রাখাইনে খাদ্য সংকট, রোহিঙ্গা আসছে দলে দলে

একদিনে এলো ৩০ হাজার

রফিক উদ্দিন বাবুল, উখিয়া
Ukhiya-Pic-(1)-10.10.2017

‘মিয়ানমার সামরিক জান্তা ও তাদের দোসর’রা রাখাইন রাজ্যে জন মানবশূন্য গ্রামগুলোতে হানা দিয়ে বাড়িগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। হাঁট-বাজার গ্রামগঞ্জে মুদির দোকানে লুটপাটের পর আগুন দিচ্ছে। ধ্বংস করছে কৃষকদের মজুদ রাখা চালের দোকান ও গুদাম। গ্রামের নলকূপ থেকে পুকুরের পানি পর্যন্ত নষ্ট করে দিচ্ছে। যাতে বন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা রোহিঙ্গারা খাদ্য সংকটে পড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়’।
মঙ্গলবার ভোর রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে খেয়াংমং থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া ফাতেমা বেগম (২৮) এসব করুণ কাহিনী বর্ণনা করেন আর কাঁদেন। তিনি জানান, ‘দীর্ঘদিনের সঞ্চিত সহায় সম্বল বুকে আঁকড়ে ধরে, জীবন বাজি রেখে মাতৃভূমিতে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন’ হায়েনার দল খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী ধ্বংস করে দেওয়ার কারণে সেখানে আর থাকা হয়নি’।
তার সাথে আরো প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা থাইংখালী সীমান্ত দিয়ে নাফনদী পার হয়ে ভোরে কুতুপালং এসে পৌঁছার কথা জানিয়ে বলেন, তারা দিনের
বেলায় জঙ্গলে ও রাতের আঁধারে ঘরবাড়িতে থাকার চেষ্টা করেছিল। মিয়ানমার জান্তারা একথা জানতে পেরে তাদের সহায় সম্বল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।
রাখাইনের শিলখালী গ্রামের আবুল কালাম (৩৫) জানান, তার বসতবাড়িতে ধান চালসহ নিত্য পণ্যের মজুদ ছিল। ছিল গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, শতাধিক হাঁস-মুরগি। এসবের লোভ লালসা ত্যাগ করতে না পেরে পরিবার পরিজনদের নিরাপদে বাংলাদেশে পৌঁছে দিয়ে তিনি নিজ বাড়িতে থাকতে চেয়েছিলেন, কিন’ হায়েনার দল সোমবার সকালে এসে তার দোতলা কাঠের ঘরটি জ্বালিয়ে দেয়। নিঃস্ব হয়ে তাকে এপারে চলে আসতে হয়েছে। এরকম প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা মঙ্গলবার ভোর রাতে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এপারে চলে এসেছে।
স’ানীয় ইউপি সদস্য মুফিজ মেম্বার জানায়, তিনি রাত দেড়টার দিকে শোরগোল শুনে বাড়ি থেকে বের হন। দেখেন শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু নাফনদী পার হয়ে তার বাড়ির পাশে দিয়ে থাইংখালীর দিকে যাচ্ছে।
পালংখালী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সোলতান আহমদ জানায়, গত রাতের মতো রোহিঙ্গাদের করুণদৃশ্য তিনি আর কখনো দেখেন নি। আসার পথে ভাই আব্দুস সালামের (৫৫) মৃত্যু, দুই রোহিঙ্গা দম্পতির রোগাক্রান্ত দুই শিশু মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে মায়ের বুকে লুকিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশু দুগ্ধপোষ্য। মায়ের দুধ না পেয়ে ওই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে বলে রোহিঙ্গা গৃহবধূ ছকিনা বেগম (২৮) কান্না জড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের জানান।
তারা আরো জানায়, টানা সাতদিন দুর্গম পাহাড়ি পথে কোনো খাবার তারা পাননি। কেবল হেঁটেছেন এপারে চলে আসার জন্য। হাঁটার পথে ওই শিশুর করুণ মৃত্যু নিয়ে এলাকার মানুষের মাঝে দেখা দেয় বিষন্নতা। এসব রোহিঙ্গারা পালংখালী ইউনিয়নের বাঘঘোনা এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে আশ্রিত আজিম উল্লাহ বুচিডং শীতলক্ষ্য এলাকার কোয়ামং এলাকার বাসিন্দা। স্ত্রী ও ৯ সন্তান নিয়ে তিনি ৬ দিন আগে পাড়ি জমান এদেশে আসার উদ্দেশে। তাদের মংডু এলাকায় মিয়ানমার জান্তারা খাবার না দিয়ে দু’দিন আটকিয়ে রাখে। পরে সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে ৪দিন পর মঙ্গলবার ভোর রাতে এপারে এসে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের তথ্য মতে আগামী ৬ মাসে আরো ৩ লাখ রোহিঙ্গা এদেশে পালিয়ে আসতে পারে। যেহেতু মিয়ানমার সেনারা রাখাইন রাজ্যের কৃষকদের বাড়িতে মজুদ থাকা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পুড়িয়ে দিচ্ছে; ফলে সেখানে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
স’ানীয় পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, আনজুমানপাড়া, থাইংখালী, বালুখালী ও ধামনখালী সীমান্ত দিয়ে প্রতিরাতেই রোহিঙ্গারা দলে দলে এ দেশে পাড়ি জামাচ্ছে।