উখিয়ায় ৩ ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর ভোটবর্জন, পটিয়ায় আটক ৪

বাঁশখালীতে ভোটার উপসি'তি কম

নিজস্ব প্রতিনিধি, পটিয়া, উখিয়া ও বাঁশখালী

পঞ্চম উপজেলা পরিষদের তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে পটিয়ায় জালভোট ঠেকাতে প্রশাসন ছিল কঠোর। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ, আনসার, র্যাবের পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেছেন। জালভোট দিতে গিয়ে ধরা পড়েছে পটিয়া উপজেলার কেলিশহর ইউনিয়নের রতনপুর এলাকার ৪ জন। আটককৃতরা হলেন রতনপুর এলাকার বোরহান উদ্দিন (১৫), আবির হোসেন (১৬), রুবেল আলম (১৭) ও মো. এমরান (১৭)।
গতকাল রোববার সকাল ১০টায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুদ রানা কেলিশহর পূর্ব রতনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জালভোট দেওয়ার সময় তাদের হাতেনাতে আটক করেন। সকাল ৮টায় পটিয়া উপজেলার ১৭ ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকার ১১৩টি ভোটকেন্দ্রে এক সঙ্গে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটগ্রহণ শুরুর এক-দুই ঘণ্টা পর থেকে প্রতিটি কেন্দ্র ছিল ভোটারবিহীন, ফাঁকা। উপজেলা নির্বাচনে প্রশাসন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় কেন্দ্রদখল, মারামারিসহ পটিয়ায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে জালভোট দেওয়ার অভিযোগে উপজেলার চরকানাই বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ভোটকেন্দ্র দুপুরের পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে ব্যালেট বাক্স সহকারী রিটার্নিং ঁ
অফিসারের কার্যালয়ে নিয়ে আসেন।
জানা গেছে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, স্বতন্ত্র প্রার্থী আফরোজা বেগম জলি (আনারস), স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাত হোসেন (দোয়াত-কলম), ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী ডা. তিমির বরণ চৌধুরী (উড়োজাহাজ), ছৈয়দ এয়ার মুহাম্মদ পেয়ারু (বই) ও মো. শাহাবুদ্দিন (তালা) প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। মহিলা পদে কোনো প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে মাজেদা বেগম শিরু।
এদিকে সকাল ১১টায় পটিয়া পৌরসদরের আবদুর রহমান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কেন্দ্রে জালভোট দিতে গিয়ে মো. সেলিম নামের এক যুবক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের পিটুনিতে আহত হয়। তাকে পটিয়া হাসপাতাল থেকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান বলেন, জালভোট দেওয়ার অভিযোগে যাদের আটক করা হয়েছে তাদের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
উখিয়ায় অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র ছিল ভোটারশূন্য
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলে। বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপসি’তি কম ছিল। দেশের অন্যান্য উপজেলার চেয়ে এখানে ব্যতিক্রমী নির্বাচন হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে দেখা যায়নি। তবে উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহামুদ চৌধুরীর বোনের জামাইর পক্ষে নির্বাচন করেছে বিএনপি-জামায়াত।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দশটি কেন্দ্র সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ভোটকেন্দ্রগুলোতে কোনো দীর্ঘ লাইন ছিল না। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র ফাঁকা ছিল। পুলিশ ও আনসার সদস্যরা গাছের ছাযায় অলস সময় পার করছে। উখিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রে দেড় ঘণ্টায় ভোট পড়ে মাত্র ১৬টি। ফলিয়াপালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটার উপসি’ত কম ছিল। পাতাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রের প্রিাইডিং অফিসার ও উখিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন সিরাজী বলেন, সকাল এগারোটা পর্যন্ত দুশতাধিক ভোট কাস্ট হয়। কোনো ধরনের ঝামেলা ছিল না। চাকবৈঠা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা লুৎফর রহমান মানিক বলেন, আড়াই শতাধিক ভোট কাস্ট হয়। অনেক কেন্দ্রে ভোটার আসেনি। ইতোপূর্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী উপজেলা চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে কামরুননেছা বেবী নির্বাচিত হয়েছেন।
ভোট বর্জন
উখিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে ভোটবর্জন করেছেন তিন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহবুবুল আলম (উড়োজাহাজ), জিহান চৌধুরী (তালা), এডভোকেট মোহাম্মদ রাসেল (মাইক)।
গতকাল রোববার সকাল ৮টা থেকে উপজেলার ৪৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও ভোটারের দেখা না পাওয়া সত্ত্বেও কিছু কেন্দ্রে অধিক ভোট কাস্টিং হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহবুবুল আলম (উড়োজাহাজ), জিহান চৌধুরী (তালা), এডভোকেট মোহাম্মদ রাসেল (মাইক)। তারা অভিযোগ করেন, টিউবওয়েল মার্কার জাহাঙ্গীর প্রভাব বিস্তার করে এজেন্টদের বের করে দিয়েছেন এবং জোরপূর্বক ভোট আদায় করছেন।
উল্লেখ্য, নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনে আবেগময় বক্তব্য দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান বই মার্কার প্রার্থী নুরুল হুদা। ইতোপূর্বে চেয়ারম্যান এবং সংরক্ষিত ভাইস চেয়ারম্যান পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় হামিদুল হক চৌধুরীকে উপজেলা চেয়ারম্যান এবং কামরুননেছা চৌধুরীকে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
বাঁশখালীতে ভোটার উপসি’তি ছিল কম
বাঁশখালীতে তুচ্ছ কয়েকটি ঘটনা বাদে প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থীর পোস্টার-ব্যানার ও অফিস স’াপনের মাধ্যমে উৎসবের আমেজ থাকলেও ভোটারের উপসি’তি ছিল খুবই কম। যে কারণে প্রতিটি কেন্দ্রে দায়িত্বে নিয়োজিত চৌকিদার, দফাদার, আনসার, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গল্প করে আর চা-পান করে অলস সময় কাটিয়েছে।
বাঁশখালীর ১টি পৌরসভা ও ১৪ ইউনিয়নের ১১০টি ভোটকেন্দ্রে এ হাল লক্ষ করা গেছে। প্রতিটি কেন্দ্রের ফলাফল জরিপে দেখা গেছে, ১৩ % থেকে ৩৫% পর্যন্ত ভোট কাস্ট হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৫টায় প্রাপ্ত পূর্ব গন্ডামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফলাফলে দেখা গেছে, সর্বমোট ২৮১২ ভোটের মধ্যে কাস্ট হয়েছে ৩৯০টি ভোট। অর্থাৎ ১৩.৮৬ %। তম্মধ্যে আনারস ২৯৭ ভোট, নৌকা ৬৯ ভোট এবং কাপ-পিরিচ ৬ ভোট পায়। ১৮টি ভোট বাতিল হয়েছে।
সকাল সাড়ে নয়টায় পুকুরিয়া নাটমুড়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে গেলে প্রিসাইডিং অফিসার মো. মফিজ উদ্দিন বলেন, ভোটার উপসি’তি খুবই কম। ওই সময় ৩৮৫৯ ভোটের মধ্যে মাত্র ১৬৭টি ভোট কাস্ট হয়েছে। ওই কেন্দ্রের বাইরে থাকা স’ানীয় ইউপি সদস্য ফরিদ আহমদ চৌধুরী বলেন, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে চায় না। মহিলারা ভোটকেন্দ্রে আসতে চা-পানের আবদার করে। প্রার্থীরা ওইসব ব্যবস’া না করায় মহিলা ভোটাররা খুবই কম ছিল।
সকাল ১১টায় পূর্ব রায়ছটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার মো. নুরুল আলম বলেন, ২২৫২ ভোটের মধ্যে ১১৫ ভোট কাস্ট হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টায় খানখানাবাদ রায়ছটা কোস্টাল কমিউনিটি সেন্টার ভোটকেন্দ্রে গেলে প্রিসাইডিং অফিসার বশির উদ্দিন আহমদ কনক বলেন, ৩৩৩৯ ভোটের মধ্যে মাত্র ৩২৫ ভোট কাস্ট হয়েছে। পৌনে ১২টায় ওই কেন্দ্রের পাশের বি. বি. চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার দিদারুল ইসলাম বলেন, ২৪১৪ ভোটের মধ্যে ৪১২ ভোট কাস্ট হয়েছে। ১২টা ১০ মিনিটে বাহারছড়া রত্নপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার সঞ্জীব বড়ুয়া বলেন, ২৫৫৮ ভোটের মধ্যে ৫৫৭ ভোট কাস্ট হয়েছে। পৌনে ১টায় সরল ইউনিয়নের জালিয়াঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রিসাইডিং অফিসার প্রদীপ দত্ত বলেন, ২৬৮৭ ভোটের মধ্যে ৪৫০ ভোট কাস্ট হয়েছে।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, ‘সকলস্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আনসার, চৌকদার-দফাদাররা আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করায় নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়েছে।’