একজন বীরের নাম শহীদ মৌলভী সৈয়দ আহমদ

মোহাম্মদ খোরশেদ আলম

আজ ১১ আগস্ট, ১৯৭৭ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম প্রতিবাদকারী শহীদ মৌলভী সৈয়দ আহমদ এর ৪১তম শাহাদাতবার্ষিকী।
১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে গেরিলা বাহিনীর প্রধান (মুক্তিযুদ্ধকালীন) শহীদ মৌলভী সৈয়দ আহমদ দারুণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি সে দিন চট্টগ্রাম শহরের উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে শেখ মুজিব রোডস’ ভাণ্ডার মার্কেট সংলগ্ন সৈয়দ মাহমুদুল হকের বাড়িতে গোপন আস্তানা করেন। আন্দোলন সংগ্রামের জন্য তিনি প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে তোলেন।

বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোস্তাক সরকারের বিরুদ্ধে বেশকটি সফল অপারেশন করতে সমর্থ হন। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন ভারতের সরকার প্রধান মোরারাজি দেশাই স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের যোগসাজশে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর মৌলভী সৈয়দ ও তাঁর সাথে থাকা ক’জন সহযোগীকে ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করান। সে সময় মৌলভী সৈয়দকে ঢাকা ক্যান্টেনম্যান্টে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেফতারের পর অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েও মৌলভী সৈয়দ নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। এক পর্যায়ে খুনিরা তার গ্রামের বাড়ি বাঁশখালীর শেখেরখীল ইউনিয়নের লাল জীবন গ্রাম থেকে তাঁর বৃদ্ধ পিতাকে ধরে এনে সুকৌশলে তাঁকে সনাক্ত করে। এর পর ১১ আগস্ট প্রত্যূষে কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মৌলভী সৈয়দ আহমদকে। বিচারের নামে সেই দিন প্রহসন হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের এই গেরিলা সংগঠক ১৯৩৮ সালের ৪ মার্চ বাঁশখালী উপজেলা শেখেরখীল ইউনিয়নের লাল জীবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম একরাম সিকদার ও মাতা উম্মে উমেদা খাতুন। পরিবারের পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিটি কলেজে (বর্তমান সরকারি সিটি কলেজ) শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। ১৯৬৭-৬৮ সালে প্রথমে ছাত্র সংসদের জি.এস ও পরবর্তীতে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৬৮ সালে রাজনৈতিক সংগ্রাম আন্দোলনে প্রথম কারারুদ্ধ হন। জেলে বন্দী থাকা অবস’ায় কৃতিত্বের সাথে ডিগ্রি পাশ করেন। ’৬৯ এর গণ-আন্দোলনে তিনি চট্টগ্রামের ছাত্র ও যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ’৭১ এ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ছিলেন মৌলভী সৈয়দ। এ সময় “জয় বাংলা বাহিনী” গঠন করেন তিনি।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন স’ানে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র ছাত্র ও যুবকদের নিয়ে গড়ে তুললেন গেরিলা বাহিনী। রাজাকার, আল বদর, আল শামসদের অবস’ান জেনে সেখানে তিনি আক্রমন করতেন। এটাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের বিচক্ষণতা। সে সময় তাঁর প্রতিষ্ঠিত গেরিলা বাহিনীর শক্ত অবস’ান ছিল উত্তর আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, মনছুরাবাদ, রামপুরা, গোসাইলডাঙ্গা ও হালিশহরসহ গ্রামীণ জনপদে। তিনি স’াপন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অনেক আশ্রয়স’ল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশের পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে বসে তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দেন। সেদিন প্রতিরোধ সংগ্রামে চট্টগ্রামের যুবনেতা সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ আবদুল গণি, মোহাম্মদ জাকারিয়া, এ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দীন, দিপেশ চৌধুরী, মুহাম্মদ ইউনুছ, বাঁশখালীর সুভাষ আচার্য ও শফিকুল ইসলাম সহ অনেককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং “চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা” শিরোনামে একটি মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন শহীদ মৌলভী সৈয়দ ও চট্টলবীর আলহাজ্ব এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী। এ মামলার বেশিরভাগ আসামি হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের “রাষ্ট্রদ্রোহী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এই মামলায়। এটা ছিল জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জাজনক ঘটনা।
এভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা, চট্টগ্রাম শহর গেরিলা বাহিনীর প্রধান মৌলভী সৈয়দ। নিজের রক্ত দিয়ে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার স্বাক্ষর রেখে গেছেন যা নতুন প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।