এই সেই শেখ মুজিব যে নামে মিশে আছে

বাঙালির নাম

বিমল গুহ

বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৫ আগস্ট এক শোকাবহ দিন, অনন্ত জিজ্ঞাসার এক কালো প্রহর! অকুতোভয় নেতা, বাঙালির ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের এই দিনে নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত হন। কী পরিতাপের বিষয়, তাঁর অধীনস্ত একদল বিপথগামী সৈনিক রাতের আঁধারে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন করে। জাতির কপালে সেদিন এঁকে দেয় মহা কলঙ্ক-তিলক।

সেদিন দেশের মানুষ হয়ে যায় হতবাক, স্তব্ধ। সেই ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুকে সেদিন ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিলো। তাঁর লাশও গায়েব করে ফেলার চক্রান্ত করে ওরা। কিন’ তা কিভাবে সম্ভব! সূর্যকে কি পৃথিবীর পাহাড়-পর্বত গাছপালা দিয়ে ঢেকে রাখা যায়? তবে তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিতে পেরেছে তাঁর জন্মভূমিতে, তাঁর মাতাপিতার সান্নিধ্যে। তাঁরা কি জানে- জাতির পিতার লাশ মাটি খুঁড়ে ঢাকায় আনার কোন প্রয়োজন কি আদৌ আছে? জাতির রাজধানীই হয় তো কোন চলে যাবে টুঙ্গিপাড়ায়! অথবা ঢাকা সম্প্রসারিত হবে যুগের প্রয়োজনে টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত। এই টুঙ্গিপাড়া সেইদিন ‘বঙ্গবন্ধু নগর’ হয়ে উঠবে। কে জানে কত দূরে সেই দিন? কালের গতিকে কেউ কি থামিয়ে রাখতে পারে?

বাঙালি জাতির এই মহান পুরুষ জীবনের প্রতি ক্ষণে চেয়েছেন বাংলার মাটির সংস্পর্শ, চেয়েছেন বাঙালির সাহচর্য। ‘কারাগারের রোজনামচা’র বইতে কারাজীবনের কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি রাত্রে যথারীতি খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। দেওয়ান ওয়ার্ডে আমি থাকতাম। দেশরক্ষা আইনে বন্দি আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমেন এডভোকেট আমার কামরায় থাকতেন। … রাত্র ১২টার সময় আমার জানলা দিয়ে কে বা কারা আমাকে ডাকছিলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখি নিরাপত্তা বিভাগের ডেপুটি জেলার তোফাজ্জল সাহেব দাঁড়াইয়া আছেন।

জিজ্ঞাসা করলাম, এত রাতে কি জন্য এসেছেন? … তিনি ভিতরে এসে বললেন, আপনার মুক্তির আদেশ দিয়েছে সরকার। এখনই আপনাকে মুক্ত করে দিতে হবে। মোমিন সাহেবও উঠে পড়েছেন। আমি বললাম, হতেই পারে না। ব্যাপার কি বলুন। … আমি তাকে হুকুমনামা দেখাতে বললাম। তিনি জেল গেটে ফিরে গেলেন হুকুমনামা আনতে।

আমি মোমিন সাহেবকে বললাম, মনে হয় কিছু একটা ষড়যন্ত্র আছে এর মধ্যে। হতে পারে এরা আমাকে এ জেল থেকে অন্য জেলে পাঠাবে। অন্য কিছু একটাও হতে পারে, …। লোহার দরজা খুলে দেওয়া হলো। সামনেই একটি গাড়ি দাঁড়াইয়া আছে। চারদিকে সামরিক বাহিনীর জওয়ানরা পাহারায় রত আছেন। একজন আমাকে গাড়িতে উঠতে বললেন। আমি গাড়ির ভিতরে বসলাম। দুই পার্শ্বে দু’জন সশস্ত্র পাহারাদার, সামনের সিটে ড্্রাইভার ও মেজর সাহেব। গাড়ি নাজিমুদ্দীন রোড হয়ে রমনার দিকে চলল। আমি পাইপ ধরাইয়া রাত্রের স্নিগ্ধ হাওয়া উপভোগ করতে লাগলাম, যদিও শীতের রাত। ভাবলাম কোথায় আমার নূতন আস্তানা হবে! কোথায় নিয়ে যাওয়া হতেছে! কিছুই জানি না। গাড়ি চললো কুর্মিটোলার দিকে।… এয়ারপোর্ট ত্যাগ করে যখন ক্যান্টনমেন্টে ঢুকলাম তখন আর বুঝতে বাকি রইল না। মনে মনে বাংলার মাটিকে সালাম দিয়ে বললাম, তোমাকে আমি ভালবাসি। মৃত্যুর পরে তোমার মাটিতে যেন আমার একটু স’ান হয়, মা।’

বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ আরেক ষড়যন্ত্র! তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তির নামে স’ানান্তর করা হয়েছে ক্যান্টনমেন্টে। তিনি বুঝে নিয়েছিলেন তিনি তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী হয়েছেন। মৃত্যুঞ্জয়ী এই বীর তাঁর লেখনীতে দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর কুণ্ঠাহীন ভালোবাসারই প্রকাশ করেছেন। এই হলো বঙ্গবন্ধু, বাঙালি জাতির পিতা, অবিসংবাদিত নেতা আমাদের।

বঙ্গবন্ধুর এই নির্মম হত্যাযজ্ঞে সোচ্চার হয়েছিলেন বিশ্ববিবেক, সোচ্চার হয়েছিলেন বিশ্বের শোষিত মানুষও। বিশ্বের শোষিত বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠেছিলো প্রতিবাদী সুর। অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই অমোঘ উচ্চারণ: ‘যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান/ ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’ কালজয়ী এই দুই চরণে এক মহান নেতার সার্থক প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন এই কবি। আমরা বিশ্বাস করি মনেপ্রাণে- বঙ্গবন্ধু তাঁর দেশপ্রেমের জন্য, তাঁর আদর্শের জন্য বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালি থাকবেন যতদিন, ততদিন থাকবেন বঙ্গবন্ধু- বাঙালির ধ্যানে ও জ্ঞানে, কর্মে ও চেতনায়।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নেতা হাতেগোনা, যাঁদের ডাকে আন্দোলিত হয়েছে পুরো জাতি- যাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে জাতীয় মুক্তির বারতা। যাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেশের আপামর মানুষ। আমরা জেনেছি মহাত্মা গান্ধীকে, চিনেছি বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাকে, চিনেছি ভিয়েতনাম মুক্তিসংগ্রামের নেতা হো চি মিনকে, প্যালেস্টাইনের সংগ্রামী নেতা ইয়াসির আরাফাতকে। এঁরাই নিপীড়িত মানুষের মুক্তিদাতা- যুগে যুগে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন। মানব-ইতিহাসের দিকে তাকালে এ রকম আরো কিছু নাম আমরা পাবো- যাঁদের সংখ্যা করাঙ্গুলেই থেকে সীমিত থাকবে।
বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স শতবছরও পূর্ণ হতো না। এ যুগে এই বয়স পাওয়া অসম্ভব ছিলো না মোটেও। তেমনটি হলে কেমন হতো আজকের এই বাংলাদেশের চেহারা? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। দেশে ফিরে দেশের মানুষকে নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাছে নিয়োজিত থাকলেন এই নেতা, সারা সময়। হঠাৎ এমন কী ঘটলো যে, চার বছরেরও কম বয়েসী শিশু রাষ্ট্রের পিতাকে হত্যা করলো পাকিস্তানের প্রেতাত্মা জাতির শত্রু একদল বিপথগামী সেনা? ! দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর চেষ্টা ও আন্তরিকতার কোন কমতি ছিলো না তখন। কী ছিলো তাঁর অপরাধ? তবে তাঁর অপরাধ কি ছিলো, তিনি দেশকে বেশি ভালোবাসতেন, কারো কাছে কখনো মাথা নত করেননি কোনদিন, অহিংস গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? দোষ কি তবে জাতি-ধর্ম-বর্র্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? ভাবতে অবাক লাগে- কোনো বাঙালির পক্ষে এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করা কি করে সম্ভব হয়েছিলো! সেসব পাতকীদের নাম উচ্চারণ করতে ধিক্কারে ঘৃণায় গা রি রি করে ওঠে আজও!
সেদিন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকেও নিশ্চিহ্ন করে দিতে উদ্যত হয়েছিলো। কোন দিশা না পেয়ে শেষমেশ তাঁর লাশ দাফন করেছিলো তাঁর গ্রামে। দেশবরেণ্য কবি শামসুর রাহমান আর্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়/ এমন যোগ্য সমাধি কই?’ আজকের দিনে আমারও বলতে ইচ্ছে হচ্ছে- ‘দেখি আজও বিস্ময়ে/ স্তব্ধ পড়ে-থাকা মুজিবের লাশ ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে!/ যেন আকাশ ছুঁয়েছে এই দেহ- হিমালয় পর্বতের চূড়াকে ছাপিয়ে,/ এতটা বিশাল দেহ- এতটা বিশাল হৃদয় মানবের / ছূঁয়ে যায় জাতির বিবেক, ছুঁয়ে গেছে দীপ্ত মহাকাল!’

পৃথিবী সৃষ্টির লক্ষ লক্ষ বছর পর সৃষ্টির সেরা জীব মানব জাতির আবির্ভাব হয়। সে এক অবাক কাণ্ড! সৃষ্টির শুরুতে মানুষের মনে অপরাধ ছিলো না। শুদ্ধ মানুষ ছিলো সবাই। আমরা এমনও শুনি যে- গহন সাগরের বুকে জেগে-ওঠা দ্বীপের মানুষ, কিংবা গহীন পর্ব-অভ্যন্তরে বাস-করা মানুষের মন নাকি সাদা ধবধবে। তারা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। তারা মিথ্যা বলে না, কারো ক্ষতি করে না। কারো অকল্যাণ চায় না। আদিতে মানুষের চরিত্র তেমনই ছিলো। তা হলে কেন এই পরিবর্তন, মানুষে মানুষে হিংসা হানাহানি? এক কবিতায় বলেছিলাম- ‘…পৃথিবীর আদি লগ্নে এই ভূখণ্ড জুড়ে/ বিস্তৃত প্রান্তর ছিলো পূর্ব-পশ্চিমে…/ মুখর নিবাস ছিলো পৃথিবীর বুকে/ তারপর স্বার্থ এলো/ পক্ষপাত এলো এই মানুষের মনে/ আধিপত্যবাদ এসে যুক্ত হলো রাষ্ট্রের শিয়রে!’ দেখেছি- স্বার্থের কাছে হার হয় মানবিকতার, হার হয় সত্যের, সুন্দরের। বঙ্গবন্ধুও সেই নির্মমতার শিকার হয়েছিলেন সেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে, ভোররাতে। এর কী জবাব দিতে পারে জাতি?

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এমন ঔদ্ধ্যত্বপূর্ণ কথাও বাঙালির মুখে শোনা গেছে যে- এমন কি নেতা ছিলেন তিনি! যাঁর জানাজায় তেমন কোনো লোক সমাগম পর্যন্ত হয়নি? তারা কি বোঝে না যে, দেশের সেই ভুতুরে পরিবেশে মানুষের জড়ো হওয়া সম্ভব ছিলো না। সাধারণ মানুষ তো প্রায় সবাই অত্যাচার আর মৃত্যুভয়ে ভীত থাকে। আমরা দেখেছি- বঙ্গবন্ধুর জন্য বাংলার মানুষের হৃদয় নিংড়ানো অশ্রুতে ভেসে গেছে বাঙালি জাতির বুক নিরবে নিভৃতে! আমি সেই মুহূর্তে গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। মাঠ থেকে উঠে-আসা এক কৃষক যিনি বঙ্গবন্ধুকে দেখেননি, কিন’ তাঁর ভাষণ শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন, পাকিস্তানি সেনার আক্রমণে আহত হয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন- আচ্ছা, মৃত্যুর পরও তো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হতে পারে আমাদের! আমিও বলেছিলাম, হ্যাঁ পারে। তার মুখের অবয়ব দেখে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সাধারণ মানুষের কী ভালোবাসা- তা উপলব্ধি করেছিলাম সেইদিন।
একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, শিশুর জন্মের পর সে সাধারণ মানবশিশুই থাকে। সমাজ ও পরিবেশ একজন সাধারণ মানুষকে অসাধারণ করে তোলে, মহামানব বানায়।
এ কথা তো সবার বেলায় সত্যি! যিনি মহামানব হবেন- তিনি হয়ে উঠবেন ক্রমে ক্রমে মৃত্যুঞ্জয়ী, আপোষহীন, নিঃস্বার্থ ও হৃদয়বান মানুষ। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তেমন একজন নেতা, যিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়েও বলতে পারেন- ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, আমি মানুষ, আমি মুসলমান- জীবনে একবার মরে, দুইবার মরে না!’ এই দৃঢ়চেতা মানুষটির বিচার পাকিস্তানের বর্বর শাসকগোষ্ঠী সেদিন করতে পারেনি। শত চেষ্টায়ও ফাঁসিতে ঝোলাতে পারেনি সেই যুদ্ধকালীন সময়ে! কিন’ কী পরিহাস! তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করলো পাকিস্তানের দোসর সেই নির্বোধ বিপথগামী বাঙালি সেনা! এই কলঙ্ক লুকাই কিভাবে!
বার বার মাথা কুটে মরে জাতির বিবেক। কী ছিলো তাঁর অপরাধ? তা হলে কি সেই ৬-দফা, বাঙালির মুক্তিসনদ? সেই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার জের? নাকি আগরতলা ষড়যন্ত্রের বিচার ব্যর্থতার প্রতিশোধ? তা না হলে কী অপরাধ ছিলো তাঁর? না কি সেই ৭ই মার্চ বাঙালির মুক্তির ডাক, যে ডাকে কম্পিত হয় আকাশ বাতাস ভূমিতল? যে ডাকে বাঙালি পায় মুক্তির দিক-নির্দেশনা। সেদিনও পারেনি কেউ স্বাধীনতার পথে থামাতে তাঁর দীপ্ত পদক্ষেপ! সেই ষড়যন্ত্র যদি সফলতা ভাবো- তবে কি জেনেছো কেউ আগে, মানুষের মৃত্যু তো হবেই একদিন। কিন’ তাঁর আদর্শ থাকে চিরঞ্জীব, যদি তা মানব-কল্যান বয়ে আনে! এই সেই শেখ মুজিব, যেই নামে মিশে আছে বাঙালির নাম। এই সেই শেখ মুজিব, বাঙালির পরিত্রাণ যে নামে নিহিত পূর্বাপর।