উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বহুমুখী প্রতিভার শিশুসাহিত্যিক

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

বাংলা শিশুসাহিত্যের এক অপরিহার্য নাম উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, চিত্রকর, প্রকাশক, শখের জ্যোতির্বিদ, বেহালাবাদক ও সুরকার। এছাড়াও তিনি ছিলেন বাংলা ছাপাখানার অগ্রপথিক এবং বিখ্যাত ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তিনি বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের পিতা এবং উপমহাদেশ বিখ্যাত অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিত রায়ের পিতামহ। ‘টুনটুনির বই’ এবং ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ তার অমর সৃষ্টি। ১৯৬৮ সালে সত্যজিত রায় ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ গল্পের অবলম্বনে একই নামে ছোটদের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। যা ভারত সহ বিভিন্ন দেশে শ্রেষ্ঠ ছবি ও শ্রেষ্ঠ পরিচালক সহ বেশ কিছু ক্যাটাগরিতে পুরস্কার লাভ করে। উপেন্দ্রকিশোরের জন্ম ১৮৬৩ সালের ১২ মে, ময়মনসিংহ জেলার বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে, যা অধুনা বাংলাদেশে অবসি’ত। তার পিতা কালিনাথ রায় ছিলেন সুদর্শন ও আরবি, ফার্সি এবং সংস্কৃতে সুপ-িত। তার ডাকনাম ছিল শ্যামসুন্দর মুন্সী। উপেন্দ্রকিশোর শ্যামসুন্দরের আটটি সনত্মানের মধ্যে তৃতীয় পুত্রসনত্মান। তার পৈতৃক নাম ছিল কামদারঞ্জন রায়। পাঁচ বছরেরও কম বয়সে তার পিতার অপুত্রক আত্মীয় জমিদার হরিকিশোর রায়চৌধুরী তাকে দত্তক নেন ও নতুন নাম দেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।

মেধাবী ছাত্র বলে পড়াশোনায় ভালো ফল করলেও ছোটোবেলা থেকেই উপেন্দ্রকিশোরের পড়াশোনার থেকে বেশি অনুরাগ ছিল বাঁশি, বেহালা ও সঙ্গীতের প্রতি। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে উপেন্দ্রকিশোর প্রবেশিকা পরীড়্গা উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। তারপর কলকাতায় এসে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে। একুশ বছর বয়সে বিএ পাস করে ছবি আঁকা শিখতে আরম্ভ করেন উপেন্দ্রকিশোর। এই সময় তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য হন। ১৮৮৬ সালে ২৩ বছরের উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ব্রাহ্মসমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম পড়্গের কন্যা বিধুমুখীর বিবাহ হয়। তখনকার কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রীটের ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরের বিপরীতে লাহাদের বাড়ির দোতলায় কয়েকটি ঘর ভাড়া নিয়ে উপেন্দ্রকিশোরেরর সংসার জীবন শুরম্ন হয়। উপেন্দ্রকিশোরের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলেরা হলেন সুকুমার, সুবিনয় ও সুবিমল, এবং মেয়েরা হলেন সুখলতা, পুণ্যলতা ও শানিত্মলতা। মজার ব্যাপার হলো, তারা প্রত্যেকেই পিতার পথ ধরে শিশু সাহিত্যে অবদান রেখেছেন। তবে জ্যেষ্ঠা কন্যা সুখলতা ও জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকুমার রায় উলেস্নখযোগ্য এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

তরম্নণ বয়সেই উপেন্দ্রকিশোরের সাহিত্যচর্চায় হাতেখড়ি ঘটে এবং তৎকালীন শিশুকিশোর পত্রিকা ‘সখা’, ‘বালক’, ‘সাথী’, ‘সখা ও সাথী’, ‘মুকুল’ ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৮৩ সালে ছাত্রাবস’ায় সখা পত্রিকায় তার প্রথম রচনা প্রকাশিত হয়। তার সমগ্র জীবনেই তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। ছড়া, কবিতা, গান, গল্প, নাটক, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, রূপকথা, উপকথা, পৌরাণিক কাহিনী ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী রচনাসহ শিশুকিশোর সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় বিচরণ করে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করেন। স্বরচিত গ্রনে’ স্বঅঙ্কিত চমকপ্রদ নানা চিত্র সংযোজন উপেন্দ্রকিশোরের প্রকাশনার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সম্পাদনায় ১৯১৩ সালে বিখ্যাত শিশুতোষ মাসিক পত্রিকা সন্দেশ প্রথম প্রকাশিত হয় যা আজও  কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি জনপ্রিয় শিশুকিশোর সাহিত্য পত্রিকা। দেশবিদেশের গল্প, হাস্যকৌতুক, জ্ঞান বিজ্ঞানের কথা ইত্যাদি লেখার পাশাপাশি নিজের আঁকা নানা বুদ্ধিদীপ্ত ছবি সংযোজনের মাধ্যমে সন্দেশকে তিনি তরম্নণ হূদয়ের যোগ্য একটি পত্রিকা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। উপেন্দ্রকিশোর শিশুকিশোরদের জন্য বহুসংখ্যক সাহিত্য পুসত্মক রচনা করেছেন, এর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য গ্রন’: ‘ছোটদের রামায়ণ’, ‘ছোটদের মহাভারত’, ‘সেকালের কথা’, ‘মহাভারতের গল্প’, ‘ছোট্ট রামায়ণ’, ‘টুনটুনির বই’ এবং ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। বইগুলির প্রচ্ছদ এবং ভেতরের ছবিও তিনি নিজেই অঙ্কন করেন। চিত্রাঙ্কনে তিনি সচরাচর পাশ্চাত্য প্রথায় তেলরঙ ও কালিকলম ব্যবহার করতেন। জলরঙের ছবিতেও তিনি কুশলী ছিলেন। ‘বলরামের দেহত্যাগ’ তার অঙ্কিত একটি বিখ্যাত চিত্র।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সিটি বুক সোসাইটি থেকে তার প্রথম বই ‘ছেলেদের রামায়ণ’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি সমাজে অতি আদরের সঙ্গে সমাদৃত হলেও মুদ্রণ সম্বন্ধে অতৃপ্ত উপেন্দ্রকিশোর ১৮৮৫ সালে বিদেশ থেকে তখনকার দিনের আধুনিকতম মুদ্রণযন্ত্রাংশাদি নিজের খরচায় আমদানি করেন। তারপর ৭ নম্বর শিবনারায়ণ দাস লেনে নতুন ভাড়াবাড়ি নিয়ে ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ নামে নতুন ছাপাখানা স’াপন করেন। এখানের একটি কামরায় তিনি ছবি আঁকার স্টুডিও খোলেন এবং সেখানে হাফটোন বস্নক প্রিন্টিং নিয়ে অনেক পরীড়্গা নিরিড়্গা করেন। প্রাচ্যে তখন এর কোনো চর্চা ছিল না, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও তখন এ প্রযুক্তি প্রারম্ভিক পর্যায়ে মাত্র। গণিতে গভীর বুৎপত্তি এবং সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির সাহায্যে উপেন্দ্রকিশোর এদেশে বসেই এ বিষয়ে অনেক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। নানা ধরনের ডায়াফ্রাম তৈরি, রে-স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র নির্মাণ, বস্নক নির্মাণের ডায়োটাইপ ও রি-প্রিন্ট পদ্ধতির উদ্ভাবন তাঁর মৌলিক অবদান। পশ্চিমা দেশে তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও মুদ্রণ প্রণালীসমূহ বেশ প্রশংসিত হয়। লন্ডন থেকে প্রকাশিত পেনরোজেজ পিকটোরিয়াল অ্যানুয়াল পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় এ প্রসঙ্গে তার কয়েকটি গুরম্নত্বপূর্ণ প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়। উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্স’ কোম্পানির মাধ্যমেই ভারতবর্ষে প্রসেস-মুদ্রণ শিল্প বিকাশের সূত্রপাত ঘটে। তিনি এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণ সম্বন্ধে উচ্চশিড়্গা লাভ করার জন্যে ১৯১১ সালে জ্যৈষ্ঠ পুত্র সুকুমার রায়কে বিলাতে পর্যনত্ম পাঠান।

বাল্যকাল থেকেই উপেন্দ্রকিশোর সঙ্গীতচর্চার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তিনি পাখোয়াজ, হারমোনিয়াম, সেতার, বাঁশি, বেহালা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাদনে দড়্গতা অর্জন করেন। তবে বেহালাই ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। আদি ব্রাহ্মসমাজের উৎসবসমূহে সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর বেহালার বাজনা ছিল একটি বড় আকর্ষণ। পাশ্চাত্য সঙ্গীত সম্পর্কেও তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বেহালা শিড়্গা এবং হার্মোনিয়াম শিড়্গা নামে তাঁর দুটি বই রয়েছে। উপেন্দ্রকিশোরের মধ্যে এভাবে বহুমুখী প্রতিভার সমাবেশ ঘটলেও তিনি প্রধানত নির্মল আনন্দরসিক শিশুসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

১৯১৫ সালের ২০শে ডিসেম্বর মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী পরলোক গমন করেন।