একজন তারাবানু

শামীম খান যুবরাজ

শীতের ভোর। কুয়াশায় আবৃত চারদিক। গায়ে চাদর জড়িয়ে গ্রামের মেঠোপথ ধরে দু’একজন লোক চলে যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। ফজরের নামাজ শেষ করে আজমতের দোকানের চা না খেলে দিনটা ঠিকঠাক মত শুরু হয় না মতি মিয়ার। হাটের অদূরে সড়কের পাশে আজমত আলীর ছোট্ট একচালা দোকানঘর। খুব ভোরেই দোকান খুলে বসার অভ্যেসটা অনেক পুরনো আজমতের। দোকানটা তার বাবা হাসমত আলীর গড়া। একসময় ‘হাসমত স্টোর’ নামের সাইনবোর্ড ঝুলতো দোকানের সামনে। কবে সেই সাইনবোর্ড উধাও হয়েছে কারো জানা নেই। হাসমত আলী গত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোকানের দায়ভার নেয় তার একমাত্র ছেলে আজমত আলী। শুরুতে ব্যবসাটা গোছাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। লোকেরা বাকিতে মাল নিয়ে আর দোকানের চৌহদ্দিতে পা রাখে না। শেষে পুঁজিহারা হওয়ার ভয়ে ছোট্ট আকারের নতুন সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে দোকানের সামনে ‘এক টাকাও বাকি নাই’। এমন অদ্ভুত সাইনবোর্ড দেখে লোকেরা কিঞ্চিত বলাবলি করলেও এখন আর কেউ এ নিয়ে কথা বলে না।
দোকানের তালা খুলে চুলায় আগুন দেয় আজমত। কেটলির মুখ ভেদ করে ধোঁয়াগুলো বের হয়ে ধবল কুয়াশার সঙ্গে একাকার হতে না হতেই হাজির হয় ষাটোর্ধ্ব মতি মিয়া। তারপর বজল, রহমত, আবুল, কবির, লালচাঁন। এক এক করে গ্রামের অনেক বুড়োরা এসে ভিড় জমায় তার দোকানে। বেচা বিক্রি ভালোই হয় সকাল সকাল। তীব্র শীতের প্রকোপ এখন প্রকৃতি জুড়ে। তাই বলে থেমে থাকে না বুড়োদের খোশগল্প। গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে হারানো দিনের গল্পে মেতে ওঠেন অনেকে। সে সময় তাদের মুখ থেকে নির্গত বাষ্পের সঙ্গে চায়ের গরম ধোঁয়ার মিতালী শুরু হয়।
সদ্য গাছ থেকে নামানো খেজুর রসের হাঁড়ি কাঁধে দোকানে ঢুকলো হারাধন। চায়ের অর্ডার দিয়ে মতি মিয়ার উদ্দেশে মুখ খুললো সে-
‘এই শীতে ফের তারাবানুর মাথাটা বোধ হয় নষ্ট হয়ে গেলো। স্বামী আর পুত্রের মৃত্যুর খুশিতে এবারও কি সব আবোল তাবোল আয়োজন শুরু করতে যাচ্ছে।’
হারাধনের কথার কোন উত্তর না দিয়ে অগ্নিচোখে তার দিকে তাকালেন মতি মিয়া। কথা না বাড়িয়ে হারাধন রসের হাঁড়ি কাঁধে নিয়ে ছুটলো হাটের দিকে। মতি মিয়ার অগ্নিচোখ তখনো তাকিয়ে কুয়াশায় অদৃশ্য হওয়া হারাধনের পথের পানে। মুহূর্তেই কুয়াশাচ্ছন্ন একাত্তরের আয়না স্পষ্ট হলো মতি মিয়ার স্মৃতিতে।
তারাবানুর স্বামী জামাল হাজী মতি মিয়ার সহযোদ্ধা ছিলো। দু’জনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। একসাথে ট্রেনিং এর জন্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যায় দু’জন। হাতে হাত রেখে শপথ নেয় দেশ রক্ষার। অদম্য সাহস ছিলো জামাল হাজীর প্রশস্ত বুকজুড়ে। পাক বাহিনীর বর্বরতার জবাব দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে সে। অস্ত্র কাঁধে ছোটবেলার খেলার সাথী জামাল হাজীকে নতুন রূপে দেখে মতি মিয়ার সাহসের সূচনা হয়। শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে। এ লড়াই বেঁচে থাকার লড়াই। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার লড়াই। নিজের দেশে নিজের মত করে বাঁচার লড়াই। আগামী প্রজন্মকে নতুন স্বাধীন দেশ উপহার দেয়ার শপথে অটল যোদ্ধারা লড়ছে মাঠে-ঘাটে-জলে-জঙ্গলে সবখানে। নিজের জীবনের বিনিময়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার এ এক মরণপণ যুদ্ধ। অবশেষে ১৫ ডিসেম্বর বীরদর্পে লড়াই করে অনেকের মত শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলো জামাল হাজী। চিরসঙ্গী মতি মিয়ার বুকে মাথা রেখে চোখ বুজলো সে।
পরদিন ১৬ ডিসেম্বর। এক নতুন সূর্যোদয়। শিশিরঝরা সবুজ ঘাসে ঝিলমিল করছে সূর্যকিরণ। এ যেন অমৃত হাসির রেখা। মুক্তাদানার হাসি। প্রকৃতিতে বইছে নতুন হাওয়া। হৃদয় উজাড় করা এ হাওয়া। পাখিরা গেয়ে উঠলো মধুর কণ্ঠে। সাদা কপোতের সঙ্গে আকাশে ডানা মেললো লাল সবুজের মুক্ত পতাকা।
রাস্তায় রাস্তায় আনন্দ মিছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের ফুল দিয়ে বরণ করছে বাংলাদেশের কোটি জনতা আর বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ছে সারা দেশ।
সহযোদ্ধার লাশ নিয়ে ফিরে এলো মতি মিয়া। জামাল হাজীর বাড়ির উঠানে পা রেখে ডাক দিলেন জামাল হাজীর একমাত্র ছেলে জালালকে। কোনো সাড়া শব্দ নেই বাড়িজুড়ে। জামাল হাজীর স্ত্রী তারাবানু মলিন মুখ নিয়ে বের হলেন ঘর থেকে। বাকহীন তারাবানু মতি মিয়াকে আঙ্গুলের ইশারায় একটি নতুন কবর দেখিয়ে দিলেন। মতি মিয়া এগিয়ে দেখলেন নতুন কবরটির পাশে আরেকটি কবর খনন করা। কয়েক মিনিটের মধ্যে লোকজনের সমাগম ঘটলো জামাল হাজীর বাড়ির আঙ্গিনায়। লোকদের মুখে সব শুনলেন মতি মিয়া।
জামাল হাজী যুদ্ধে যোগদানের অপরাধে তার একমাত্র ছেলেকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকাররা। হাঁটু পানিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জালালকে। উঠানের একপাশে জালালকে সমাধিস্থ করতে এলে তারাবানুর অনুরোধে অন্য কবরটি খনন করে গ্রামবাসী।
বাপ-ছেলের কবরের পাশে প্রতিবছর ডিসেম্বরে ফুটে থাকে অসংখ্য গাঁদা ফুল। প্রতিবছর বিজয় দিবসের সূর্য উদিত হলে তারাবানু গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আনন্দ-উল্লাস আর গল্প-কথায় মেতে ওঠেন। মনের মতো করে সাজিয়ে রাখেন পুরো বাড়ি। দুপুরবেলা সবাইকে খাইয়ে বিদায় জানান তিনি। দুপুরের পর একাই কাটান ১৬ ডিসেম্বরের এই দিনটা। ফুলে ফুলে সাজানো বাড়িটা সুনসান মনে হয় তখন। শূন্যতা এসে ঘিরে ধরে তারাবানুকে। বিজয়ের এমন আনন্দের দিনে তারাবানুর এ কষ্ট শুধু স্বামী আর সন্তান হারানোর নয়; এ কষ্ট স্বপ্নভঙ্গেরও। যে স্বপ্ন চোখে নিয়ে এ মাটির কোলে ঘুমিয়ে পড়ে মুক্তিযোদ্ধারা।