ঈদের সোনালী সকাল

অনিক শুভ

দিগন্ত জুড়ে এক ফালি সরু চাঁদের অপেক্ষায় দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদের আনন্দ-বারতা। রমজানের একটি মাসের সিয়াম সাধনার পরে এলো খুশির ঈদ। বাঁধ ভাঙা আনন্দ উৎসবে মেতে উঠবে বিশ্বের মুসলমান সমপ্রদায়। আর আবেগপ্রবণ বাঙালি মুসলমানের ঈদ মানে এক মহা উৎসব।
চাঁদরাত থেকেই শুরু হয়ে যাবে এই বর্ণিল আয়োজনের। টিভির পর্দা গেয়ে উঠবে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/আপনারে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাগিদ’…। ঘুমকাতুরে চোখ উৎসবের আমেজে প্রতিক্ষার প্রহর গুনবে ঈদের সোনালী সকালের। গৃহিণীরা সদা ব্যস্ত থাকবে সুস্বাদু সেমাই, ফিরনি, পায়েস, পোলাও, কোরমা সহ মুখরোচক খাবারের আয়োজনে। বাড়ির তরুণীরা ঘরটাকে সাজিয়ে নেবে নিপুণ কারুকাজে। সময় করে মেহেদিতে হাত রাঙাবে তরুণী, কিশোরী এমনি কি প্রাণ পুরুষের দল। ঈদের সকালে গোসল করে নতুন কাপড় পরে পৌঁছে যাবে ঈদগাহে। নামাজের পরে ঈদ মোবারক আর কোলাকুলির সৌহার্দ্যে, সমপ্রীতি আর ভালোবাসার এক বন্ধনে নতুন করে আবদ্ধ হবে সবাই। এরপর গভীর রাত অবধি উৎসবের জোয়ারে ভেসে যাবে সব। আজ কোন দুঃখ নেই। ছোট বড়, ধনী গরিব যার যার পরিসরে সবাই ঈদের আনন্দে রংগীন হবে। দল বেঁধে বেধে তরুণ-তরুণীরা দুলবে উৎসবের দোলায়। এর-ওর বাসায় দাওয়াত খাওয়া, চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া, উচ্চ ভলিউমে গানের আবাহনে হারিয়ে যাবে মন। শিশুরা হৈ-হুল্লোড় করবে। নতুন পোশাকে আনন্দের আবির মেখে মুরব্বিদের সালাম করে গুনবে সেলামির টাকা। এ যেন এক মহা আনন্দ। দিনভর অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকবে আমাদের বধূ মাতা কন্যারা। ঈদের দিনে ঢাকা শহরকে মুড়িয়ে দেওয়া হবে মনোরম সাজে। সুউচ্চ ভবনগুলি নয়নাভিরাম আলোকসজ্জায় সজ্জিত হয়ে ঈদের আনন্দকে করে তুলবে আরো মোহনীয়। রাতে টিভির সামনে বসে পড়বে অনেকেই। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে টিভি পর্দার ঈদ আনন্দকে উপভোগ করবে নতুন মাত্রায়।
ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদ এক সমবেত আনন্দ। ঈদের আনন্দ থাকে সবার মনে। ধনী, গরিব, ছোট, বড় সকলের মধ্যেই থাকে ঈদের আনন্দ। কিন’ তারপরও মনে হয় ঈদের আনন্দ ছোটদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। অন্তত আমরা তাই দেখেছি। ছোটবেলায় ঈদের আনন্দ ছিল এক অন্যরকম।
ছোটদের ঈদ কেনো? বড়দেরই বা ঈদ নয় কেনো? এমন প্রশ্ন আসতে পারে। কিছুটা পার্থক্য রয়েছে ঈদ আনন্দের মধ্যে। বাস্তবিক জীবনের আলোকে আমরা এমনটিই দেখেছি। ছোটবেলার ঈদ ছিল এক অন্যরকম অনুভূতির। ঈদের আগে অর্থাৎ নতুন জামা কেনার আনন্দ। ঈদের আগে অর্থাৎ চাঁন রাতে ঈদের জন্য অপেক্ষা আরেক অনুভূতির ব্যাপার। আবার ঈদের সকালে আরেক অনুভূতি। যে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
ঈদের দিন সকালে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি পরে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া, আবার নামাজ শেষে ঘরে ফেরা আরেক আনন্দ। তারপর রয়েছে ঈদের নামাজের পর বাড়ি ফিরে আব্বা-মাকে ও বড়দের সালাম করা। কারণ ছোটবেলায় ঈদের সালাম মানেই ছিল সালামি পাওয়ার এক অপার আনন্দ। নানা-নানি, মামা-মামি ও খালা-খালুসহ এমন সব আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে সালাম করা আর সেমাই খাওয়া সে এক অন্যরকম অনুভূতি।
মানুষের আনন্দ লাভের অনুভূতি এক অন্যরকম অনুভূতি। আনন্দ বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। খেলাধুলা করার এক আনন্দ, বিয়ে-সাদি বা আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার এক আনন্দ। আবার ঈদের আনন্দ। ঈদের আনন্দ এক অন্যরকম অনুভূতির বহিপ্রকাশ।
এখন আমাদের বড়কালের সময় ঈদ নিয়ে এতো মাথাব্যথা থাকে না। এখন আমরা আমাদের সন্তানদের মধ্যে দেখি সেই ছোটবেলার আনন্দগুলো। নতুন জামা কেনার জন্য উদগ্রীব হওয়া, পছন্দমতো জামা কেনা এ সবই মনে করিয়ে দেয় আমাদের ছোটবেলার সেই ঈদের কথা।
ছোটবেলার সেই ঈদের আনন্দ এখন আর দেখা যায় না। এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় সবকিছু কেনো যেনো অন্য এক ধারায় বয়ে চলেছে। নদীর স্রোতধারা যেমন কখনও কখনও উল্টোপথে চলে তেমনই ঈদের আনন্দও এখন এক অন্যধারায় ধাবিত হচ্ছে। তবে যেভাবেই হোক আনন্দধারা কিন’ এক ও অভিন্ন। এ ধারা বয়ে যাবে শত শত বছর ধরে বাঙালিদের মধ্যে।