পাহাড়ে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন

‘এদেশে আদিবাসীরা ভূমি থেকে উৎখাত হচ্ছে’

সুপ্রভাত ডেস্ক

গতকাল ছিল আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। দিবসটিকে কেন্দ্র করে রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন সংগঠন র্যালি ও সভা-সমাবেশের আয়োজন করে। এতে বক্তারা বলেন, এদেশের আদিবাসীরা ভূমি থেকে উৎখাত হচ্ছে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর।
রাঙামাটি : রাঙামাটির সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার বলেছেন, ‘আজ এদেশের আদিবাসীরা ভূমি থেকে উৎখাত হচ্ছে। সারাবিশ্বে আদিবাসীদের প্রধান সমস্যা হলো দেশান্তর। তারা এদেশে টিকে থাকতে পারবে কিনা, এ নিয়ে সংশয়ে আছে। কিন’ মনে রাখতে হবে, পিছিয়ে পড়াদের ঠেলে দিয়ে সোনার বাংলা গড়া অবাস্তব স্বপ্ন।’
গতকাঅল ৯ আগস্ট সকালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে রাঙামাটিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো হস্তান্তরিত হয়নি। আমি এমপিগিরি করেও পাহাড়ের মানুষের জন্য কিছুই করতে পারছি না। ন্যায্যবিচার যতদিন হবে না, সুশাসন যতদিন না হবে; ততদিন নাগরিক তার অধিকারও ফিরে পাবে না।’
ঊষাতন বলেন, ‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানান বিতর্ক রয়েছে। নিজেদের আদিবাসী অধিকার চাওয়া কখনোই রাষ্ট্রবিরোধী কাজ নয়। আজ এদেশের আদিবাসীরা শ্বাসরুদ্ধকর অবস’ায় বেঁচে আছে। এখানে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়ানো হয়েছে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর দমন-নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য এদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন’ এদেশে আজও আদিবাসীরা নিপীড়িত, তারা আজও পিছিয়ে আছে। এরা পাহাড়ের মানুষ, আদিবাসী মানুষ, পাহাড়ের আদিবাসীরা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, তারা বাংলাদেশেরই নাগরিক।’
পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কথা উল্লেখ করে জনসংহতি সমিতির এই নেতা বলেন, ‘যারা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, তাদের সাজানো সংঘাতে জড়িত হয়েছেন। আপনাদের সংঘাত ছেড়ে এগিয়ে আসতে হবে। সংগ্রাম ছাড়া অধিকার আদায় হবে না। আমাদের সবাইকে এক সাথে সংগ্রাম করতে হবে।’
দেশকে মাদকের ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে তিনি যুবসমাজের উদ্দেশে বলেন, মাদক নয়, যুবসমাজকে খেলাধুলার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে।
এর আগে সকালে ‘আদিবাসী জাতীসমূহের দেশান্তর : প্রতিরোধের সংগ্রাম’ এ স্লোগান সামনে রেখে রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে
দিবসটির উদ্বোধন করেন অতিথিগণ। পরে আদিবাসী নৃত্য পরিবেশিত হয়। নৃত্য পরিবেশন শেষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জর চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতীয় মানিবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ও শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান, পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক ফোরামের সভাপতি শিশির চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্ক-এর সহসাধারণ সম্পাদক থোয়াই অং মারমা, সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য চাঁদ রায়, সদর উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রীতা চাকমা প্রমুখ। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টুমনি তালুকদার।
আলোচনা সভা শেষে আদিবাসী দিবসের বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়। র্যালিটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা শিল্পকলা একাডেমি এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
এ সভায় বক্তারা বলেন, ‘চুক্তি করেও আজ চুক্তির বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আদিবাসী হিসেবে আমরা নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা সুরক্ষিত দেখতে চাই। পাহাড়ে আজ বিচ্ছিন্নভাবে নয়, নিয়মিতভাবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষকেরা আটক হলেও ‘আইনের ফাঁক-ফোকর’ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। দেশে আইন থাকলেও আইনের বাস্তবতা নেই। আমরা পার্বত্য চট্ট্রগামসহ সারাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি চাই।’
বান্দরবান : নানা আয়োজনে বান্দরবানে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে দিবসটি উপলক্ষে শহরের পুরাতন রাজবাড়ি মাঠ থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বমসহ ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং সাজসজ্জা নিয়ে অংশগ্রহণ করে। বিভিন্ন দাবি সম্বলিত ব্যানার ফেস্টুন প্লেকার্ড নিয়ে র্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ মেষে অরুণ সার্কী টাউনহল মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে আলোচনায় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক হোসাইন কবির।
আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির সভাপতি জলি মং মারমার সভাপতিত্বে সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কেএস মং, জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াই চ প্রু মাস্টাার, রাজপুত্র নুসে প্রু মারমা, জনসংহতি সমিতির সভাপতি উছোমং মারমা, রোয়াংছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংথোয়াই চিং মারমা, মানবাধিকার নেত্রী ডনাই প্রু নেলী, পাহাড়ি গবেষক লেলুন খুমি প্রমুখ।
সভায় অধ্যাপক হোসাইন কবির বলেন, পাহাড়িদের আদিবাসী হিসাবে স্বীকৃতির দাবি বহুদিনের। দেশে বসবাসরত পাহাড়িরা প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পাহাড়ি জাতিসমূহের অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন রচনায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন চলে।
খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়িতে বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করেছে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-খাগড়াছড়ি শাখা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আলাদা আলাদাভাবে দিসবটি পালন করে সংগঠন দুটি। সদরের রাজ্যমনি পাড়া থেকে র্যালি বের করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-খাগড়াছড়ি জেলা শাখা। র্যালিটি শহীদ কাদের সড়ক হয়ে শহরের শাপলা চত্বর ঘুরে এসে য়ংড বৌদ্ধ বিহারে এসে শেষ হয়। পরে মানববন্ধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের কলেজ শাখার সভাপতি মাপ্রু মারমা, ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বিপুল ত্রিপুরা, নারীনেত্রী নমিতা চাকমা। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম- খাগড়াছড়ি জেলা শাখার আহ্বায়ক চাইথোয়াই মারমা। র্যালি ও আলোচনা সভায় আদিবাসী ফোরাম, আদিবাসী কোয়ালিশন, বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল, বাংলাদেশ ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামসহ বিভিন্ন সামজিক সংগঠন অংশগ্রহণ করে।
অপর দিকে সকাল সাড়ে ১০ টায় খাগড়াছড়ি সদরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে আলোচনা সভার আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা। এছাড়া বক্তব্য রাখেন জেএসএস সদর উপজেলা শাখার সভাপতি কিরন চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুমেধ চাকমা, সমাজকর্মী রবি শংকর তালুকদার। সভাপতিত্ব করেন জনসংহতি সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক বিভুরঞ্জন চাকমা।
বক্তারা বলেন, বিশ্ব আদিবাসী দিবস সরকারিভাবে পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে নানা আনুষ্ঠানিকতায় পালন করার কথা। কিন’ আদিবাসীদের সরকারি স্বীকৃতি না থাকায় তারা সেভাবে দিনটি উদযাপন করতে পারছেন না। তারা অবিলম্বে সাংবিধানিকভাবে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানান। সভায় সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে।
এদিকে একই সময়ে শহরের শাপলা চত্বরে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবি সংক্রান্ত সকল অপপ্রচার বন্ধ করার জন্য খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন করেছে পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ সভাপতি মো. মাঈন উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক এসএম মাসুম রানা, যুগ্ম সম্পাদক মো. জাহিদুল ইসলাম, বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ মানিকছড়ি উপজেলা সভাপতি মোক্তাবির হোসেন, দীঘিনালা উপজেলা সভাপতি আলামিন হোসেন, সাবেক সভাপতি মো. সাদ্দাম হোসেন, পানছড়ি উপজেলা সভাপতি সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, মাসুদ রানা।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশে কোনো আদিবাসী না থাকা সত্ত্বেও পাহাড়িরা নিজেদের আদিবাসী দাবি করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তারা সরকারের প্রতি আদিবাসী স্বীকৃতি সংক্রান্ত সকল অপপ্রচার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।
দীঘিনালা : আদিবাসী জনগণের দেশান্তর প্রতিরোধসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবীতে র্যালি ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার উপজেলা আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত র্যালিটি উপজেলার লারমা স্কোয়ার থেকে শুরু হয়ে উপজেলা জনসংহতি সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়।
সমাবেশে উপজেলা জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-এমএন লারমা) সভাপতি মৃণাল কান্তি চাকমার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক প্রফুল্ল্ল কুমার চাকমা। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন উপজেলা জেএসএস সহসভাপতি শান্তি লোচন দেওয়ান, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সুসময় চাকমা, চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পরিচালক আনন্দ মোহন চাকমা, বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চয়ন বিকাশ, দীঘিনালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রজ্ঞান জ্যোতি চাকমা, বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তোষ জীবন চাকমা, উপজেলা হেডম্যান এসোসিয়েশনের সভাপতি হেমব্রত কার্বারি এবং উপজেলা জেএসএস সদস্য সমীর চাকমা ।
আলোচনা সভায় বক্তারা আদিবাসী জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান।