‘এতদিন কোথায় ছিলেন’!

সুভাষ দে

গত ২৯ জুলাই ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দীয়া খানম ও আব্দুল করিম রাজীবের মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের সপ্তাহব্যাপী আন্দোলন রাষ্ট্রের নিঃশব্দতার দেয়াল ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছাড়া আর কোনো আন্দোলন রাষ্ট্র, প্রশাসন, সমাজকে এত গভীরভাবে আন্দোলিত করতে পারেনি। আন্দোলনকারী শিশু-কিশোরদের স্লোগানে, প্ল্যাকার্ডে যে বাণী উচ্চারিত হয়েছে তা আবেগ, মানবিকতা আর ক্ষোভ-প্রতিবাদের শব্দাবলীতে পরিপূর্ণ হয়েছে। এসব শব্দাবলী রাষ্ট্র, প্রশাসন, সমাজের নিঃশব্দতার দেয়ালে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। কায়েমী স্বার্থের সাজানো বাগান তছনছ করে দিয়েছে আর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে বড়োদের কাছে, ‘তোমরা এতদিন জাগনি কেন’? প্রতিদিন সড়কে নিরীহ প্রাণের বলি হচ্ছে, মায়ের কোল খালি হচ্ছে, স্বজন হারানোর বেদনায় কত পরিবারে কান্নার রোল উঠেছে, পরিবারের নির্ভরতার আকাশ ভেঙে পড়েছে রাজপথে- তোমরা কেন চুপ করে ছিলে? অযুত লক্ষ কণ্ঠে তোমরা কেন উচ্চারণ করনি, এভাবে মানুষের জীবন নেয়া চলতে পারে না। দিনের পর দিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিরীহ মানুষের প্রাণ ঝরেছে। চিরতরে পঙ্গু হয়েছে শত শত মানুষ। হতাশা-অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আচ্ছন্ন করেছে পরিবারকে-কেউ তার হিসাব রাখেনি। অথচ সাংবিধানিকভাবে এর খোঁজ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা দিতে সাংবিধানিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। মন্ত্রীরাও সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষায় শপথ নেন, তাহলে প্রতিদিন সড়কে যে সব দুর্ঘটনা ঘটছে, প্রাণ ঝরছে অকালে, তার দায়-দায়িত্ব কেন রাষ্ট্র, মন্ত্রী-আমলারা নেবেন না? এক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, গত ৩ বছরে ২৫ হাজারের মতো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। আহত আরো কয়েক হাজার।

শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা কেবল ‘নিরাপদ সড়কের’ দাবিতে প্রতিবাদ-আন্দোলন করেনি তারা নিরাপদ সড়ক ব্যবস’াপনা কিভাবে করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছে। তারা যানবাহন ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করে যেগুলি ঠিক পায়নি সেগুলির জন্য মামলা করতে ট্রাফিক পুলিশের হাতে কাগজপত্র তুলে দিয়েছে। রিকশার লাইন ঠিক করে দিয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের জন্য ‘ইমারজেন্সি লেন’ করে দিয়েছে। রং সাইডে যাওয়া মন্ত্রী-আমলার গাড়ির আটকে দিয়েছে, পথচারী পারাপার নিরাপদে করে দিয়েছে। কোথাও কোন চালক কিংবা পরিবহন শ্রমিকের সাথে তাদের বচসা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
তারা ‘নিরাপদ সড়কের’ জন্য ৯ দফা দাবি সরকার ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছে। তাদের দাবিগুলির যৌক্তিকতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বীকার করে দ্রুত সে সব বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যেতে আহবান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘নিরাপদ সড়কের’ জন্য শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওযার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সড়ক পরিবহন আইন (খসড়া) মন্ত্রিসভায় উপস’াপন এবং অনুমোদন করা হয়।
তাহলে আইনটি তৈরি হলেও কেন হিমাগারে রেখে দেওয়া হয়েছিল? মন্ত্রী-সাংসদ-সরকারি কর্মকর্তারা এখন শিশুদের আন্দোলনের প্রশংসা করে সুন্দর সুন্দর বাক্য রচনা করছেন। তাদের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন। তাহলে আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন?
পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাঈদুর রহমান পায়েলের জীবনের করুণ পরিসমাপ্তির কথা ভুলে যাননি। দুই বন্ধুসহ হানিফ পরিবহনের বাসে ঢাকায় যাচ্ছিলেন তিনি। ঢাকার অদূরে বাস জ্যামে পড়লে পায়েল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাস থেকে নামে। ইতোমধ্যে জ্যাম ছুটে গেলে বাসটি যাত্রা শুরু করে, পায়েল দ্রুত বাসে উঠতে গিয়ে আঘাত পেয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। এ অবস’ায় বাসের চালক-সহকারীরা তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে নিকটস’ নদীতে ফেলে দেয়। তাতেই পায়েলের মৃত্যু ঘটে। পায়েলের এই মর্মান্তিক মৃত্যু এবং বাস শ্রমিকদের নির্দয় আচরণের খবর দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করে। মুন্সিগঞ্জের পুলিশকে ধন্যবাদ, তারা পায়েলের লাশ উদ্ধার করে এবং দোষী পরিবহন শ্রমিকদের আটক করে।
পায়েলের মা সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘আমার ছেলেকে ওরা রাস্তায় ফেলে রেখে গেলে ও বাঁচতে পারতো’। তাঁর এই হাহাকার এখনো আমাকে বিষাদে আচ্ছন্ন করে দেয়। পরিবহন মন্ত্রী কিংবা শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা যিনি আবার মন্ত্রী-তাঁরা তো কেউ পায়েলের মায়ের কাছে ছুটে যাননি সান্ত্বনা দিতে। এ তো তাঁদের দায়, সরকারের দায়। প্রশাসন কি এতই নির্মোহ-নির্বিকার যে মৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক ঘটনাবলীতে তাদের আঁচড়ও লাগবে না। তাহলে আজ কেন তাঁরা এত ভাল ভাল কথা বলছেন, শিশুদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন!
শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২ শিক্ষার্থীকে বাস চাপা দেওযার কথা স্বীকার করেছেন ঘাতক বাসটির চালক। তিনি বলেছেন, অধিক যাত্রী পেতে তিনি ২/৩টি বাসের সাথে রেষারেষিতে লিপ্ত হয়ে এই নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছেন। প্রতিটি দুর্ঘটনার যদি স্বাভাবিক তদন্ত হতো, কারণ উদঘাটনের চেষ্টা হতো, তাহলে প্রতিকারের পথ কিছুটা হলেও বের করা যেতো। মালিক সমিতি অথবা শ্রমিক সংগঠন কোন দুর্ঘটনার কারণ জানার চেষ্টা করেনি।
মালিক সমিতিতে সরকার, সরকারবিরোধী নানা রাজনৈতিক দলের লোক রয়েছেন। মালিক সমিতির সভাপতি সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী। ডান-বাম-মধ্য সকল রাজনৈতিক দলের নেতারাও পরিবহন শ্রমিক সংগঠনে যুক্ত ছিলেন, এখনও আছেন, তারাও শত শত মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে পাচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেক চালক, সহকারী শ্রমিকও আছেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নির্দিষ্টকরণ, তাদের নিয়োগপত্র, বেতন, বিশ্রাম, বিনোদন, প্রশিক্ষণ এসব নিয়ে মালিকদের ওপর, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, আন্দোলন করে তাঁরা দাবি আদায় করতে পারেননি। শ্রমিকদের মধ্যে মানবিক চেতনা, মমত্ববোধ এসব সঞ্চারিত করতে পারেননি। দীয়ার বাবা একজন বাস চালক, বাস মালিক কিংবা শ্রমিক সংগঠন তাঁর প্রতি আনুষ্ঠানিক সংহতি জানিয়েছে কি? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দীয়াদের বাসায় গিয়ে প্রথমে সান্ত্বনা দেয়ায় পরিসি’তি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হয়েছে।
নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের চাপের মুখে তাঁদের বাসায় গিয়েছেন, নিজের অপরাধের দায় কিছু মোচন করতে!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিগত ঈদের পূর্বাপর যানবাহন দুর্ঘটনায় বিপুল সংখ্যক প্রাণ ঝরে যাওয়ায় সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে কয়েক দফা নির্দেশনাও দিয়েছিলেন এবং তা মনিটর করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন কিন’ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের দেড় মাসের মধ্যে তারা একবারও বৈঠকে মিলিত হয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রীর ঐ নির্দেশে দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প ড্রাইভার রাখা, তাদের জন্য পথে বিশ্রামাগার স’াপন, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের লাইসেন্স না দেয়া এবং আরো কিছু সচেনতামূলক নির্দেশনা ছিলো। মন্ত্রীরা যদি একটু সক্রিয় হতেন মালিক-শ্রমিকদের দায়িত্ববোধ ও মানবিকবোধে উদ্বুদ্ধ করতেন তাহলে হয়তো পায়েল, দীয়া, রাজীবদের প্রাণ হারাতে হতো না।
কিশোর শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস’াপনায় যে দৃষ্টান্ত স’াপন করেছে তার জের ধরে বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু হয়েছে। যদিও এটি বিশেষ কিছু করবে না, তবু ন্যায়-নীতির লক্ষ্যে যাত্রা তো শুরু করা গেল। মালিক সমিতি ফিটনেসবিহীন যান রাস্তায় চালাতে দেবে না বলেছে, চালকদের সাথে চুক্তিতে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে- এ কাজগুলি কেন আগে করা হয়নি? কেন মুনাফার জন্য উন্মত্ত প্রতিযোগিতা, রেষারেষিতে চালকদের নামিয়ে দেয়া হলো। মালিক সমিতি কিছু তৎপরতা দেখালেও পরিবহন শ্রমিক-সংগঠনগুলিকে তৎপর দেখা যাচ্ছে না।
অথচ ‘নিরাপদ সড়ক’ ব্যবস’াপনায় তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব বেশি। শ্রমিক সংগঠনগুলিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের আলোকে অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের করণীয় আছে। চালক-সহকারীদের নিয়োগ, বেতন, মজুরি, প্রশিক্ষণ, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ প্রভৃতি বিষয় ঠিক হলে, সর্বোপরি কর্ম-পরিবেশ উন্নত হলে, যাত্রীদের সাথে সহমর্মিতা তৈরি হলে, মানবিকবোধের উজ্জীবন ঘটলে বর্তমান পরিসি’তির গুণগত উত্তরণ ঘটবে। নিরাপদ সড়কের জন্য ছোটদের আন্দোলন সরকার থেকে শুরু করে সকল মহলের সমর্থন ও শুভেচ্ছা পেয়েছে, তার প্রধান কারণ, এই আন্দোলনে তাদের কোন স্বার্থ কিংবা লাভালাভের বিষয় ছিল না, তাদের নিষ্পাপ ও নির্মল চিত্তের স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে এতে। তাদের আবেগীয় ও মানবীয় উচ্চারণগুলি প্রশংসা পেয়েছে, বস’ত এটি ছিল এক ভিন্নধর্মী আন্দোলন যা জীবনের দাবি থেকে উৎসারিত।
আমরা বড়রা আন্দোলনে লাভক্ষতি-স্বার্থের বিষয়গুলি প্রধান বিবেচনায় আনি, ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে দেখি আন্দোলনকে, যেভাবেই হোক না কেন পরিবর্তনকে নিজেদের স্বার্থে টেনে আনতে চাই, এখানে হয়েছেও তাই যখনই বড়রা যুক্ত হলো আন্দোলনে তখন সেটি শিশু-কিশোরদের মতো ‘নির্দোষ’ থাকল না, নানা মত, পথ খোঁজা শুরু হলো। সরকারও এই পরিসি’তির সুযোগ নিতে ছাড়েনি। তারা তাদের মতো করে পরিসি’তি মোকাবেলা করেছে।
তবে স্বস্তি এই, শিশু-কিশোররা এরই মধ্যে ক্লাসে ফিরে গেছে। অভিভাবকদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে, শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে জীবনের বিচিত্র পাঠ নেবে কিন’ দাবি জানানো, দাবি আদায়ের যে পথটি তারা দেখালো তা অভিনব, সমস্যার গভীরতা উন্মোচন করেছে একেবারে সহজ সরল বাক্যে, সমাধানের পথটিও চিনিয়েছে অনন্যসাধারণ পথে। শিশু-কিশোরদের এই মানবীয় উচ্ছ্বাস মানবিক শক্তির নব উদ্বোধন ঘটিয়েছে।