাশার, পদার্থবিদ্যা বিভাগের ফরিদা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মোজাম্মেল হক বুয়েটের আব্দুস সালাম প্রমুখ বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বৃওি নিয়ে কর্মরত ছিলেন ।
ওসমান জামাল তখন লীড্‌স্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষ করে একটি স্কুলে শিক্ষকতা নিয়ে লীডস শহরে বসবাস করতেন। তাঁর স্ত্রী মঞ্জু জামালও স্কুলে শিক্ষকতা করতেন । শামসুদ্দোহা আমার চট্টগ্রাম কলেজের সহর্কমী ছিলেন। তাঁর বাসার প্রথম উঠি লীডসে । তিনি এক সন্ধ্যায় বেড়াতে নিয়ে যান ওসমান জামালের বাসায় । ওসমান জামাল ও তাঁর স্ত্রী মঞ্জু শিক্ষক ছাএী । গাইবান্ধা কলেজে জামালের শিক্ষকতা জীবনের শুরুতে তাদের মধ্যেকার প্রেম পরিণতিতে পরিণয়ে গড়ায়। জামালরা এর পর উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান।
সেই যে প্রথম জামালদের বাসায় গেলাম তার পর থেকে সে বাসা হয়ে যায় আমাদের সান্ধ্যকালীন অবকাশ যাপনের প্রায় নিয়মিত গন্তব্য । জামাল দম্পতির আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে প্রধান ছিল দেশের রাজনীতি, সমাজ বিপ্লবের পৃথিবী ব্যাপী যে আন্দোলন তখন চলছিল তার গতি প্রকৃতি। যারা তখনকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে সদ্য লীড্‌স্‌ এসেছে তাদের কাছে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ , শিক্ষাগত পরিবেশ সহ নানা বিষয়ে জানার কৌতূহল। নবাগত আমার জন্যও এটাই তাদের মধ্যে আমার আকর্ষণ তৈরি করে ছিল।
জামালদের বাসার আসরে পূর্ব পাকিস্তানী এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রচুর অতিথির সমাগম হত। এদের মধ্যে নকশাল পন্থী আদর্শের মানুষও কম ছিলে না। তাদের আলোচনার শেষ দিকে নিজ নিজ দেশে গিয়ে সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার প্রতি অঙ্গীকার প্রকাশ পেত। জামাল আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন একটি চাকুরি নিয়ে দেশে ফিরবার অভিপ্রায় মনে মনে লালন করতেন। আব্দুল মোমেন আর আমি এ ব্যাপারে তাকে উৎসাহ যোগাতাম। জামাল নিজের ঠিকানায় অতি যত্নে লালিত সমাজ ব্যবস্থার গোড়াপওন হোক তা দেখতে চাইত। তার স্ত্রীর মধ্যেও এ ব্যাপারে তার যোগ্য সঙ্গিনী হবার সকল প্রস্তুতি লক্ষ্য করতাম।
এক সময় ১৯৬৯এর গনজাগরণ জামালের সিদ্ধান্ত নিতে খুবই সহায়ক হয়েছিল । এ সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে যোগদানের একটি আমন্ত্রণ সুযোগটি কাজে লাগাবার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ছিল। জামালরা চলে গেলেন লীড্‌স্‌ ছেড়ে। এর পরেও আমাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। বাংলাদেশের দৃশ্যপট দ্রত পরিবর্তিত হতে লাগল। একসময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক তাতে সমপৃক্ত হলেন। পাকিস্তানি হামলার মুখে জামালরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছিটকে পড়লেন । অনেক কষ্টে নানা বিপদ অতিক্রম করে ফিরে এলেন আবার লীডসে ১৯৭১সালে।
আমরা লীড্‌স্‌ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাকিস্তান সমিতি ত্যাগ করে বাংলাদেশ সমিতি গঠন করি। সদ্য দেশ ফেরত ওসমান জামাল প্রকৃত অর্থে আমাদের উপদেষ্টা ছিলেন । ১৯৭১ সালের জুন মাসে টাইমস পত্রিকায় মাসকারেনহাসের পাকিস্তানি হানাদার নিরস্র সাধারণ বাঙালিদের উপর হামলার বিবরণ পড়ে আমরা সম্যক উপলব্ধি করতে পারি পাকিস্তানিদের মনোভাবের প্রকৃত রূপ। সেদিনই লীডসে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট গঠিত হয়।
এর উদ্দেশ্য ছিল বাইরের পৃথিবীর কাছে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের আচরণ তুলে ধরা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন করা।
জামাল দম্পতি আমাদের সকল রকম সহযোগিতা করতেন। আমাদের সংগঠনের পক্ষে বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতাকামী প্রবাসী সংগঠনের সহযোগিতা আদায় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা দাবীর যৌক্তিকতা প্রচার করার কাজে তাদের অংশ গ্রহণ বিশেষ গুরুত্ববহ হয়েছিল । কারণ তারা সদ্য দেশ ফেরত এবং পরিস্থিতির শিকার।
লিবারেশন ফ্রন্ট অফিস সন্ধ্যায় সকল বাঙালীর মিলন ক্ষেত্র হয়ে উঠল। এখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঃবধপয-রহ ঢ়ৎড়মৎধস এ বিভিন্ন ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালী শিক্ষক গবেষকদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যোক্তিকতা এবং স্বাধীন দেশ হিশেবে তার টিকে থাকার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বিদেশি ছাত্র জনতার কাছে বিশ্লেষণ করাই ছিলো উদ্দেশ্য। এই অফিস থেকে দেশের প্রবাসী সরকারের সাহায্যার্থে অর্থ সহযোগিতা প্রেরণ এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের সহযোগিতায় বিভিন্ন সমাবেশে ও সকল কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণের আয়োজন করা হতো। সবকিছুতেই জামালদের অংশ গ্রহণ আমাদের সাংগঠনিক শক্তি ইংল্যান্ডের সকল শহরের উৎসাহী বাঙালিদের প্রশংসা কুড়িয়েছিলো।
আমাদের একটি প্রকাশনা শাখা ছিলো। সেখান থেকে নিয়মিতভাবে প্রতিমাসে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ নিয়ে তথ্যপূর্ণ রচনা ও মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ প্রকাশ করা হতো। এই কাজে জামাল ছিলেন সবচেয়ে উদ্যোগী। এই প্রকাশনার একটি সংখ্যায় শওকত ওসমানের ”নেকড়ে অরণ্য” লেখাটির তিনি ইংরেজিতে ড়িষভ ভড়ৎবংঃ নামে অনুবাদ প্রকাশ করেন। এতে প্রকাশনাটি বাঙালিদের মাঝে একটি ভালো মানের পত্রিকার মর্যাদা লাভ করে।
ওসমান জামাল ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। তাঁর সমাজচিন্তা সমাজবাদী আর্দশ দ্বারা প্রভাবিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ষাটের দশক থেকে যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন ইউরোপে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে সেখানে ছাত্র সমাজের মধ্যে আন্দোলনকারী দেশগুলোর পক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজনের মধ্যে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন লিডস বিশ্ববিদ্যালয়সহ উত্তর ইংল্যান্ডের সকল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে স্বাভাবিক অনুকূল সমর্থন লাভে সমর্থ হয়। এখানকার ভারতীয় ও পাকিস্তানী শ্রমিক সাধারণকে লিবারেশন ফ্রন্ট উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতা এক সময় আসে।
আমরা যেদিন স্বাধীনতা আসবে এমন প্রত্যয় লাভ করি সেদিন আমরা আনন্দিত। কিন্তু অন্যান্য দেশের আমাদের সহকর্মীরা মোটেও খুশি হয়নি। তাদের কথা, বাংলার স্বাধীনতা এসেছিলো সেদিন বুর্জোয়াদের জন্য, আপামর জনসাধারণের মুক্তি সুদূর পরাহত। এই শেষোক্ত দলের মানুষই জামাল। সাধারণ জনগণের মুক্তি তাঁর অভীষ্ট।