এ যুগের মোহনলাল কর্নেল জামিল

শঙ্কর প্রসাদ দে

পলাশীর প্রান্তরে যখন বাংলার শেষ স্বাধীন সূর্য ধীরে ধীরে আম্রকাননের পল্লব গুচ্ছের আভা ছড়িয়ে ভাগীরথীকে ব্যথিত করে বিদায় নিচ্ছিল তখন দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলা মৃত্যুর মুখোমুখি। হাতজোড় করে, বজ্রকণ্ঠে সেনাপতিদের কাছে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার আকুল আবেগ জানালেন। মীর জাফর আর রায়দুর্লভ ব্রিটিশের চেয়ে কয়েকগুণ শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তারা সিরাজের আসন্ন পরাজয়ে এবং তাঁর মৃত্যুদৃশ্য কল্পনা করে মুচকি হাসলেন।
অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র সৈন্য নিয়ে সেনাপতি মীর মদন এবং কাশ্মিরী ব্রাহ্মণ সন্তান সেনাপতি মোহনলাল বালির বাঁধের মতো দাঁড়িয়ে গেলেন নবারের সাথে। মীরমদন, মোহনলালের জানা ছিল, পরাজয় তাদের অবধারিত এবং মৃত্যুই তাদের শেষ এবং আসন্ন মুহূর্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে মীরমদন মৃত্যুবরণ করেন। মোহনলালের ব্যাপারে দু’ধরণের তথ্য মেলে। একটি সূত্র মতে মোহন লালও যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। আরেকটি সূত্র মতে ভগ্নী আলেয়ার গর্ভে সিরাজের পুত্র সন্তানকে বাঁচানোর লক্ষ্যে মোহনলাল ছদ্মবেশে ফেরারি জীবন বেছে নেন এবং সিরাজের একমাত্র ছেলেটিকে হিন্দু পরিচয়ে বড় করেন। শেষ কথা হলো, মীরমদন-মোহনলাল সিরাজকে বাঁচাতে পারেননি। সিরাজকে, লর্ড ক্লাইভের পাষণ্ডরা সপরিবারে হত্যা করেছিল।
কর্নেল (পরে মরণোত্তর ব্রিগ্রেডিয়ার) জামিল উদ্দীন আহমেদও বঙ্গবন্ধু এবং তার গোটা পরিবারকে রক্ষা করতে পারেননি। কিন্তু একটি জাতিকে চির অভিশাপের কলঙ্ক থেকে মুক্ত করে গেলেন। সিউল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইংরেজির অধ্যাপকের সাথে নামিয়ারা দ্বীপের আমার সাক্ষাৎ। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে বেশ সচেতন। দেখলাম, কোরিয়ান ঐ ভদ্রলোকের বাঙালি সম্পর্কে কেমন যেন বিরক্তির ভাব। একপর্যায়ে বলেই ফেললেন, বাঙালি একটি বেঈমানের জাতি। শেখ মুজিবের মতো জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে ফেললো। ভদ্রলোককে দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলাম, তোমাদের আধুনিকতার রূপকার জেনারেল পার্কও আততাতীয় হাতে নিহত হয়েছেন। খুনিরা যখন শেখ মুজিবের বাড়ি আক্রমণ করে তখন তার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিল নৈশ ড্রেসে নিজে গাড়ি চালিয়ে প্রেসিডেন্টকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। পরিষ্কার ইংরেজিতে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বললেন, এ তথ্য তাঁর জানা ছিল না। আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কর্নেল জামিলকে বীর হিসেবেই সম্মান করবে। বঙ্গবন্ধু সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকে ফোন করেছিলেন। তিনি কাপুরুষের মতো দেওয়াল টপকে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। যখন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, সেনাপ্রধানের হাতে ট্রুপস থাকে না। থাকে কমান্ডারদের হাতে । এর বাইরে তিনি যা করতে পারতেন, তা হলো একাই যেতে পারতেন এবং কর্নেল জামিলের ভাগ্যবরণ করতে হতো। আমি নিশ্চিৎ, আমার মতো গোটা জাতির বক্তব্যই তাই। তিনি অন্য কমান্ডারদের এ্যাকশনে যেতে আদেশ দিয়েছিলেন এমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু বলছেন, সশস্ত্র অবস্থায় রশীদ তাঁর অফিসে এসে তাঁকে রেডিওতে যেতে বাধ্য করে। সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত সেন্ট্রি এবং এডিসিদের ডিঙ্গিয়ে রশীদ তাঁর অফিসে ঢুকলো কি করে? এমনকি শাফায়াত জামিল পরিষ্কার ভাষায় বলে গেছেন, সেনাপ্রধান এবং উপসেনাপ্রধানের নিকট থেকে কোনরূপ নির্দেশ না আসায় তাঁর পক্ষে কিছুই করার ছিল না।
অথচ কর্নেল জামিল জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেলেন শফিউল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট অন্য সেনা কর্মকর্তাদের যুক্তিগুলো নেহাত কুযুক্তি। শফিউল্লাহর পর শেখ মনিকে ফোন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ততক্ষণে শেখ মনিকে মেরে ফেলা হয়েছে। এরপরেই এবং সর্বশেষ ফোনটি যায় কর্নেল জামিলের নিকট। তিনি বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের প্রধান ছিলেন। আসছি বলে ইউনিফর্ম ছাড়া ক্যাজুয়াল ড্রেসে পিজিআর গার্ডদের সবাইকে মুভ করার মতো পর্যাপ্ত জিপ না থাকায় তিনি একটি জিপে এবং আরেকটি জিপে যতজন পারা যায় তাদের নিয়ে ছুটলেন ৩২ নম্বরের দিকে। সোবহানবাদ মসজিদের সামনে এসে দেখলেন, ব্যারিকেড। একজন সুবেদার মেজর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাকে সোজা বললেন, আমি কর্নেল জামিল, আমাকে যেতে দাও। প্রেসিডেন্টের জীবন আক্রান্ত, সুবেদার মেজর রাজী হলেন, কিন্তু যমদূতের মতো হাজির হলো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বজলুল হুদা। সে পরিচয় পেতেই বললো, গুলি কর। জামিল তাঁর ড্রাইভার আইনউদ্দীনকে বললেন, গাড়ি চালাও। আইন উদ্দীন বললো, স্যার যাবেন না। এবার জামিল বললেন, তুমি নামো, তিনি নিজেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে ড্রাইভিং সিটে বসার পূর্বেই সুবেদার মেজরকে বজলুল হুদা গুলি করার আদেশ দিয়েছিলেন। সুবেদার মেজর ‘গুলি করতে পারবো না, স্যার’ বলার সাথে সাথে বজলুল হুদা নিজ স্টেনগান থেকে সাবাড় করলেন এক ম্যাগাজিন গুলি সিটের উপর। এক অকুতোভয় সেনা কর্মকর্তার জীবনাবসান হল ড্রাইভিং সিটে।
নাথুরাম গডসে ভারতবর্ষের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছে। সেটি ভারতীয় সংস্কৃতি নয়। ভারতীয় সংস্কৃতি হলো বহুমতের সহাবস্থান। জন এফ কেনেডীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মার্টিন লুথার কিংকে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রকাশ্য জনসভায়। ওসব আমেরিকান সংস্কৃতি নয়। আজকের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং গোটা পৃথিবীর বহু জাতের সহাবস্থানই আমেরিকার সংস্কৃতি। ঘাতক খন্দকার মোশতাক-ফারুক-রশীদ বাঙালির ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি নয়। আমাদের অহংকার কর্নেল জামিল। চাকরি জীবনে তিনি সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর সিনিয়র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাকুঞ্জে অবরুদ্ধ ছিলেন জামিল।
এজন্য শফিউল্লাহ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিনিয়িরিটি পাওয়ায় মেজর জেনারেল হতে পেরেছিলেন। ১৫ আগস্ট বিমান বাহিনী প্রধান ছিলেন এ কে খন্দকার। তাৎক্ষণিক এয়ার স্ট্রাইকে গেলে হত্যাকারীরা কাবু হতে বাধ্য ছিল। এজন্যই বলছিলাম, সময় এবং পরিস্থিতির কারণে অনেক অযোগ্য লোক ইতিহাসের নায়ক বনেছেন। তখন সিভিলিয়ান হয়েও কাদের সিদ্দিকী এবং মৌলভী সৈয়দরা সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে। অথচ সেনাপতিরা সুড়সুড় করে হাজির হয়েছিলেন রেডিও স্টেশনে মোশতাক সরকারকে সমর্থন দিতে। এ লজ্জা এবং কাপুরুষতা আমাদের কলঙ্ক। আমাদের গৌরব হলো। আমাদের অহংকার হলো কর্নেল জামিল উদ্দীন আহম্মদ। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এই হিমালয়সদৃশ কর্তব্যপরায়ণ বীর পুরুষ জীবনবাজি রেখেছিলেন।
তাঁকে মরণোত্তর বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। জাতির কয়েকটি সঠিক সিদ্ধান্তের এটি একটি। জামিলকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননায় ভূষিত করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা জানিয়ে দিলাম, এ জাতি বীরের জাতি, বীরকে সম্মান জানাতে, শ্রদ্ধা জানাতে, ভালবাসা জানাতে বাঙালি কার্পণ্য করে না।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট