একুশ বাঙালির আত্মিক মুক্তির কবিতামন্ত্র

ফাউজুল কবির

পৃথিবীর বর্ষপঞ্জিতে এখন বিখ্যাত একটি দিবস আছে— মাতৃভাষাঘ্রাণিত একটি কাব্যিক দিবস, যার নাম একুশে ফেব্রুয়ারি। যার নাম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিবসটির স্রষ্টা বাঙালি নামক একটি জাতি, যার ভাষার নাম বাংলা ভাষা। কিন’ বাঙালিদের কাছে এ দিবসটি শুধু মাতৃভাষা দিবস নয়— বাঙালির আত্মপরিচয়ের, আত্মজাগৃতির এবং আত্মস্বীকৃতির ঘোষণা দিবস ও বটে। দিবসটির আরেক অনন্য নাম শহিদ দিবস। কৃষ্ণচূড়া অথবা শিমুলের অথবা পলাশের যে রং এবং যে রং রক্তের এবং যে রঙের নাম ‘লাল’-এ দিবসটির চেতনার রং ও সে রকম রক্তিম। এরকম একটি রক্তিম চেতনা দিবস রচনার জন্য বাঙালিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে হাজার বছরের সংগ্রামী বিকাশের ধারায়। অতিক্রম করতে হয়েছে অনেক পথ-ভাষার পথ, জীবনের পথ এবং রক্তদানের ও জীবন উৎসর্গের পথ। অতিক্রম করতে হয়েছে ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্বপ্ন ও নির্মাণের পথ ।
পৃথিবীর মহৎ জাতিগুলি সুদীর্ঘকালের ধ্যানী অপেক্ষায় ও সংগ্রামী তিতিক্ষায় ইতিহাসের পাতায় একটি জাতীয় স্মারক দিবস রচনা করে। স্মারক দিবসটি একটি জাতিকে সুখে-দুঃখে-বেদনায় স্মৃতি ও শক্তিতে সাহসী বীরত্বে এবং সততায় স্পর্শ করে যায় নিরন্তর। সে স্মারক দিবসটি চিহ্নিত হয়ে যা জাতির আত্মিক জাগরণের পরিচয়ে-কবিতামন্ত্রে। বাঙালির সেই স্মারকদিবস হচ্ছে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। একুশ আজ বাঙালির আত্মিক মুক্তির কবিতামন্ত্র। একুশ বাঙালির দুঃসাহসী দীক্ষামন্ত্র। একুশ বাঙালির প্রাণজাগানো জাদুমন্ত্র। স্মারকদিবস মানে আত্ম-উদ্বোধনের আত্মজাগরণের এবং আত্মবিকাশের অঙ্গীকারে ঋদ্ধ জাতীয় স্ফুরণ দিবস। সালামের রক্তের ভেতর দিয়ে,বরকতের প্রাণের ভেতর দিয়ে এবং অজগ্র শহিদের জীবনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতি যে কথা-যে বার্তা উচ্চারণ করেছে তার নাম স্বাধীনতা। বাংলা নামক মাতৃভাষার প্রশ্নে আমরা উচ্চকিত ও বীর হয়ে উঠেছিলাম রক্তঝরানো সংগ্রামী প্রেরণায়। আমরা বলেছিলাম বাঙালি পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ-বঞ্চনাকে মানতে পারে না। কারণ বাঙালির আত্মিক পরিচয় আছে, আছে নিজস্ব সত্ত্বা। সেই সত্ত্বার উদ্বোধন ঘটেছিলো একুশের দিনে। সেদিন বাংলা ভাষায় কথা বলবার অধিকার এর সাথে সাথে আমরা একথাও বলেছি-আমরা মুক্তি চাই। সেই মুক্তির নাম সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তি আর গণতান্ত্রিক আর অর্থনৈতিক মুক্তি। মুক্তির এই আকুলতা ও আকাঙ্ক্ষাই বাঙালিকে জাতিতে পরিণত করেছে। পূর্ব বাংলাকে পরিণত করেছে বাংলাদেশে। ফলে আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে একথা বলি-আমাদের ভাষার সংগ্রামই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের বীজ। একুশের বীজ অঙ্কুরিত ও বিকশিত হয়ে রূপ নিয়েছে গণঅভ্যুত্থানে, জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে, ৭ই মার্চের ভাষণে, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণায় এবং ১৬ই ডিসেম্বরে-বিজয় দিবসে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ঘোষণায়-লাল সবুজের পতাকা শোভিত জীবনের স্বপ্ন ও বাস্তবতায়। রূপ নিয়েছে ভবিষ্যতের শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায়।
প্রতিবছর একুশ আসে-আমাদেরকে মন্ত্রণা দিয়ে যায়-বলে যায়ঃ জেগে ওঠো,জাগ্রত হও। জেগে ওঠো একুশের স্মৃতিতে ও সংস্কৃতিতে। একুশের সংস্কৃতি হচ্ছে চিরকাল জেগে থাকার সংস্কৃতি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শোষণের বিরুদ্ধে জেগে থাকা । সামপ্রদায়িকতা ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে জেগে থাকা। মনুষ্যত্ববোধের আশ্রয়ে জেগে থাকার আরেক নাম একুশ। অন্ধকারের বিরুদ্ধে আগুনের অন্বেষণের নাম একুশ। সমস্ত অশুভের বিরুদ্ধে শুভচিন্তার সাহসী দ্রোহ ও বিদ্রোহের নাম একুশ। একুশের এ চেতনাবোধ থেকেই “আমার সুন্দর আমার টেন্টালাস” কাব্যগ্রনে’র ‘ আজ একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামক কবিতাটিতে আমি লিখেছিলামঃ ‘অগস্ত্য দিন নয়, সাথী আজ একুশে ফেব্রুয়ারি/ আজ জতুগৃহে আগুন লাগানো দিন/ আজ জীবনের অনন্য প্রভাতফেরি/ আজ শুধু জাগরণ প্রমা অন্বেষণ’।
একুশ আমাদেরকে স্নিগ্ধতায়-প্রজ্ঞায়-সংগ্রামে শাণিত ও প্রাণিত করে। আমাদের একুশের সংগ্রাম আজ শুধু বাঙালি জাতির সংগ্রাম নয়। এ সংগ্রাম আজ পৃথিবীর প্রত্যেকটি জাতির আত্মিক-ভাষিক-নৈতিক সংগ্রামের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। একুশ আজ পৃথিবীর মানবিক সংগ্রামের সম্পদ। কারণ সালামের-বরকতের রক্তের সাধনা আজ পৃথিবীর সমস্ত শিল্পীর পবিত্র তুলিতে রূপ নিয়েছে। রূপ নিয়েছে জীবনের তুলিতে, মুক্তির তুলিতে এবং স্বাধীনতার তুলিতে। আমার “সময়ের মায়াবী রাখাল” নামক কাব্যগ্রনে’্যর ‘একুশের মানে হচ্ছে’ কবিতাটিতে একুশের ছবিটি আঁকা হয়েছে এভাবেঃ ‘অনন্ত কালের তুলি নিয়ে সাধনায় মগ্ন আছে/আমাদের প্রিয় বন্ধু-সখা শহিদের হৃদয়েরা/ সমস্ত আকাশে/ আত্মার বিশুদ্ধ নীলে/ লেখা হচ্ছে/ একুশ একুশ-একুশের কীর্তিময় বর্ণমালা/সাহসী সঙ্গীতে উচ্চারিত হচ্ছে এক বাংলাদেশ/জেগে উঠছে ধ্বনিঃএকুশের মানে হচ্ছে ভালোবাসা/ জীবনে জীবন দিয়ে স্নিগ্ধতার/ অপূর্ব ক্যানভাসে ছবি আঁকা’।
একুশ দীর্ঘজীবী হোক আমাদের জীবনে সুন্দরে সাহসে ও সংস্কৃতিতে। প্রার্থনা করি গড়ে উঠুক জীবন্ত হয়ে উঠুক একুশের মননের বাংলাদেশ।