এম্পেরর পেঙ্গুইন

উৎস পিয়াল

“আইস এজ” নামের হলিউডের জনপ্রিয় অ্যানিমেটেড মুভিতে পেঙ্গুইনের অভিনয় দেখে মজা পায়নি এমন মানুষ হয়তো খুব কমই আছে। পেঙ্গুইন শব্দটির উৎপত্তি ওয়েলস এর ভাষা হতে। যার অর্থ হল সাদা মাথা কোন প্রাণী। কিন’ আড়্গরিক অর্থ বাদে বাসত্মবে পেঙ্গুইন শব্দটি শুনলে আমাদের চোখের সামনে সাদা কালোর মিশ্রণে এক নিরীহ প্রাণীর ছবি ভেসে ওঠে যারা বরফের গায়ে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলেছে। অন্যান্য পাখির চেয়ে এরা অনেকটাই ভিন্ন বটে। বিবর্তনের কারণে যেসব পাখি উড়বার ড়্গমতা হারিয়েছে তন্মধ্যে একটি প্রজাতি হলো এই পেঙ্গুইন পাখি। আজ জানাবো পেঙ্গুইন প্রজাতীর সবচেয়ে বড় প্রজাতি এম্পেরর পেঙ্গুইন নিয়ে।

এম্পেরর পেঙ্গুইন অথবা সম্রাট পেঙ্গুইন হলো পেঙ্গুইন প্রজাতির সবচেয়ে লম্বা এবং সবচেয়ে ভারী প্রজাতি। এদের বসবাস মূলত এন্টার্কটিকা মহাদেশে। এরা উচ্চতায় ১.৩মিটার এবং ওজনে ড়্গেত্রবিশেষে ২২-৪৫ কেজি পর্যনত্ম হয়ে থাকে। এদের মাথা এবং পিছনের অংশ কালো, বুক ফ্যাকাশে হলুদ এবং কানে উজ্জ্বল হলুদ রঙের দাগ দেখতে পাওয়া যায়। পাখনাগুলো চ্যাপ্টা হওয়ায় সামুদ্রিক আবহাওয়ায় শক্তিশালী ফ্লিপারের মতো কাজ করে। প্রধান খাদ্য হিসেবে মাছ, স্ক্রিল, স্কুইড ইত্যাদি গ্রহণ করে থাকে।

গবেষণায় প্রাপ্ত রেকর্ড অনুসারে এরা প্রায় ১৮ মিনিট ধরে জলে ডুবে থাকতে পারে। হিমশীতল পানিতেও প্রায় ৫৩৫মিটার(১৭৫৫ ফুট) গভীরতা পর্যনত্ম ডুব দিতে সড়্গম। অসাধারণ এই অভিযোজন ড়্গমতার কারণ তাদের হিমোগেস্ন্লাবিন। খুব কম অক্সিজেনও যা খুব কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। বায়োট্রমা কমাতে এদের শরীর প্রচ- শক্ত হাড় দিয়ে গঠিত।

এরা এন্টার্কটিকা মহাদেশে প্রজনন করে থাকে। এদের তিন বছর বয়স হতেই প্রজনন শুরম্ন হয় । প্রজননের জন্য এরা প্রায় ৫০-১২০কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করে। পুরম্নষ পেঙ্গুইন তার সঙ্গিনী খোঁজবার জন্য “কোর্টশিপ কল” দিয়ে থাকে। স্ত্রী পাখিটি ডাকে সাড়া দেয় এবং পুরম্নষ পাখির সাথে মিলিত হয়। ডিম পাড়ার পর স্ত্রী পাখিটি পুরম্নষ পাখিকে ডিম স’ানানত্মর করে। ডিম স’ানানত্মরের প্রক্রিয়ায় সাবধান থাকতে হয়। তাপমাত্রা সাব-ফ্রিজিং থাকায় ডিমটি এক-দুই মিনিটের বেশি সহ্য করতে পারে না। তাই অনেক সময় ডিম ফেটে যায়। স্ত্রী পাখি একবারে একটি ডিম দিয়ে থাকে। ডিম স’ানানত্মরের প্রক্রিয়ায় কোন দম্পতি যদি একটি ডিম হারায় তাহলে তাদের সম্পর্ক সেখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে। ডিম স’ানানত্মরের পর স্ত্রী পাখিটি খাবার সন্ধানে বেরিয়ে পরে দু’মাসের জন্য। এ দু’মাস পুরম্নষ পাখিটি নিজের ব্রম্নড থলিতে ডিমটিকে তা দিয়ে রাখে।

শুধুমাত্র এম্পেরর পেঙ্গুইন এর প্রজাতিতেই এই আচরণটি লড়্গ্য করা যায়। দু’মাস ধরে পুরম্নষ পাখিটি কোনো ধরনের খাবার খায় না। এ কারণে শরীরের ১২ কেজির মতো ওজন কমে যায়। এজন্য এই প্রজাতির পেঙ্গুইনের ওজন ঋতুভেদে ভিন্ন হয়। ডিম ফোটার পর পুরম্নষ পাখিটি বাচ্চাকে দই জাতীয় খাবার খাওয়ায়। দু’মাস পর স্ত্রী পাখি নিজের পাকস’লীতে বাচ্চার জন্য খাবার নিয়ে আসে। স্ত্রী পাখি আসার পর পুরম্নষ পাখি খাবার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। পুরম্নষ পাখি ৩-৪ সপ্তাহের মধ্যে খাবার নিয়ে ফিরে আসে। সঙ্গিনীকে খুঁজতে স্পেশাল ফ্রিকোয়েন্সির কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে থাকে। সনত্মানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব যে কেউ এড়াতে পারে না তা এদের দেখলেই বোঝা যায়।

আকারে বেশ বড় হলেও এ পেঙ্গুইন প্রজাতি লিউপার্ড সীল ,সামুদ্রিক পাখি এবং তিমির শিকারে পরিণত হয়। ২০১২ সালে আইইউসিএন পেঙ্গুইনের বাকি ৯টি প্রজাতিসহ এই প্রজাতিকে বিপন্ন প্রাণী বলে ঘোষণা করে। তবে উত্তর আমেরিকা আর এশিয়ার কিছু চিড়িয়াখানায় এদের প্রদর্শন হয়ে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন, মনুষ্য দ্বারা প্রজনন ড়্গেত্র ধ্বংস আজ তাদের বিপন্ন হতে বাধ্য করেছে।

বর্তমানে এন্টার্কটিকা ইকোসিস্টেম মানুষের ক্রিয়াকলাপ এবং সম্পূর্ণ বিশ্বের জলবায়ু নিয়ে ধারণা দিয়ে থাকে। গুরম্নত্বপূর্ণ এই ইকোসিস্টেমের খাদ্যশৃঙ্খলকে বজায় রাখতে এদের ভূমিকা কি তা আর বলার অপেড়্গা রাখেনা। পরিশেষে, পেঙ্গুইন এবং পৃথিবীর বাকি সব বিপন্ন প্রাণী সংরড়্গণের দায়িত্ব আমাদের।সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে প্রাণী সংরড়্গণের এই দায় আমরা এড়াতে পারি না।