এক আনন্দময় পাঠের অভিজ্ঞতা

ইলিয়াস আহমেদ

অনেক কাল পরে মুগ্ধ হয়ে একটি গ্রন্থপাঠের সুযোগ হলো। ঢাউস বই। এক নাগাড়ে পড়ে ওঠা সম্ভব নয়। পাঠকালীন সময়ে সারাটা দিন অপেক্ষায় থাকতাম কখন অফিস শেষে ঘরে ফিরে বইটা নিয়ে বসব। বইটা নিয়ে, বইয়ের মানুষগুলো নিয়ে কয়েকটা দিন এক নেশার ঘোরে কাটল।
এ বইটার নাম ’তিসিডোর’। লেখক কেতকী কুশারী ডাইসন। প্রকাশ করেছে আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা – ২০০৮ সালে। জাতপাতহীন বই – কোনো বিশেষ গোত্রভুক্ত করা যায় না। এটি উপন্যাস নয়, আত্নজীবনী নয়, সমালোচনা নয়, ভ্রমণ কাহিনি নয়, গল্প নয়, অনুবাদ নয়। অথচ এ সবের কিছু কিছু এ বইয়ের সর্বত্রই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ছড়ানো বলতে এলামেলো নয়, একটি শৃঙ্খলার মধ্যেই সন্নিবেশিত সব।
বইয়ের প্রথমাংশ জুড়ে ভূমেন্দ্র গুহের সম্পাদনায় প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের ’সফলতা -নিষ্ফলতা’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বাণেশ্বর এবং নিখিল বাস্তবের বুদ্ধদেব বসু ও জীবানানন্দ দাশ। এ উপন্যাসে বাণেশ্বর চরিত্র তথা বুদ্ধদেব বসুকে খানিকটা হেয়, ক্ষুদ্র করে উপস্থাপনের চেষ্টা আছে জীবনানন্দ দাশের। কিন্ত বুদ্ধদেব বসু যে ক্ষুদ্র নন, ছোট মানুষ নন, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর উপেক্ষার পাত্র নন সেটা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন কেতকী কুশারী ডাইসন। এটা আবার তিনি করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত দায় থেকে। কেতকী কুশারী ডাইসনের পরিবার এবং বুদ্ধদেব বসু কলকাতার রাসবিহারী এভিনিউতে পাশাপাশি বসবাস করতেন। তিনি কাছে থেকে দেখেছেন বুদ্ধদেব বসুকে – গুণমুগ্ধ ছিলেন তাঁর। পরিচয়ের সেই ব্যক্তিগত দায়বোধ থেকে কেতকী কুশারী ডাইসন ব্যাঙ্গাত্নক চরিত্র হিসেবে বুদ্ধদেব বসুকে চিত্রণ যে জীবনানন্দের যথাযথ হয়নি, সঠিক হয়নি নানা যুক্তি প্রমাণের সাহায্যে তা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। এ অংশে কেতকী কুশারী ডাইসন একজন গবেষক, একজন সমালোচক।
আমার কাছে তিসিডোরের এই অংশটুকুই একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর মনে হয়েছে। একই কথার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে অনেক জায়গায়। সেটি হয়েছে হয়তো এ কারণে যে লেখকের কখনো কখনো মনে হয়েছে যা বলা হলো তা যথেষ্ট হয়নি, বুদ্ধদেবের দোষ স্খালনের জন্য পর্যাপ্ত হয়নি। বুদ্ধদেব বসুর প্রতি বিশেষ পক্ষপাতের কারণেই একই কথা বারবার বলার ঘটনা ঘটেছে। এ অংশে কেতকী কুশারী ডাইসন আবির্ভূত একজন গবেষক, একজন সমালোচক হিসেবে। কিন্ত গবেষক, সমালোচকের নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি এ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
‘তিসিডোর’ গ্রন্থপাঠের আনন্দময় অভিজ্ঞতার শুরু প্রথমাংশের পর থেকে। কেতকী কুশারী ডাইসন বসবাস করেন ইংল্যান্ডে – অক্সফোর্ডের পাশে ক্যানাল টাউন নামে এক নিরিবিলি গ্রামে। বইয়ের এ অংশে রয়েছে এ গ্রামের মানুষ অনার হোপের কথা, অলিভার-ক্যারোলিনের কথা, নিজের দুই ছেলে আডাম ও রাফায়েলের কথা। এসেছে স্বামী লরেন্সের প্রসঙ্গত্ত। কিন্ত দীর্ঘ বয়ান যেটি, সেটি রয়েছে অনার হোপকে নিয়ে।
অনার হোপ ক্যানাল টাউনের স্থানীয় সরকারে কাউন্সিলর ছিলেন দীর্ঘকাল। মানুষের সাথে মেলামেশার দক্ষতা তাঁর সহজাত। কেতকী কুশারী ডাইসনের সাথেও নিজে থেকে যেচে আলাপ করেছেন। তাঁর আগ্রহ নানা বিষয়ে – কখনো ইতালিয়ান ভাষা শিখছেন, কখনো কোনো উদ্ভিদের বিষয়ে জানতে চেয়ে চিঠি লিখছেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে, স্থানীয় কোনো সমস্যা নিয়ে লিখছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। জবাবে যেসকল চিঠি পেয়েছেন তা যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছেন। নিঃসন্তান অনার হোপ মৃত্যুর আগে তাঁর সকল চিঠি দিয়ে গেছেন ভিনদেশের কেতকী কুশারী ডাইসনকে। কেতকী গভীর অভিনিবেশে প্রতিদিন পাঠ করেন অনার হোপকে লেখা নানা জনের চিঠি। আর তা পড়ে পড়ে তিনি একটু একটু করে চেনা-অচেনায় মেশানো অনার হোপকে নির্মাণ করেন তাঁর গ্রন্থে। অনার হোপের সাথে জীবনের শেষ বেলার পরিচয়ের কিছু তথ্যও ব্যবহার করেন কেতকী। মুগ্ধ হয়ে যাই যখন দেখি কী গভীর মমতায় কেতকী অনার হোপকে সৃষ্টি করেন তাঁর গ্রন্থে। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি কী যত্নে প্রতিটা শব্দ চয়ন করছেন, বাক্য নির্মাণ করছেন। কলমে এসে গেল লিখে ফেললাম-এমন অযত্ন অবহেলার একটি বাক্যও নেই এ অংশে। বিস্ময় জাগে এটা দেখে যে প্রতিটা শব্দ সময় নিয়ে ভেবে, ওজন করে, প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করে তবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ দেখে বেল ফুলের মালা গাঁথার একাগ্রতা আর ভালোবাসার কথা মনে হয়।
অনার হোপের মা ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে পরিচারিকা। বাবা কে জানেন না। বড় হয়ে অনেক খোঁজ করে সন্দেহ করেন এক ডাক্তারকে। কিন্ত এ নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করেন না অনার হোপ। পিতৃপরিচয়হীন থেকেও একটি পরিশীলিত আনন্দময় জীবন যাপন করে যান অনার হোপ। লেখক হিসেবে কেতকী কুশারী ডাইসনের কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি এমনভাবে অনার হোপকে চিত্রিত করেন যে, মানুষটিকে ধরা যায়, স্পর্শ করা যায়। অনার হোপের হেঁটে যাওয়ার ছন্দটুকুও কেতকীর বর্ণনা থেকে বাদ যায় না। তিসিডোরের এ অংশ পাঠ আমার জন্য এক বিরল আনন্দময় অভিজ্ঞতা।
এক ফাঁকে অনুবাদ করেছেন মার্গারেট ক্লার্ক নামের এক ভদ্রমহিলার ছোট একটু আত্মজীবনী – ব্যক্তিগত অনুভবে সাধারণ একজন মানুষকে ধরার চেষ্টা। কোনো পরিচ্ছেদ শুরু করেন ইরাকে পাশ্চাত্যের তাণ্ডব, ধ্বংস যজ্ঞ নিয়ে; কোনোটার আরম্ভ আবার লেবাননের বোমাবর্ষণ নিয়ে। সবটাতেই নিপীড়িত অসহায় মানুষের জন্য কেতকী কুশারী ডাইসনের অকৃত্রিম দরদ।
ক্যারোলিনের গল্প শোনান কেতকী। মেয়েটা লোকালয় থেকে দূরে ভাসমান এক নৌকায় বসবাস করে। নিজের কথা বলতে ক্যারোলিনের অসীম কুণ্ঠা। কেতকীর ছেলের বন্ধু অলিভার প্রেম নিবেদন করে তার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত। বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও অলিভার নাছোড়, হাল ছাড়ে না। সে ক্যারোলিনের জন্য অপেক্ষা করে। এ অপেক্ষার আর শেষ হয় না। কেতকী ধন্দে থাকেন – বুঝতে পারেন না আজকালকার ছেলেমেয়েদের মনস্তত্ত্ব।
কেতকী এ গ্রন্থে সপরিবারে তাঁর আনন্দময় ভেনিস ভ্রমণের গল্পও বলেন। এ রকম বিচিত্র বিষয় নিয়ে, কতিপয় মানুষ নিয়ে কেতকী কুশারী ডাইসনের ’তিসিডোর’। কেতকীর মমতাময়ী হাতে গ্রন্থের প্রতিটি মানুষ এত জীবন্ত যে বাস্তবের বিভ্রম ঘটায়, অন্য এক মায়ালোকের সন্ধান দেয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন