একুশের চেতনা ও বাঙালি সংস্কৃতি

চৌধুরী শাহজাহান

একুশের চেতনা বলতে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে বোধ আমাদের মধ্যে স্তরীভূত হয়েছে তাকে বোঝায়। আমরা যদি গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখি, এই পরিধি শুধু ১৯৫২ সালের ঘটনাবলি এবং একালে পূর্ববাংলার অধিবাসীদের অন্তরে সৃষ্ট জাগরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা হয় আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত। তবে ভাষা আন্দোলনই এর মূল উৎস এবং এ সংক্ষিপ্ত সারণি ধরেই আমরা বৃহৎ জগতে উপনীত হয়েছি। ১৯৫২ সালে আমরা ভাষাকে কেন্দ্র করেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। একুশের চেতনা সেদিক থেকে বিচার ও বিশ্লেষণ করলে একটি মূল্যবোধ জীবনাদর্শ যা আমাদেরকে প্রতিবাদী করে তোলে এবং সর্ব প্রকার অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে স্বকীয় সত্তা-স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হওয়ার আহবান জানায়।
আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ আবিষ্কারে একুশের অবদান অসামান্য। একুশের মাধ্যমেই আমরা পরিপূর্ণভাবে জেনেছি আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং আমরা বাঙালি। একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই আমরা চুয়ান্ন-এ নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছিষট্টির ছয় দফা আন্দেলন ও ঊনসত্তরের ১৯- দফা ভিক্তিক গণ আন্দোলন করেছি। এর ফলশ্রুতিতে আমরা একাত্তর সালে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছি। আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে একুশের উজ্জীবনী শক্তি টনিকের মতো কাজ করে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা এ গান বাঙালির হৃদয়ে নতুন প্রাণ স্পন্দন জাগায়।
একুশের চেতনা বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনেও ফেলেছে সুদূরপ্রসারী প্রভাব। একুশকে নিয়ে রচিত হয়েছে গৌরবোজ্জ্বল সাহিত্য। একুশের গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস, প্রবন্ধ,চিত্রকলা, ভাস্কর্য তারই উৎকৃষ্ট প্রমাণ। একুশের রক্তাক্ত স্মৃতি কবিতায় তাৎক্ষণিক এবং সুদূর প্রতিক্রিয়া ও অনুপ্রেরণার সঞ্চার করেছে। একুশের ঘটনা ঘটেছিলো ঢাকায় অথচ কবিতার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে তার অনুরণন উঠেছিলো চট্টগ্রামে। সেদিনই রচিত হয়েছিলো মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। কবিতাটিতে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারে বাঙালি জাতি সেদিন যে দারুণ প্রতিবাদী ভাষা নিয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় রাজপথে নেমে গিয়েছিলো, ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো আন্দোলনে, উৎসর্গ করেছিলো বুকের তাজারক্ত, তার একটি বিধৃত রূপ উদ্ভাসিত হয় এই কবিতায়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র একুশের কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে গ্রাম বাংলা থেকে নগরে লেখাপড়া করতে আসা একজন ছাত্রের মাতৃভাষার প্রীতির কথা।
একটি জাতির সংস্কৃতি আবার একদিনে গড়ে ওঠে না। দীর্ঘকালের ভৌগলিক ভাঙাগড়া, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রা ইত্যাদির মধ্যে দিয়েই সংস্কৃতি স্তরীভূত হয়ে স্ফটিক স্বচ্ছ রূপ পায়। আমাদের সংস্কৃতি বলতে আমরা যে ব-দ্বীপ অঞ্চলে বাস করি সে ভূ-ভাগের অধিবাসীদের জীবনবোধ, জীবনাচরণ, আবেগ-অনুভূতির মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত ও প্রকাশিত সংস্কৃতিকেই বোঝায়। অন্য কথায়, বাঙালি সংস্কৃতিই আমাদের সংস্কৃতি। পহেলা বৈখাশ, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, আমাদের পল্লীসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ এ সবই আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গীভূত।
আমাদের সংস্কৃতি অন্বেষায় একুশের চেতনা সন্দীপ্ত মশালের মতো আমাদেরকে নিজ বাসভূমে প্রত্যাবর্তনের পথ দেখিয়েছে। ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে আমরা নিজেদের প্রকৃত আত্মপরিচয় থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। এ পর্বের শিল্প-সাহিত্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, সামাজিক আনন্দ বিনোদনের ক্ষেত্রে আমরা হয়ে উঠেছিলাম অনুকরণপ্রিয়। অন্যের দ্বারা প্রভাবিত। পঞ্চাশ দশকের শেষার্ধ থেকেই আমরা নতুন করে নিজেদের সাংস্কৃতিক উত্তরাাধিকার ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সচেষ্ট হয়েছি। ‘ কাগমারি সম্মেলন’ এ চেতনারই ফসল। অতঃপর ‘ছায়ানট’, ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি’র মতো সমাজ সংগঠনের জন্ম হয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ প্রায় আটচল্লিশ বছর। একুশের চেতনা কিন’ এরই মধ্যে মরে যায়নি। এখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদি সে মূল্যবোধকে আমরা ছায়ার মতোই বহন করছি। এদেশীয় ইতিহাসে ব্যক্তিপূজা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে অনেকক্ষেত্রেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক চেতনার অনুপসি’তি প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়। কিন’ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর থেমে যায়নি। বর্তমান স্যাটেলাইটের যুগে বিভিন্ন দেশের সংস্কুতির দ্বার উন্মুক্ত হলেও বাঙালি সংস্কৃতি আমাদের প্রাণের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যের সংস্কতি। এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। এক অর্থে একুশের চেতনা আমাদের অস্তিত্বের সংগে জড়িয়ে আছে। এ বোধ কখনোই বিসর্জিত হবে না। কালের পালাবদলের সংগে তা ভিন্নরূপে আমাদের বিনির্মাণ করবে। আমাদের সমাজ সংস্কৃতিকে নব আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা দেবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক