এসএসসি পরীক্ষা ও কতিপয় প্রস্তাব

মাহমুদুল হক আনসারী

আর মাত্র কয়েকদিন পরেই এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আরম্ভ হবে। পরীক্ষার সময় ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবক সকলেই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় থাকেন। প্রশ্নফাঁসের বিষয় ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। সরকার থেকে পরীক্ষার ৩ দিন পূর্বে কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এসেছে। পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে ৩০মি. পূর্বে প্রবেশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মোবাইল ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
পরীক্ষার্থীরা পড়ালেখা করে পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকে। নিয়মিত ক্লাস ও অধ্যায়নপর্বের পর নির্দিষ্ট বছর শেষ করে পরীক্ষার মাধ্যমে তারা ভালো ফলাফল আশা করে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁস হওয়ার মতো মারাত্মক ভোগাচ্ছে সারাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের। ১ম শ্রেণি থেকে বিসিএস পরীক্ষা পর্যন্ত এ ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারি বেসরকারি নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নফাঁসের ব্যাধি ধরা পড়ছে। অনৈতিক, মেধাবিধ্বংসী এ চক্র শিক্ষা প্রশাসনের উপর থেকে নিচে পর্যন্ত সমপ্রসারিত বলে মনে হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী ও সমাজের শিক্ষিত সচেতন অভিভাবক মহল এ বিষয়ে এখন অনেকটা সোচ্চার। উদ্বিগ্ন আর উৎকণ্ঠার মধ্যে সুশীল সমাজ প্রতিরোধও সমাজ সচেতনতার কথা বলছে। প্রশ্নফাঁস চক্রকে প্রতিরোধ করতে কঠোর শাস্তির কথা বলা হচ্ছে। এ চক্রের হাত এতো সমপ্রসারিত ও রহস্যাবৃত যে খোদ প্রশাসনও তাদের খুঁজে বের করতে হিমশিম খাচ্ছে।
প্রশ্ন যারা তৈরি করেন এবং প্রস্তুত করেন, যাদের মাধ্যমে প্রশ্ন বিলি বণ্টন হয়, তারা যদি এ জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তাহলে কীভাবে এ অনৈতিক কাজ বন্ধ করা যাবে। সরকারের এতোগুলো গোয়েন্দা বিভাগ আছে, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয় সেটা সচেতন অভিভাবক মহল বুঝতে অক্ষম। অভিভাবক ও শিক্ষার্থী কোনোভাবেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না।
প্রশাসনের কতিপয় বক্তব্য আর পরীক্ষার কয়েকদিন আগে কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দিলেই কী প্রশ্নফাঁস বন্ধ হয়ে যাবে? প্রকৃত প্রশ্নফাঁস ষড়যন্ত্র যেখান থেকে শুরু সেখানেই এর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। আসল জায়গায় চিকিৎসা না করে ডাল পালা নিয়ে প্রতিরোধ করলে এর সুফল কতটুকু হবে সেটাও বিবেচ্য । জাতিবিধ্বংসী এ ব্যাধি থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে হবে। নজরদারি করতে হবে প্রশ্নপত্র তৈরি, সংরক্ষণ, বিলি বন্টনে। এ কাজে যারা নিয়োজিত তাদের কড়া নজরদারি রাখা চাই। অতিরিক্ত কড়াকড়ি ও জটিল কঠিন প্রশ্ন তৈরি করে ছাত্র-ছাত্রীদের যেনো উৎকণ্টায় পড়তে না হয় সেটাও সংশ্লিষ্টদের মাথায় রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা গ্রহণ ও সম্পন্ন করা অভিভাবক মহলের দাবি। সব ধরনের গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। পরীক্ষাকেন্দ্রে পরিদর্শকদের যে কোনো ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ পরীক্ষার্থীদের জন্য করুণ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কখনো কখনো কতিপয় শিক্ষকের অনৈতিকভাবে কিছু কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীকে অনৈতিক সুবিধাদেয়ার কথাও শুনা যায়, এসব পরিহারে কঠোর হতে হবে কেন্দ্র প্রশাসনকে। পরীক্ষা কেন্দ্রের আশেপাশে কোচিং সেন্টারের পক্ষ হতে তাদের সেন্টার ও কোচিং বাণিজ্যের লিফলেট-হ্যাণ্ডবিল প্রচার করতে গিয়ে পরীক্ষার্থীদের আলাদাভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রাস্তার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে গাড়ি পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোচিং সেন্টারের পোস্টার লিফলেট প্রচারপত্র বিলি পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশ থেকে বন্ধ করা চাই।
শহর গ্রামে লাখ লাখ পরীক্ষার্থী পরীক্ষার আগেও পরে পরিবহন সংকটে পড়ে। পরীক্ষার সময় পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকদের সমন্বয় করে পরীক্ষার্থীদের যেনো পরিবহন সংকট না হয় সেটিও প্রশাসনকে দেখতে হবে। রাস্তায় অহেতুক যানজট দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকা চাই। পরীক্ষার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় পরীক্ষার্থীরা মৃত্যুর খবরও আছে এসব বেদনাদায়ক। এ ব্যাপারে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা চাই, অভিভাবকদের পরীক্ষার্থী আনা-নেওয়ার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলির বিশেষ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসন এবং সকল পক্ষকে মনে রাখতে হবে, এই পাবলিক পরীক্ষা প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর জীবন গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিরাপদ যাতায়াত, স্বস্তিকর পরিবেশ নিশ্চিত করে সকল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান করা সংশ্লিষ্ট সকল প্রশাসনের একান্ত দায়িত্ব।

লেখক : গবেষক, কলামিস্ট