এক আমেরিকান শিল্পীর সন্ধানে

ইফতেখারুল ইসলাম

এক
নিউ ইয়র্ক সিটি অনন্য। অন্য কোনো দেশে এর সঙ্গে তুলনীয় কোনো শহর হয় না। সেই নিউ ইয়র্ক সিটির প্রাণকেন্দ্রটি হলো ম্যানহাটন। সারা পৃথিবীর ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাঙ্ক-শেয়ার-বাজার, থিয়েটার-সঙ্গীত, সব কিছুরই রাজধানী। আবার সেখানেই আছে এমন দুটি মিউজিয়াম যারা নিজেদেরকে শিল্পকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ হিসেবে দাবি করতে পারে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে নিউ ইয়র্কের মেট আর মোমা আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত, বড় এবং দর্শনীয় মিউজিয়াম।
মেট অর্থাৎ মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট সবচেয়ে বড় হলেও দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগ্রহ কিন্তু মোমা বা মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট নয়। আসলে আমেরিকার শীর্ষ দশের দুই থেকে পাঁচ পর্যন্ত অবস্থান অন্য কয়েকটি মিউজিয়ামের। সেগুলোর মধ্যে আছে ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্ট, আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো, ন্যাশনাল গ্যালারি অব আর্ট, ওয়াশিংটন ডিসি আর মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস, বস্টন। এদের প্রত্যেকের আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষ পরিচিতি আছে। যার যার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সংগ্রহ নিয়ে যোগ্য ও সুদক্ষ কিউরেটরের তত্ত্বাবধানে এরা দর্শক আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। এ ছাড়া নিয়মিত আয়োজন করা হয় বিশেষ প্রদর্শনী। কিন্তু আমেরিকা এবং বাইরের সারা পৃথিবী থেকে আসা শিল্প-অনুরাগী মানুষের পছন্দ বিবেচনা করে প্রত্যেকেই ইউরোপীয়, বিশেষত ফরাসি চিত্রকলার একটা বড় বিভাগ রাখতে চেষ্টা করে।
ইউরোপীয় চিত্রকলার ব্যাপারে বেশি আগ্রহ থাকায় আমি নিজেও মেট আর মোমা এই দুটি মিউজিয়ামের ইউরোপীয় বিভাগগুলো মোটামুটি ভালোভাবে দেখে নিয়েছি। সেটা অনেক বছর আগের কথা। তখন থেকেই লক্ষ করি, ইমপ্রেশনিজম-এর ব্যাপারে আমেরিকান শিক্ষিত সমাজ ও সাধারণ দর্শকদের আগ্রহ বেশি। এই আগ্রহের কারণে তাদের অনেকেই কিছু-না-কিছু পড়াশোনা করে। এভাবে ছবি দেখার প্রস্তুতিও নেওয়া থাকে অনেকের। ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীদের মধ্যে ক্লদ মোনে আমেরিকার শিল্প-অনুরাগীদের কাছে যুগ যুগ ধরে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। সে কারণেই মেট এবং মোমার বাইরেও বড় মিউজিয়ামগুলোতে মোনে এবং তাঁর সমসাময়িক শিল্পীদের ছবির খুব ভালো সংগ্রহ আছে।
শিকাগো আর বস্টনের মিউজিয়ামে এ ধরনের ছবির ভালো সংগ্রহ আছে সে-কথা আমাকে জানায় আমার ছেলে। সে দীর্ঘদিন ধরে ম্যাসাচুসেটস-এ থাকে। যাই হোক, শিকাগোতে আমার কখনো যাওয়াই হয়নি। কিন্তু নানা কাজে বস্টন যাওয়া হয়। কাজ না থাকলে কেমব্রিজে, হার্ভার্ড স্কোয়ারে হেঁটে বেড়াই, হার্ভার্ড বুক স্টোরে যাই। ওই শহরে মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস ঠিক কোনখানে সেটাই জানা হয়নি আগে। কারণ তখন আমি প্যারিসের ছোট-বড় নানা মিউজিয়ামে ফরাসি চিত্রকলার ভালো সংগ্রহ দেখতে পারছি। অন্য যে-কোনো শহরে গেলে সেখানকার শিল্প-সংগ্রহ খুঁজে দেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। অবশেষে বস্টন এমএফএ-তে যাবার সুযোগ ঘটল গত বছর। বস্টন মিউজিয়ামের অভিজ্ঞতা খুবই আনন্দের। কিন্তু তার ঠিক আগেই অনেক দূরের এক শহরের মিউজিয়ামে অন্য এক বিখ্যাত আমেরিকান শিল্পীর ছবি দেখার সুযোগ পেলাম। সেই শিল্পীর নাম জর্জিয়া ও’কীফ।
দুই
সত্যি বলতে জর্জিয়া ও’কীফ সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল খুবই সীমিত। খুব কাছ থেকে বড় করে আঁকা নানা ধরনের ফুলের ছবি আর পরবর্তী জীবনে আঁকা কিছু এবস্ট্রাক্ট ধরনের চিত্রকলা। এরকম সব ছবির জন্য খ্যাত এই শিল্পীকে কেন আমেরিকার আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃৎ বলা হয় সেটা অস্পষ্ট ছিল। আসলে তাঁর কাজের পরিসর আর সামগ্রিক অবদান সম্পর্কে তেমন বিস্তারিত কিছু পড়ার সুযোগ হয়নি। কেন তাঁর ‘জিমসন উইড’ নামের ছবিটি ২০১৪ সালে ৪৪ মিলিয়ন ডলার বা সাড়ে তিনশ কোটি টাকায় বিক্রি হলো? কেন এই মহিলাকে আমেরিকার আধুনিক চিত্রকলায় এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় আর কেন তাঁর আর পিকাসোর শিল্পকর্ম পাশাপাশি রেখে বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করে আমেরিকার বিখ্যাত কোনো কোনো মিউজিয়াম? এগুলো ভালোভাবে বুঝতেও চেষ্টা করিনি আগে। কিন্তু এখন দেখছি অনেক বড় বড় মিউজিয়ামে এই শিল্পীর ছবির বিশেষ প্রদর্শনী চলছে। সেই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছেন তিনি। বস্টন এমএফএ-তেও তাঁর ছবির বিশেষ প্রদর্শনী। অল্প কিছুদিনের মধ্যে আর একটি প্রদর্শনী শুরু হবে কানাডার টরন্টো শহরে। তাহলে এই জর্জিয়া ও’কীফ এখনো রীতিমত সেলেব্রিটি!
জুলাই মাসে আমেরিকার দক্ষিণ ও মধ্য-পশ্চিমে গরমটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। যাঁরা উত্তর-পূর্ব উপকূল শহরগুলোতে অনেক বছর কাটিয়েছেন আর পরে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন মধ্য-পশ্চিমে তাঁরা এই সময়টা গরমে বেশ কষ্ট পান। টেক্সাস, ওকলাহোমা বা ওই ধরনের রাজ্যগুলোতে গরমের সময় থাকতে খুবই অপছন্দ করেন তাঁরা। কাজেই আমি যখন আমার বড় আপা আর দুলাভাইকে জানালাম যে বস্টন থেকে আমি এক সপ্তাহের জন্য ওকলাহোমাতে তাঁদের নতুন এলাকায় বেড়াতে আসবো তখন তাঁরা আমাকে স্বাগত জানালেন ঠিকই। কিন্তু সেটা একটু ভিন্নভাবে।
ঠিক করেছি, প্রথমে যাব নরম্যান। আমার এক আত্মীয় থাকেন সেই শহরে। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করলাম নরম্যান থেকে তাঁর সঙ্গে গাড়ি চালিয়ে চলে যাব মিসৌরির ম্যানসফিল্ডে।এটা একটা স্বপ্নপূরণের সুযোগ। লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের সংরক্ষিত বাড়ি আর মিউজিয়াম দেখাটা এবার সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে।এরপর টালসা শহরে বড় আপার বাড়িতে বেড়াতে যাব।
আমার প্ল্যান শুনে আপা বললেন, টালসায় তাঁদের বাড়িতে আমি নিশ্চয়ই কয়েকদিন থাকতে পারি। কিন্তু এই গরমে বাইরে কোথাও ঘোরাফেরা করা যাবে না। চুপচাপ বসে থাকার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। তার চেয়ে তাঁরা আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলে যাবেন একটু দূরে, ঠান্ডা কোনো পার্বত্য শহরে। সেখানে তাঁদের সঙ্গে গল্পগুজব, বেড়ানো, খাওয়া-দাওয়া সবই চলবে। আর সেটা হবে অনেক বেশি আরামদায়ক। আমি যেন ম্যানসফিল্ড আর নরম্যানের কাজ শেষ করে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করি। তাঁরা আমাকে তুলে নিয়ে সারাদিন গাড়ি চালিয়ে ওকলাহোমা ও টেক্সাস ছাড়িয়ে চলে যাবেন নিউ মেক্সিকো রাজ্যের সান্টাফে শহরে। আপা আরো বললেন, সেই শহরে একটা ভালো মিউজিয়াম আছে। ওখানে হোটেল ইত্যাদি সব কিছুর ব্যবস্থা তাঁরাই করবেন। আর এটাই তাঁদের পক্ষ থেকে আমার জন্য এবারের উপহার।
এটা একটা দারুণ প্ল্যান। তবু আমার একটু খচখচ লাগে। উপহারটা খুব বেশি বড় হয়ে গেল। হয়তো শুধু আমার জন্যই তাঁদের খরচটা হয়ে যাচ্ছে একটু বেশি। কিন্তু এর চেয়ে ভালো আর কোনো উপহার হতে পারে না। নিউ মেক্সিকোতে কোনদিন যাইনি। সবচেয়ে আনন্দের কথা, এই দীর্ঘ দশ ঘণ্টার যাত্রায় তাঁরা আমাকে গাড়ি চালাতে দেবেন।
তিন
ওকলাহোমা থেকে নিউ মেক্সিকো পর্যন্ত ভ্রমণসূচি ঠিক হওয়া মাত্র উস্টার-বস্টন এলাকায় আমার পরিচিত কিছু ছেলে-মেয়ে আমাকে নিউ মেক্সিকোর চমৎকার আবহাওয়া আর পাথর, রুক্ষ মাটি ও পাহাড় ঘেরা প্রকৃতির উচ্ছ্বসিত বর্ণনা দিতে শুরু করে। তাদেরই একজন আমাকে জানায়, সান্টাফে শহরের যে মিউজিয়ামটির কথা আপা আমাকে বলেছেন সেটা নিশ্চয় জর্জিয়া ও’কীফ মিউজিয়াম। শিল্পী নিউ মেক্সিকোর ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিন বাস করেছেন। ওখানেই এঁকেছেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলো। তাই তাঁর সবচেয়ে বড় সংগ্রহশালাটিও সান্টাফেতেই। আমি দ্রুত গুগল করে দেখি, এটা ঠিক। আর তারপর থেকে দিন গুনতে থাকি কবে আমার অন্য সব কাজকর্ম শেষ হবে। কবে দেখব মিসৌরির ম্যান্সফিল্ড শহরে লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডার-এর ঐতিহাসিক বাড়ি। কবে যাব সান্টাফে।
লিটল হাউস সিরিজের বিখ্যাত বইগুলো শৈশব কৈশোরে আমাদের কতোটা আনন্দ দিয়েছে সেটা বলে শেষ করা যাবে না। লরার প্রাত্যহিক দিনযাপনের গল্প যে সত্য, তার বাবা-মা ভাই বোনদের প্রতিদিনের ছোট ছোট আনন্দ- বেদনার কাহিনী যে সত্যিই তাদের পরিবারের কাহিনী সেটা জানার পর থেকে আমি তাদের সম্পর্কে আরো পড়তে উৎসাহী হই। তাদের ঐতিহাসিক বাড়িটি দেখার স্বপ্ন নিয়ে দিন গুনেছি বহু বছর ধরে। তাই গাড়ি চালিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শুধু লরা ইন্‌গলসের ওই বাড়ি আর তাদের পরিবারের প্রাত্যহিক জীবনের উপকরণগুলো দেখতে যাওয়াটা আমার জন্য খুবই আবেগঘন একটা অভিজ্ঞতা।
এরপর নিউ মেক্সিকো। এই যাত্রা প্রায় সারা দিনের। ওকলাহোমা থেকে টেক্সাসের একটা ছোট অংশ পাড়ি দিয়ে নিউ মেক্সিকো পৌঁছাতে হয়। আমেরিকা দেশটা কত বড় সেটা এই অঞ্চল, বিশেষ করে টেক্সাস না দেখলে বোঝা যাবে না। নির্ধারিত দিনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আমরা, অর্থাৎ আপা-দুলাভাই সহ আমি, সান্টাফে পৌঁছাই। আর তার পরের দিন সকালবেলাতেই হাজির হই আমাদের লক্ষ্যস্থল ওই ও’কীফ মিউজিয়ামে।
চার
জর্জিয়া ও’কীফ (১৮৮৭-১৯৮৬) আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পীদের অন্যতম। ফুল, নিউ ইয়র্কের নগরদৃশ্য আর নিউ মেক্সিকোর প্রকৃতির ছবি তিনি এঁকেছেন। আবার তিনিই শুরু করেছেন বিমূর্ততার সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রয়োগ। নাটকীয়ভাবে আধুনিক কম্পোজিশন ব্যবহার আর প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নিজের ছবিতে তুলে আনার জন্য তাঁর ছিল বিশেষ ধরনের সৌন্দর্যবোধ। এইসব গুণাবলীর অনন্য সমন্বয়ের জন্য তিনি বেশি পরিচিত ও সমাদৃত।
ও’কীফের জীবনের প্রথম চিত্রকলার প্রদর্শনীটি হয় ১৯১৬ সালে নিউ ইয়র্কের আলফ্রেড স্টিগলিত্‌স-এর আভা-গার্দ গ্যালারিতে। স্টিগলিত্‌স-এর সহায়তায় তিনি ১৯১৮ সালে নিউ ইয়র্কে এসে বাস করতে শুরু করেন। এ সময়, বিশেষ করে পুরো বিশের দশক জুড়ে তিনি নিউ ইয়র্কের উঁচু ভবন আর বিশ্ব-প্রকৃতির বিমূর্ত রূপ নিজের ছবিতে তুলে ধরেন।এই বিমূর্তায়নের রীতি ও ভঙ্গিটি তাঁর নিজস্ব।
বড় আকারের অসংখ্য ক্যানভাসে বিভিন্ন ধরনের ফুলের ছবি এঁকে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন। কিন্তু এখানেও তিনি তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন। তাঁর সময়ের অন্যান্য আমেরিকান শিল্পীর সঙ্গে মিলিতভাবে চেষ্টা করেছেন চিত্রকলায় আমেরিকান বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় দায়বদ্ধ থাকতে। ইউরোপের আধুনিক চিত্রকলার বিভিন্ন উপাদান ও উদাহরণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে চেনা যায় ্তএরকম একটা আমেরিকান আধুনিকতাবাদ নির্মাণ করতে চেয়েছেন তিনি।
পুরনো রীতি-পদ্ধতি আর প্রচলিত ঐতিহ্যকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে নিরীক্ষাধর্মী শৈলী আর নতুন ধরনের শিল্পসামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে আগের তুলনায় আরো প্রত্যক্ষ নন্দন-তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছিলেন এই আধুনিক শিল্পীরা। এইভাবেই উনবিংশ শতাব্দীতে চিত্রকলায় আধুনিকতার সূচনা। ও’কীফের জন্য এই আধুনিকতার পথে যাত্রার মানে হলো, চিত্রকলার শিক্ষায় যে জ্ঞান তিনি আয়ত্ত করেছিলেন প্রথমেই তা বিসর্জন দেওয়া। তার বদলে নিজের দেখার অভিজ্ঞতাকে পরিশুদ্ধ ও পরিশ্রুত করে নিজস্ব রঙ এবং আঙ্গিক দিয়ে তাকে প্রকাশ করা।এমনভাবে তা প্রকাশ করা যেন সেটা নিছক দৃষ্টিনন্দন না হয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি ভাব প্রকাশ করে।
১৯২৯ সালে নিউ মেক্সিকোতে সূচিত হয় ও’কীফের শিল্পকলার নতুন একটি অধ্যায়। পরের দুই দশক ধরে প্রতি বছরের অনেকখানি সময় তিনি এই রাজ্যে ছবি এঁকে কাটিয়েছেন। এরপর ১৯৪৯ সালে তিনি এখানে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন। এখানেই তিনি আয়ত্ত করেন এমন একটা দক্ষতা এবং বিমূর্ত কম্পোজিশনের শিল্প-কৌশল যাতে তিনি প্রকৃতিকে ভেঙে-চুরে কিছু সুচিহ্নিত আকৃতি ও রঙ দিয়ে তাকে পুনরায় সৃজন করেন। এমনভাবে এখানকার প্রকৃতিকে বিমূর্ত আকারে পুনর্সৃজন করেন যে তাঁর সেই কালপর্বের ছবি দীর্ঘদিন ধরে খাঁটি আমেরিকান পরিচয়-চিহ্ন হিসেবে গণ্য হতে থাকে।
জর্জিয়া ও’কীফ নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছেন তাঁর জীবনটা। প্রকৃতি থেকে তিনি সংগ্রহ করেছেন আঙ্গিক বদলানোর এবং বিমূর্তরীতির ছবির উপকরণ। অন্য শিল্পীরা যে-সীমাকে অলংঘ্য মনে করতেন সেই সীমারেখা ভেঙে অথবা অতিক্রম করে তিনি অবলীলায় এগিয়েছেন। স্বাধীনভাবে তিনি এমন এক জীবন তৈরি করেছেন যা অন্য কারো মতো নয়। সম্পূর্ণ নিজের মতো, স্বভাবত আমেরিকান এবং বিশিষ্ট।
সান্টাফে শহরের ও’কীফ মিউজিয়াম অনন্য এই কারণে যে এখানকার সংগ্রহটি শিল্পীর জীবন-কাহিনীটিকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরে। এই মিউজিয়ামে মন দিয়ে কিছুটা সময় কাটালে স্পষ্ট হয় ও’কীফের জীবন, কাজের পদ্ধতি, আর আমেরিকান আধুনিকতাবাদে শিল্পীর অবস্থান ও অবদান। তাঁর শিল্প-সামগ্রী, কিছু আলোকচিত্র, এবং নিজের ব্যবহারিক জিনিসপত্র ্ত এরকম সবকিছুর একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী আছে এখানে। আরো আছে একটি গবেষণা-কেন্দ্র যা তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা-প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
এখানেই একটি ঘরে প্রদর্শিত হয় শিল্পীকে নিয়ে তৈরি করা স্বল্প-দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। খুবই যত্ন নিয়ে তৈরি করা এই ছবিটি দেখলে শিল্পীর গুরুত্ব আর তাঁর চিত্রকর্মের বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। সেই সঙ্গে আরো জানা যায় তাঁর জীবনের উত্থান-পর্বের পূর্ণাঙ্গ কাহিনী। যৌবনে ছবি আঁকার পাশাপাশি আলোকচিত্রের মডেল হিসেবে কাজ করেছেন। ওই কাজ তাঁকে দ্রুত খ্যাতি এনে দেয়। কিন্তু একসময় খোলামেলা এবং আবেদনময় ছবির কারণে মডেল হিসেবে একটা বিশেষ ইমেজ বা পরিচিতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। এ সময়ে তাঁর প্রথম পর্যায়ের আঁকা ফুলের ক্লোজ-আপ ছবির মধ্যে যৌনতার স্পষ্ট চিহ্ন আছে বলে ব্যাপক আলোচনা হয়। সেই অভিযোগ তিনি যতই অস্বীকার করুন, শিল্প-সমালোচক আর সাধারণ শিল্প-দর্শকের কাছে ও’কীফ সেই যৌনতার প্রতীক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে পড়েন। সমালোচকের দৃষ্টিতে মডেল আর শিল্পী একাকার হয়ে যান।
কিন্তু যে-কোনো বড় শিল্পীর মতই এই খণ্ডিত পরিচয় মেনে নেননি ও’কীফ। পরবর্তীকালে তাই নিজেই আবার শুরু করেছেন সেই পরিচিতি থেকে বেরিয়ে এসে নিজের শিল্পী-সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশের দীর্ঘ সংগ্রাম। এই পথ চলায় তিনি সফল হয়েছেন। শিল্পের মধ্যে নিমগ্ন থেকে একজন শিল্পীর স্বাধীন বিকাশের জন্যই ছিল তাঁর সংগ্রাম। সেই সংগ্রামটিও তাঁর আমেরিকান ব্যক্তিত্বের নির্ভুল পরিচয় বহন করে।
সম্ভবত এই সংগ্রামী ব্যক্তিত্বের কারণেই শিল্পী হিসেবে তাঁর শীর্ষস্থানীয় আসনটি স্থায়ী হয়েছে। সে কারণেই এত বছর পরেও তাঁর ছবি দেখার জন্য শিল্প-অনুরাগীরা ভিড় করেন বড় শহরের বিখ্যাত মিউজিয়ামে, ছোট-বড় বিশেষ প্রদর্শনীতে। সান্টাফে, নিউ ইযর্ক, বস্টন, টরন্টো সব শহরেই তাঁর নাম আজও আলোচিত হয়।