উপজেলা পর্যায়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে দেশ

সম্পাদকীয়

স্বাধীনতার প্রায় অর্ধ শত বছরের কাছাকাছি এসেও যেখানে আমরা পরিকল্পিত নগরায়ণ করতে পারিনি সেখানে গ্রাম পর্যায়ে পরিকল্পনা ছিল সুদূরপরাহত। গ্রাম পর্যায়ে প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে বটে তবে তা সুষ্ঠু পরিকল্পনামাফিক হয়নি। ইচ্ছেমতো গড়ে উঠেছে দালানকোঠা, বিপণিকেন্দ্র, শিল্প প্রতিষ্ঠান। অনেকে টাকার জোরে গড়ে তুলেছেন আলিশান বাড়ি। আর এ সমস্তকিছুই হয়েছে ফসলি জমি ব্যবহার করে।
এই অগ্রাসন থেকে গ্রামাঞ্চলের নদী-খাল-পুকুর-দীঘি-জলাশয় এবং পাহাড় কিছুই রক্ষা পায়নি। এখন অনেক গ্রামে সর্বত্র ঘুরেও ছোটখাটো কোনো জলাশয় চোখে পড়ে না। এই অবস্থায় পড়ে অধিকাংশ গ্রামই এখন গ্রামের অবস্থায় নেই, শহরের অবস্থায়তো নেই-ই। এই যখন পরিস্থিতি তখনই প্রধানমন্ত্রী উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর সুচিন্তিত মতামত অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য ও যুগোপযোগী। তিনি গত রোববার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমাদের উপজেলা ও ইউনিয়নগুলোর জন্য একক মাস্টার প্ল্যান করে দেওয়া দরকার। কারণ আমরা দেখি যত্রতত্র দালান হচ্ছে, কারো টাকা হলেই ধানের জমি নষ্ট করে সেখানে দালান করে দিচ্ছে। কিন্তু কোনো হিসেব নিকেষ নেই। তিনি বলেন, আমরা যদি এখন থেকে একটা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করি। কোথায় বসত-বাড়ি হবে, যার ভিটে আছে সেটি আলাদা কিন্তু ফসলি জমির ওপর বাড়িঘর করে ফেলি। যে যেভাবে ডিমান্ড করছে সেভাবে রাস্তা হচ্ছে। তিনি বলেন, এত রাস্তারতো দরকার হয় না। পরিকল্পিত রাস্তা হলে খরচও বাঁচে, জমিও বাঁচে।
প্রতিটি উপজেলা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোথায় মাঠ হবে, কোথায় স্কুল-কলেজ থাকবে, কোথায় ছোট বড় শিল্পনগরী হবে তা পরিকল্পনা করতে হবে। চাষের জমি কোথায়, কীভাবে ব্যবহার করা হবে তার পরিকল্পনা থাকতে হবে। বাজেট প্রণয়নের সময় মানুষের কাছে কীভাবে পৌঁছানো যায় তা খেয়াল রাখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে প্ল্যান করব ঠিকই তবে তার জন্য প্রতিটি জেলাকে দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হবে। তারা তাদের বাজেটে কী চাহিদা, কী উন্নয়ন দরকার, কীভাবে মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়া যাবে তার পরিকল্পনা তারাই দেবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপলব্ধি অত্যন্ত বাস্তবানুগ এবং সুদূরপ্রসারী। এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষ বাস করে গ্রামাঞ্চলে। আমাদের গ্রামগুলো বাঁচলে আমাদের অর্থনীতি বাঁচবে। সচল থাকবে। কাজেই সে গ্রামগুলোর জন্যই আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ সর্বাগ্রে জরুরি। সেখানে পরিকল্পনামাফিক উন্নয়ন হলে বৈষম্য সৃষ্টি হবে না। মানুষ শহরগামী হবে না এবং সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আমাদের ফসলি জমিগুলো আগ্রাসন থেকে রক্ষা পাবে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দেশের এত অধিকসংখ্যক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি কঠিক কাজ। প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের জমি কম। সে জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে না পারলে একটি কঠিন সমস্যায় নিপতিত হতে পারি আমরা। ফলে প্রধানমন্ত্রীর চিন্তা ও মতামতের দ্রুত বাস্তবায়ন অনেক সমস্যা ও সংকটের সমাধান করবে ততে কোনো সন্দেহ নেই।