উৎসবে শ্রেষ্ঠ উপহার গোলাপ

Rose..-(26)

উৎসবে, আনন্দে, যৌবনধর্মে, উপহারে ও শোকসন্তাপে গোলাপ অপরিহার্য। ঈদের আনন্দে একটি গোলাপের ভূমিকা তুলনাহীন। কোনো তরুণী বা তরুণের একটি গোলাপ উপহার দেওয়ার মর্মার্থ অপরিমেয়। উপহার পাওয়া সেই গোলাপ বছরের পর বছর রেখে দিয়েও তার মূল্য নিরূপিত করা যায় না। রবীন্দ্রনাথ প্রেম পর্যায়ের একটি গানে লিখেছেন, ‘বল্‌, গোলাপ, মোরে বল,/ তুই ফুটিবি, সখী, কবে।’ সুপ্রাচীন থেকে আধুনিক সর্বকালে গোলাপের সঙ্গে আছে প্রেম।
গোলাপ ফোটার শ্রেষ্ঠ সময় শীতকাল থেকে বসন্ত। এবং সারা বছর অবিরাম ফুটেই চলেছে। আর খুব যত্ন-আদরের কাঙ্গাল, নয়তো রূপসীর দেমাগ কাটে না। উৎসবে, ফুলশয্যায়, ওষুধে, সম্ভোগে এত উপযোগী ও আদরণীয় হয়ে উঠতে গোলাপের সময় লেগেছে ছয় কোটি বছর। অর্থাৎ পৃথিবীতে চার ও পাঁচ পাপড়ির প্রথম গোলাপ এসেছে মানব সভ্যতারও বহু আগে। জাপান-চিনে পাওয়া ফসিলে গোলাপের নমুনা মেলে আড়াই কোটি বছর আগে। আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমে গোলাপের ফসিল পাওয়া যায় সাড়ে তিন কোটি বছর আগের। আর দুনিয়ার বুকে গোলাপের শুভ সূচনা অন্তত ছয় কোটি বছর আগে। তাকে আদর-অভিনন্দন গোলাপের জন্মের কাহিনীতেই আছে যেন পাপ, কিন’ সেই পাপ থেকে উঠে গোলাপ হয়েছে পবিত্র। গোলাপের জন্মের সঙ্গে রয়েছে প্রেমের অনেক উপাখ্যান, বেদনা ও হাহাকার। এজন্য প্রেমে ও গোলাপে এত নিবিড় নৈকট্য। প্রাচীন গ্রীসের করিনে’র রানী সুন্দরী রোদান্তে। একদল প্রেমিক একই সঙ্গে প্রেম নিবেদন করেছিল রানীকে। প্রেমের পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে রানী নিজেকে করে নিলেন গোলাপ। এজন্যই কি গোলাপকে পীড়ন ও মর্দন করলে পাওয়া যায় আতর, গোলাপজল, অটো? গোলাপ ও গোলাপের কাঁটাও আমাদের একথা মনে করিয়ে দেয়। আর কী আশ্চর্য, গোলাপ নিয়ে জগতে প্রথম কবিতা রচনা করেছেন মহিয়সী গ্রিক কবি স্যাফো, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-অষ্টম শতাব্দীর কোনো এক সময়ে। প্রেম, নারী, পুরুষ, গোলাপ, আতর ও সম্ভোগ মিলেমিশে একাকার। এজন্যই সম্রাট নেলোলিয়ঁ-পত্নী বিরহিনী রানী জোসেফিন গোলাপচর্চায় তাঁর বৈধব্যজীবন অতিবাহিত করেছিলেন! আমরা জানি না বিধবা রূপসী মেহেরউন্নিসার (মোগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের) গোলাপের নির্যাস ও আতরের আসবপ্রীতি শের আফগানকে হারানোর কারণে আমৃত্যু সঙ্গী হয়েছিল কি না! শুধু জানি গোলাপকে যে একবার ভালোবাসে সে আজীবন গোলাপপ্রেমী থাকে।’ [৬ কোটি বছরের পুরনো ফুল গোলাপ : বিপ্রদাশ বড়-য়ার গ্রনে’র শেষ প্রচ্ছদ থেকে।]
তাহলে গোলাপ নিয়ে গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতাটি শুনুন,
‘ফুলের রানী কে তা ঠিক করে দিন দেবরাজ জোভ,
এটা হলে;
গোলাপই পাবে সেই বরমাল্যখানি।’
আর বাংলায় প্রথম লিখেছিলেন প্রেমের কবিতার শিরোমণি কবি চণ্ডীদাস,
‘কুন্দ করবী আমলি সুন্দর,
চম্পক কেতকী বেলি।
কিবা মনোহর তুলল গোলাপ,
তাহে সুন্দর চামেলী।’
‘সি ১৯৫৭‘ হল পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট গোলাপ। স্প্যানিশ ভাষায় সি অর্থ হ্যাঁ। এই গোলাপটি এত ছোট যে দেখে গোলাপ বলেই মনে হয় না। এর কুঁড়ির আয়তন গমের মতো ছোট। গাছ মাত্র ১০ সেমি উঁচু। ছোট্টটি বলে মোটেই অবহেলার নয়।
সবচেয়ে বড় গোলাপ ভারতে উৎপন্ন ‘ভীম ১৯৭০‘ সম্ভবত জগতের সবচেয়ে বড় গোলাপ, এজন্য তার এই নামকরণ। এর পিতৃগাছ একটি অল্প পাপড়ির ফ্লোরিবান্‌ডা গোলাপ।
সমতল বাংলার একটি নিজস্ব গোলাপ আছে। এর নাম রোজা ইন্‌ভলিউক্রেটা স্পিশিস গোলাপ। ১৮৩৮ সালে ইউরোপীয় এক মহিলার লেখায় এই স্পিশিস সম্পর্কে জানা যায়। এটি লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা হয়েছিল। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের ফরাক্কার গঙ্গার চর থেকে এটি খুঁজে পাওয়া যায়। ময়মনসিংহের জলার ধারে এটি এক সময় পাওয়া যেত।
জগতে সবুজ গোলাপ হল, চায়না রোজ, এইচটি ও মিনিয়েচার। আর বর্তমানে জাপানে উৎপন্ন হয়েছে নীল গোলাপ, কালো গোলাপও উৎপন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশের জামালপুরে চৈতন্য নার্সারির মালিক প্রকৃতিপ্রেমিক ঈশ্বরচন্দ্র গুহ গোলাপ চর্চা করেছিলেন ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর উদ্যানে। তাঁর ক্যাটালগে পাঁচশ রকম গোলাপের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। উদ্যানটি এখন বিলুপ্ত। বলধা গার্ডেন ১৯০৯ সালে নির্মাণ শুরু হয়। এখানে ২১৭ রকম গোলাপ পাওয়া যেত। এখন দু-দশটি মাত্র আছে। ১৯৭৫ সালেও এখানে দুর্লভ জাতের সবুজ গোলাপ ছিল।
আসুন উৎসবে আমরা গোলাপের সৌন্দর্য ও সুগন্ধ পরিভোগ করি, প্রিয়জনকে উপহার দিয়ে। গোলাপ ও গোলাপের খাঁটি নির্যাস খুঁজে বের করি। সৌন্দর্যচর্চা ও কাব্যচর্চা করি। গোলাপ রানী হয়েও কুমারী এবং সুন্দরীতমা, চির তন্বী ও চির সতী-তার সমকক্ষ অতীতে ও বর্তমানে আর কেউই নেই। সুন্দরীশ্রেষ্ঠা বলে গর্ব-হেতু গোলাপের জন্ম। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতিকে অসম্মান করা হলে দেবী অভিশাপ দেন কুমারী মিরা-কে। কী করুণ সে কাহিনী! আবার দেবী সে অভিশাপ তুলে নেন নিজেই। আসুন আমার পাঠিকা ও পাঠকবৃন্দ, আমরা উৎসবের দিনে গোলাপকে ভালোবাসি। গোলাপকে ভালোবাসা নিজেকে ভালোবাসার এপিঠ-ওপিঠ, নিজেদের সমৃদ্ধ করার নামান্তর এবং নিজেকে চেনাও।

আপনার মন্তব্য লিখুন