এসএসসিতে লাগাতার প্রশ্নফাঁস মেধাবীরা ক্ষতিগ্রস্ত

মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ

চলমান এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস চলছেই। বাংলা ১ম থেকে পদার্থ বিজ্ঞান; গতকাল পর্যন্ত যে আটটি বিষয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে তার সবকটি পরীক্ষার প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে। অথচ প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে প্রশাসনের তরফ থেকে কত কিছুই না করা হলো। পরীক্ষা সামনে রেখে সবধরনের কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া, আধ ঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের হলে প্রবেশে বাধ্যবাধকতা, পরীক্ষা হলের দুইশ মিটারের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং অতি সম্প্রতি ইন্টারনেট এর গতি কমিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও কোনমতেই ঠেকিয়ে রাখা যায়নি প্রশ্নফাঁস।
অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মতে, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেধাবী এবং যারা সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষার জন্য প্রস’তি গ্রহণ করেছে তারা। আগে থেকে প্রশ্ন পেয়ে ফাঁকিবাজ এবং ধুরন্ধর প্রকৃতির পরীক্ষার্থীরা যেমন রেজাল্টে প্রকৃত মেধাবীদের পিছিয়ে ফেলছে তেমনি মানসিকভাবেও আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে মেধাবীরা।
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি মাধ্যমের মেধাবী ছাত্র সৈয়দ মাশরাফি হোসেন ফাহাদ। শিক্ষক বাবা-মার কঠোর অনুশাসনে বড় হওয়া ফাহাদের এখনও মুঠোফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই বলে প্রশ্নফাঁসের অনৈতিক সুযোগ গ্রহণ করার তার কোন সুযোগই নেই বা এ ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। তবে ফাহাদের একটা আক্ষেপ আছে। ফাহাদ বলে, আমাদের সাথে একই হলে পড়েছে নগরীর আনকোরা কয়েকটি স্কুলের ছেলেমেয়ে। তখন খুব খারাপ লাগে যখন সারা বছর বইয়ের সাথে দূরতম সম্পর্ক না রাখা এসব ছেলেমেয়ে আধঘণ্টার বহুনির্বাচনী মাত্র ৫ থেকে ৭ মিনিটে দিয়ে হল থেকে গটগট করে বেরিয়ে যায়! যাওয়ার সময় তারা আবার আমাদের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছ্বিল্যের হাসি হেসে বলে, ‘তোমাদের টাকা নেই? প্রশ্ন কেনো না কেন?’
ফাহাদের শিক্ষক বাবা সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, এই যে একটার পর একটা প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এতে ফাহাদের মতো পড়-য়া ছেলেরা নম্বরের দিক থেকে তো পিছিয়ে যাচ্ছেই, এতে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানসিক দিকে। কারণ সে যখন পরবর্তী দিনের পরীক্ষার জন্য রাতের বেলায় প্রস’তি নিতে বসে তখন তার মনে আসে, আমার এত কষ্ট করে পড়ে লাভটা কি? যারা ফাঁসপ্রশ্নে পরীক্ষা দেবে তারাই তো বেশি নম্বর পাবে।
সৈয়দ মাহমুদ হোসেন আরও বলেন, চলমান এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা প্রথম থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যে ৮টি বিষয়ে পরীক্ষা হয়েছে, তার সবকটা পরীক্ষার প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে। যদি এসএসসিতে ১০০টা সাবজেক্ট থাকত তাহলে শিক্ষামন্ত্রী নিশ্চিত সেঞ্চুরি করতে পারতেন!
এক ঘণ্টা আগে প্রশ্নফাঁসে সৃজনশীল বিষয়ে খুব একটা লাভ হয় না জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাসিরাবাদ বালক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের এক শিক্ষার্থী সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ফাঁস হওয়া সবকটা প্রশ্নপত্র পরীক্ষার একঘণ্টা আগেই হয়েছে। এতে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের পুরো উত্তর তৈরি করে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকা সম্ভবপর হয় না। তবে এমসিকিউ তথা বহুনির্বাচনীতে পুরো নম্বর পাওয়া যায়।
একসময় এসএসসি পরীক্ষা এলে তা নিয়ে সবখানে একটা গম্ভীর আলাপ-আলোচনা হত। বলাবলি হতো এ পাড়া থেকে এবার দুজন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। এ কারণে আশপাশে মাইক বাজানো বা উচ্চস্বরে কথা বলা থেকে বিরত থাকত সবাই। পরীক্ষার্থীদের জন্য মসজিদে-মন্দিরে দোয়া চেয়ে প্রার্থনা হতো। আগে একজন পরীক্ষার্থী সামনে পড়লে বড়রা জিজ্ঞেস করত- ‘বাবা, তোমার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে, সব প্রশ্ন কমন আসছে তো?’ কিন’ বর্তমানে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করে- ‘কিরে, আজকে প্রশ্ন পাসনি?’ এ ছোট্ট নমুনা থেকেই বুঝা যায়, এসএসসি পরীক্ষার মতো এ মহাগুরুত্বপুর্ণ পরীক্ষাটি বর্তমানে তার অনেকখানি গাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলেছে!
এ ব্যাপারে কথা হয় কবি-সাংবাদিক আবুল মোমেন এবং ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সিকান্দার খান এর সঙ্গে।
আবুল মোমেন সুপ্রভাতকে বলেন, প্রশ্নফাঁসের মতো এ জঘন্য অনৈতিক কাজটি আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস’ারই একটা চূড়ান্ত ফলাফল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ব্যবস’াটাকে কোচিং, গাইড বুক এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক বানিয়ে ফেলেছি। এখন আমরা এই অব্যবস’ার চূড়ান্ত ফল হাতেনাতে পাচ্ছি। এতে আসল পড়-য়া ও মেধাবীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের বিচলিত না হওয়ার জন্য আমি পরামর্শ দেব।
অধ্যাপক সিকান্দর খান বলেন, এই প্রশ্নফাঁসের কারণে মেধাবীরা মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত হবে, তাদের মন ভেঙে যাবে। যদিও এক ঘণ্টা আগে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে বলে বেশি নম্বরের সুবিধা হয়ত তারা নিতে পারছে না। কিন’ মেধাবীরা এক্ষেত্রে বেশি পিছিয়ে পড়ছে মানসিকভাবে। তারা প্রতিযোগিতার মানসিকতা হারিয়ে ফেলছে, তাদেরকে আবার নতুনভাবে জাগাতে অভিভাবকদের বেশ বেগ পেতে হবে।