একুশ আমাদের মা

দীপক বড়ুয়া

১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে দুর্বার আন্দোলনে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেরণা। সেই থেকে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরে নয়মাস পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। পৃথিবীর আলোর মুখ দেখেই যাকে প্রথম ডাকি,- সে হলো মা। সেই মায়ের ভাষায় কথা বলার সুযোগটা দিতে চায়নি পাকিস্তানিরা। বাঙালিরা জেগেছে ঐ বীর শহীদের তরতাজা রক্তের আস্ফালন দেখে। তারা আর থামেনি, দুর্বার গতিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। পৃথিবীর সবাইকে দেখিয়েছে,একমাত্র বাঙালিদের জন্য ফেব্রুয়ারি মাস একদিকে শোকাবহ হলেও অন্যদিকে আছে অনন্য গৌরবোজ্বল দিক। তার সুনির্দিষ্ট কারণ আছে বৈকি! পৃথিবীর একমাত্র জাতি বাঙালি ভাষার জন্য এমাসে জীবন দিয়েছিল। ওরা মায়ের জন্য সব পারে। বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি। তাই প্রাণ খুলে মা ডাকি।
যাদের স্বপ্নে এই দেশ, বাংলা ভাষা, তাঁরা জানতেন, তাঁদের স্বপ্ন পূরণ হবেই একদিন। তাঁদের আজ অনেকেই নেই। নেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু,চার জাতীয় নেতা এবং সম্মান খোয়ানো মা বোন। তারা এখন শুধু স্মৃতি, বাংলা ভাষাকে জাগিয়ে রাখার প্রেরণা। তাঁদের স্বপ্ন রঙিন আশার ভিত প্রোথিত হয়েছিলো বায়ান্ন সালের অগ্নিগর্ভ বৈচিত্র্যময় এক আন্দোলনে। যার নাম সবার মুখেমুখে, – ভাষা আন্দোলন। একুশ এলেই আমরা জেগে উঠি, বাংলা ভাষার এবং মায়ের জন্য। তারপরে সব ভুলে যাই। আজ সত্যি কি বাংলাদেশে ভাষার সে মর্যাদা আছে? দেখি? দেখে মন ভরি, চোখ জুড়ায়। মুখে ঠিকই বলি। বাস্তবে ভাষা মহা সংকটে।”আজকাল দেশের তরুণেরা ভাবে বাংলা না জানা বা বলতে না পারাটা আধুনিক ফ্যাশন। আমাদের ভাষার একটি ঐতিহ্য ইতিহাস আছে। যেটা অন্য কারো বিরুদ্ধে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো না। লক্ষ্য ছিলো, প্রিয় ভাষাকে মুক্ত করা। আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ ওরা সবাই বুঝতে পেরেছে, এটা আমাদের মায়ের অধিকার। শুধু বাংলাদেশে নয়,আজ সারা বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষা স্মৃতিসৌধ হচ্ছে, বই মেলা হচ্ছে। পরিধি হয়তো ছোট। ক্ষতি কি? হচ্ছেতো! বাঙালির! দুঃখ হয়। যখন একুশ চলে যায়। কারো কিছুই মনে থাকে না। আমরা কি সত্যি বাঙালি? শহীদের জন্য যে শহীদমিনার আছে? বাংলা ভাষার যে একটি ঐতিহ্য আছে? আমরা যে বাঙালি নামের জাতি। কী নেই আমাদের। তার পরেও ভুলে যাই! কি করে ভুলি? একুশ বা ফাগুন এলে সবাই কাঁদি। বাংলা ভাষার জন্য, মায়ের জন্য। অথচ বীরের বেশে বলি,-এই মাসটি আমাদের গর্বের মাস। শুধু মিডিয়ায় আবদ্ধ রাখবো কেন? এই সত্য কথনটি আমরা পরিবারে, সমাজে, তার চলনেবলনে এবং শুদ্ধতায় সুদৃঢ় নিশ্চিত করতে পারি।
আমরা এখনও বাংলা ভাষায় কথা বলতে দ্বিধাবোধ করি। বাঙালি পরিচয় দিতে লজ্জা করি। উন্নত দেশিরা নিজের ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। আমরা পারি না। আমাদের এতো ভয় কিসের? আমাদের ভাষাতো এখন আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ভাষা। মাথা উঁচিয়ে চলতে পারি। বাংলায় কথা বলতে পারি। আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বিদেশের মাটিতে প্রথম বাংলাভাষায় কথা বলেননি? আমরা পারবোনা কেন? আমাদের উচিত, এই ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই আমাদের আগামী প্রজন্মদের, সন্তানদের ‘একটি করে বাংলা ব্যাকরণ আর বাংলা বই
পড়তে দেই। তাদের সাথে আমাদের মেধা মনীষা নিশ্চিত করি”।
লেখক- গল্পকার ও শিশুসাহিত্যিক