এটা আমার একার গল্প নয়

ইফতেখারুল ইসলাম

বড়রা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছোটরা অস্থির। মিনু আপা আর তাঁর স্বামীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের এই নতুন দুলাভাই, আজিজ ভাই অর্থাৎ এম এ আজিজ আয়কর বিভাগের নবীন কর্মকর্তা। দিনাজপুরে তাঁর প্রথম পোস্টিং। মিনু আপা তাঁর সঙ্গে সেখানেই থাকেন। আর আছে তাঁদের শিশুকন্যা শাওন। পঁচিশে মার্চের পর থেকে তাঁদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এপ্রিল প্রায় শেষ। কিন্তু তাঁদের ব্যাপারে কোনো খোঁজ-খবর করার মতো পরিস্থিতি নেই দেশে। ফুপু আর ফুপা চট্টগ্রাম শহরে থাকেন। তাঁরা কতোটা অস্থির সেটা বুঝলেও করার তো কিছু নেই।
বিয়ের অল্প কিছুদিন পর এই ফুপাতো বোনটি তাঁর নতুন বরকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের রায়েরবাজারের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। সেটা সম্ভবত উনসত্তর সালের শেষদিকের কথা। মিনু আপার কাছ থেকেই জানতে পারি, আজিজ ভাই গান গাইতে জানেন। তক্ষুনি সবাই তাঁকে গান শোনানোর জন্য অনুরোধ করতে থাকি। শিল্পীরা এত সহজে গান শোনাতে রাজি হয় না। অন্যান্যের সঙ্গে আমার আব্বাও তাঁকে অনুরোধ করেন একটা গান শোনানোর জন্য। এই মামা শ্বশুরকে সব জামাই-ই বাড়তি সম্মান করেন। তাঁর অনুরোধে খালি গলায় আজিজ ভাই গেয়ে শোনালেন, ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা…।
ওই সময়টিতে আমাদের দেশ-ভাবনার উত্তরণ ঘটছিল। স্কুলের ছাত্র হিসেবে দেখছি চারদিকে জাগরণের ঢেউ আর স্বাধিকার- চেতনার উন্মেষ। সেই সময় একটা গান গেয়ে এই যুবক আমাদের বালক-হৃদয় জয় করে নিলেন। তারপর অনেকদিন তাঁদেরকে দেখিনি। শুনেছি চাকুরিসূত্রে আজিজ ভাই দিনাজপুরে আছেন। তাঁদের শিশুকন্যাটির নাম রাখা হয়েছে শাওন।
মার্চের উত্তাল সময়ে সবাই সবার খোঁজ-খবর নিতে পেরেছে। সেই যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পঁচিশে মার্চ গণহত্যা শুরু হবার পর। কয়েকটা সপ্তাহ পর সবাই আবার আপনজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করছে। কে কোথায় আছে, কাকে চিরতরে হারিয়েছি সেটা তখনও জানি না। শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। কে কীভাবে তাতে যোগ দিতে যাচ্ছেন সেটাও খুব স্পষ্ট নয়। বড়দের আলাপ-আলোচনা থেকে বুঝতে পারি আজিজ ভাই আর মিনু আপার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
এরকম আরো অনেক পরিচিতজনের কথা শুনি। শুনি তাঁরা যুদ্ধে গিয়েছেন। কিছুদিন পরে খবর এলো আজিজ ভাই যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। দিনাজপুরে ডিসি, জেলা জজ, অন্যান্য অফিসার আর নাগরিক সমাজকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদ। এভাবেই তাঁদের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু। তারপর আরো প্রশিক্ষণ এবং বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। আর মিনু আপা সম্ভবত ভারতে। কীভাবে তাঁরা সেখানে পৌছালেন? কোথায় কীভাবে থাকছেন ছোট্ট শিশুটিকে নিয়ে?
সেই দিনগুলোর কথা পরে শুনেছি তাঁদের মুখে। মার্চের তিরিশ তারিখে দিনাজপুরে পাক সেনাবাহিনী প্রবেশ করে। দুপুরের রান্না অসমাপ্ত রেখে মিনু আপা, তাঁর কয়েকজন আত্মীয় আর শহরের অন্যান্যপরিবারের কয়েকজন মহিলা একসঙ্গে ছুটতে শুরু করেন। সকলেই ছুটছেন কাঞ্চন নদীর দিকে।
মিনু আপা কি জানতেন যে তিনি তখন দ্বিতীয়বার সন্তানসম্ভবা ? কোলে তাঁর আট মাসের মেয়ে শাওন। চোখে পানি। মেয়ের বাবাকে এখানে যুদ্ধের ভেতর রেখে কোথায় চলেছেন তিনি ? মাথার ওপর মর্টার শেল ওড়া-উড়ি করছে। তার নিচ দিয়ে তাঁরা ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। নদীর তীরে গিয়ে দেখেন সেখানে খেয়া নৌকো আছে কিন্তু মাঝিরা কেউ নেই। নদীতে কোমরের উপর পর্যন্ত পানি। অগত্যা এক কাপড়ে বেরিয়ে আসা সবাই পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিয়েছেন কাঞ্চন নদী। নদী পার হয়ে আবার হাঁটা। ভেজা শাড়ি গায়েই শুকালো সবার।
প্রথমে সেতাবগঞ্জে সাতদিন থাকা হলো। সেখানে মিলিটারি এসে যাবার পর আবার অজানা পথে যাত্রা। পায়ে হেঁটে তাঁরা পৌঁছে যান আরো দূরের কোনো গ্রামে। কোনো পরিচিত জনের বাড়িতে আবার কয়েকটি দিন। সেখানেও এসে যায় পাকসেনারা। কোনো গ্রামের কুটিরে সন্ধ্যা নামে। সেখানে রাত কাটিয়ে তারপর আবার চলতে থাকা। সারাদিন হাঁটতে হাঁটতে শরীর অবসন্ন। ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া শরীরে তাঁরা এক সময় ভারতীয় সীমান্তে পৌঁছে যান। সীমান্ত পেরিয়ে দেখেন রাস্তার দুপাশে শরণার্থীদের আশ্রয় শিবির। সারাদিনে ১৮ মাইল হেঁটে তাঁরা যে গ্রামটিতে পৌঁছান তার নাম ডালিমগাঁও। এখানেই নানা ধরনের আশ্রয়ে পরবর্তী কয়েক মাস কেটেছে মিনু আপার।
নভেম্বরের শুরুতে যুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে চলেছে তখন মিনু আপা গঙ্গারামপুর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রসূতি সদনে। তিনি তাঁর ছেলের নাম রাখলেন উদয়। এই পুরো সময়টাতে তাঁরা অন্য দেশে, অজানা জায়গায় অচেনা মানুষের কাছে পেয়েছেন সব ধরনের সহায়তা। কিন্তু সারাক্ষণ একাগ্রভাবে অপেক্ষা করেছেন কবে স্বাধীন হবে দেশ। কবে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরবেন আজিজ ভাই আর তাঁর সহযোদ্ধারা।
ছেলের জন্মের অল্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এসে গেল বিজয়ের দিন। নতুন দেশে উদিত হলো নতুন সূর্য। যুদ্ধ শেষ হবার কয়েকদিন পর ওপারের এক রাইস মিলের মালিক ব্রজরাখাল সান্যাল তাঁর ট্রাকে করে কয়েকটি পরিবারকে দেশে ফিরে আসতে সাহায্য করেন। সেই ট্রাকে আজিজ ভাইয়ের সঙ্গে ডিসেম্বরের ২০ তারিখে তাঁরা দিনাজপুরে ফিরে আসেন।
এটা শুধু আমাদের পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনের গল্প নয়। এরকম হাজার হাজার সংগ্রামী মানুষ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনে, প্রবাসী সরকারে কাজ করে, নানারকম রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করে। বিজয়ের মাসে তাঁদের সবার কথা বেশি মনে পড়ে।
আমাদের মুক্তিযোদ্ধা আজিজ ভাই তাঁর সফল কর্মজীবন শেষ করেছেন অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে। সর্বোচ্চ পদে কাজ শেষ করে অবসর নিয়েছেন।
পরে নিজের আগ্রহে করেছেন কিছু পেশাগত ও সেবামূলক কাজ। একজন মুক্তিযোদ্ধার গৌরব আর সম্মান তিনি চিরকাল অম্লান রেখেছেন। প্রায় অর্ধ-শতক পরেও তাঁর দেশপ্রেম আর মূল্যবোধ দেখেছি একই রকম দীপ্র। একই রকম প্রেরণা জাগানো। ঠিক একমাস আগে, গত নভেম্বরের ১৬ তারিখে এম এ আজিজ নামের এই মুক্তিযোদ্ধা পরলোকগমন করেন।
শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের পাশে বিস্তীর্ণ সমাধিক্ষেত্রের সামনে রাখা হয় তাঁর মরদেহ। বিশাল জাতীয় পতাকা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় তাঁকে। তার ওপর রাখা হয় পুষ্পস্তবক।
আমৃত্যু লড়ে যাওয়া এই সংগ্রামী মানুষটিকে আর একবার সর্বোচ্চ সম্মান জানানো হয় গার্ড অব অনার দিয়ে। সেখানে দাঁড়িয়ে বিউগলের সুর শুনে আমি আর আমাদের স্বজনেরা অভিভূত হই। বিষাদ আমাদের স্পর্শ করে না। জাগ্রত হয় দেশপ্রেম আর সেবার অঙ্গীকার। এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের স্বজন বলে আমরা আমৃত্যু গৌরব বোধ করবো। তাঁরা আমাদের দিশারী হয়ে থাকবেন, চিরদিন।