উপজেলা নির্বাচন : নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ি ভোটের আড়ালে সংঘাতের আবহ

নিজস্ব প্রতিনিধি, রাঙামাটি

আগামী ১৮ মার্চ অনুষ্ঠেয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের চার আঞ্চলিক দলের আধিপত্য আর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই এখন যুদ্ধের আবহ তৈরি করেছে পাহাড়ে।
ইতোমধ্যেই এই লড়াইয়ের বলি হয়েছেন বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলির একজন প্রভাবশালী নেতা। আইনশৃংখলাবাহিনী এবং প্রশাসনের সতর্কতা কিংবা কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও নীরব আধিপত্যের লড়াই আর সশস্ত্র কর্মীদের পাহাড় দাপিয়ে বেড়ানোয় ঠিকই উত্তাপ আর ভয় ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পার্বত্য জনপদে। রাঙামাটির নানিয়ারচর আর বাঘাইছড়ি, খাগড়াছড়ির মহালছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়িসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে এই লড়াই। প্রকাশ্যে যতই গণতান্ত্রিক আচরণ আর পরমত সহিংষ্ণুতার কথাই বলুকনা কেনো, বাসত্মবতা হলো কেউ কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিবে না দলগুলো।
নানিয়ারচর : রাঙামাটির ছোট্ট উপজেলা নানিয়ারচর। আয়তনে ছোট হলেও রাজনৈতিকভাবে অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ নানিয়ারচর বরাবরই নানান কারণে উঠে এসেছে আলোচনায়। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শানিত্মচুক্তির পর থেকে ইউপিডিএফ’র চারণভূমি হয়ে ঁ

উঠা এই উপজেলাটিতে জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)’র কেন্দ্রীয় নেতা ও উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে হত্যার পর থেকে দৃশ্যত নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে ইউপিডিএফ। উপজেলা সদর ও তার আশপাশে নিয়ন্ত্রণ হারালেও তিনটি ইউনিয়নে এখনো বেশ দাপুটে দলটি। শক্তিমানের মৃত্যুর পর তার দলের প্রগতি চাকমা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও এবারের নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থী দিতে পারেনি দলটি। প্রগতি দাঁড়িয়ে আছেন, সেই সাথে জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র প্রার্থী হয়েছেন রূপম দেওয়ান। সাথে আছেন জনসংহতি সমিতি সমর্থিত প্রার্থী জ্ঞান রঞ্জন চাকমা। নারী প্রার্থী জনিত্মনা, স্বতন্ত্র পঞ্চানন চাকমা কেনো প্রার্থী হয়েছেন, তাও এক বিরাট রহস্য বটে। তবে এই উপজেলায় শেষাবধি লড়াইটা হবে মূলতঃ জনসংহতি আর গণতান্ত্রিক সমর্থিত রূপম দেওয়ান আর জনসংহতি ও ইউপিডিএফ সমর্থিত জ্ঞান রঞ্জন চাকমার মধ্যেই। তবে এর ফাঁক গলে তৃতীয় কেউ বিজয়ী হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। তবে তুরূপের তাস হতে পারেন প্রগতি চাকমা। সংস্কারপন’ী জনসংহতি সমিতির সমর্থনে প্রার্থী হয়ে গতবছর উপ নির্বাচনে ১৪ হাজার ৪৮৬ ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও এবার অজানা কারণে নিজের দলের সমর্থন পাননি তিনি। তবুও ‘অজানা’ ও ‘রহস্যজনক’ সমর্থনে ঠিকই দলীয় সিদ্ধানত্ম উপেড়্গা করে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। এবং তার এই অনমনীয় মনোভাবে বিস্মিত খোদ তাদের নেতারাও।
রূপম দেওয়ানা বলেন, নানিয়ারচরে আমিই আমাদের দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা)র মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। অন্য কেউ যদি পরিচয় দিয়ে থাকে, তবে সে সাংগঠনিক শৃংখলা ভঙ্গ করছে।’
বাঘাইছড়ি: আয়তনে দেশের সবচে বড় উপজেলা বাঘাইছড়ি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূরাজনীতি আর আঞ্চলিক দলগুলোর চারণভূমি হিসেবে পরিচিত এই উপজেলাটি পর্যটনকেন্দ্র সাজেক এর কারণে যতটা বিখ্যাত বা আলোচিত, তারচে বেশি আলোচনায় থাকে বছরজুড়ে মূলত: আঞ্চলিক চারটি দলের সশস্ত্র সংঘাত, হত্যা, অপহরণ আর সন্ত্রাসের কারণে। এই উপজেলায় এবার লড়ছেন দুই পড়্গের দুই প্রভাবশালী নেতা, যাদের একজন সাবেক চেয়ারম্যান, অন্যজন বর্তমান চেয়ারম্যান। সাবেক চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা সংস্কারপন’ী হিসেবে পরিচিত জনসংহতি সমিতির অত্যনত্ম প্রভাবশালী নেতা। সঙ্গত কারণেই সন’ লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির প্রবল প্রতিপড়্গ তিনি। বিগত নির্বাচনে নানান কৌশলে তাকে ঠিকই ভোটযুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে তারা বড়ঋষিকে নির্বাচিত করে।
কিন’ নির্বাচনে হেরে গিয়েও মাঠেই পড়েছিলেন সুদর্শন চাকমা। ড়্গমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন তিনি। ফলে এই উপজেলায় নিজেদের কোন প্রার্থী না দিয়ে সুদর্শনকেই সমর্থন করছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনী প্রচারণায়ও তাই দলটির নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই কাজ করছে সুদর্শন এর পড়্গেই। এবারের লড়াইয়ে তাই তার অবস’ান বেশ সুসংহত।
অন্যদিকে বসে নেই বর্তমান চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির প্রভাবশালী নেতা বড়ঋষি চাকমা। তিনিও বিগত সময়ের মতো এবারো বেশ শক্তিশালী প্রার্থী। তাকে বিজয়ী করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সন’ লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ। ফলে ভোটের মাঠ বেশ জমজমাট।
বড়ঋষি চাকমা বলেন, আমি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। যদিও সংস্কাপন’ীদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন এলাকায় হুমকিধামকি দিয়ে আমার ভোটারদের কেন্দ্রে না আসার নির্দেশনা দিচ্ছে। আমি বিষয়টি নিয়ে শংকিত এবং এই ব্যাপারে স’ানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেছি। জেলা প্রশাসককেও জানিয়েছি।’
বড়ঋষির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সুদর্শন চাকমা বলেন, ‘আমরা নয়, সন’ লারমার জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র কর্মীরাই এখন বাঘাইছড়ির প্রত্যনত্ম এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসকে উস্কে দিয়ে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমার বিশ্বাস ভয় ও হুমকি উপেড়্গ করে ভোটাররা কেন্দ্রে আসবেন এবং আমাকে বিজয়ী করে সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিবেন।’
বিভিন্নসূত্রে জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই চারটি আঞ্চলিক দলের বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র কর্মী অবস’ান নিয়েছে এই উপজেলার নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ইউনিয়নগুলোতে। এনিয়ে শংকায় পড়েছেন সাধারণ পাহাড়িরা। নিরাপদে ভোট আদৌ দিতে পারবেন কিনা এনিয়ে আছে সংশয়ও।
তবে ঘটনা যাই হোক না কেনো, পার্বত্য রাঙামাটি জেলায় নির্বাচন মূলত জমজমাট হবে রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি এবং নানিয়ারচরেই। রাঙামাটি সদরে আওয়ামী লীগ বনাম জনসংহতি সমিতি, নানিয়াচরে সংস্কারপন’ী জনসংহতি সমিতি বনাম সন’ লারমার জনসংহতি, বাঘাইছড়িতেও দুই জনসংহতির লড়াই জমিয়ে দিয়েছে ভোটের হিসাবনিকাশ। এখন দেখার পালা ১৮ মার্চ শেষ বিকেলে শেষ হাসি কে হাসেন।