ঈদের জামা

আব্দুস সালাম
eid_jama

তিন বোনের মধ্যে তানজিলা মেজ। সে ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। তার বড় বোন রহিমা হাইস্কুলে পড়ে আর ছোট বোন এখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি। তাদের বাবা দিনমজুরের কাজ করে। প্রতিদিন ফজরের আজান শুনে বাবার ঘুম ভাঙে। ফজরের নামাজ পড়ে হালকা নাস্তা করে কাজের সন্ধানে শহরের উদ্দেশ্যে বের হয়। যেদিন কাজ পায় সেদিন ফিরতে তার সন্ধ্যা হয়। কাজ থেকে বাসায় ফেরার পথে হাট-বাজার থেকে বাজার করে আনে। ওই বাজার-সদাই দিয়ে পরের দিন তানজিলাদের ভালোভাবেই চলে যায়। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও তানজিলার বাবা মোরশেদ আলী সংসারটা ভালোভাবে চালাতে পারে না। হিমশিম খেয়ে যায়। একদিন কাজে না গেলে বা কাজ না পেলে পরের দিন ধার করে চলতে হয়। তবুও তার বড় শখ মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবে। যাতে তার মতো কাউকে কষ্ট করতে না হয়।
মেয়েদের ভরণপোষণও বাবা মোরশেদ ঠিকমতো দিতে পারে না। ঈদ-বকরিদের সময় মেয়েদের জন্য যে পোশাক-পরিচ্ছদ কেনে তা পরেই মেয়েরা সারাবছর কাটিয়ে দেয়। তাই তারা বছরের ওই একটা দিনই ভালো কোন পোশাক পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। রহিমা একটু বড় হয়েছে তাই বাবার কষ্টটা সে অনুধাবন করতে পারে। পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য কখনও বাবাকে চাপ দেয় না। অল্পতেই খুশি থাকে। কদিন পরেই রোজার মাস শুরু হবে। মেজ মেয়ে তানজিলা বাবার কাছে অনেকদিন ধরেই আবদার করে আসছে যে, আগামী ঈদে তাকে দুইটা জামা কিনে দিতে হবে। দুটো জামা না দিলে সে ঈদ করবে না। বাবা জানে মেজ মেয়ে যেমন মেধাবিনী তেমনি জেদী। সে যা চায় তা নিয়েই ছাড়ে।

দেখতে দেখতে রোজার মাস শুরু হয়ে যায়। মোরশেদ আলী রোজার মাসে তেমন কোন কাজ পায় না। প্রায় দিনই কাজ না পেয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। আবার কাজ পেলেও রোজা রেখে বেশিক্ষণ কাজ করতে পারে না। এত পরিশ্রমের ধকল শরীরে সয় না। তানজিলার মা তখন তার কষ্টের জমানো টাকা বের করে খরচ চালাতে সাহায্য করে। তারপরও বেশ কিছু টাকা ধার-দেনা হয়ে যায়। মেয়ে রহিমা বুঝতে পারে যে, মাস দুয়েক পূর্বে তার মা কয়েকদিন ধরে অসুস্থ থাকায় চিকিৎসার খরচ বাবদ আব্বাকে বেশ কিছু টাকা-পয়সা খরচ করতে হয়েছে। এর জন্য আব্বা গ্রামের কয়েকজনের নিকট থেকে কিছু টাকা-পয়সা ধার করেছে। সে ধার এখনও আব্বা শোধ করতে পারেনি। সংসারে টানাটানির বিষয়টা সে বুঝতে পারলেও তানজিলা অত সব বোঝে না। যত দিন যাচ্ছে তত দিন সে তার নতুন জামা ও জুতার কথা বাবাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে।

একদিন রহিমা তার আব্বাকে বললো : আমার জন্য ঈদে নতুন জামা-কাপড় কেনার দরকার নেই। গতবছরের কেনা জামাটা তো তেমন পরাই হয়নি। আমি এবার ওই জামাটাই পরবো। আপনি বরং তানজিলার জন্য দুটো নতুন জামা কিনে দেন। আমাকে কোরবানীর ঈদে কিনে দিলেই চলবে। ওর শখটাই পূরণ হোক। বড় মেয়ের কথা শুনে বাবা খুশি হলেও তার চোখের কোণে জল চলে আসে। সে বুঝতে পারে বড় মেয়ে চায় না যে, বাবার কষ্ট হোক। দারিদ্র্যের কারণেই বাবা সবার শখ পূরণ করতে পারে না। আড়াল থেকে বড় বোনের কথা শুনে তানজিলা খুশি হয়েছিল এই ভেবে যে, অন্য কারোর জন্য না হলেও এবার ঈদে তার জন্য অন্তত দুটো জামা কেনা হবে। বন্ধু-বান্ধবীদের কাছে সে খুব মজা করে গল্প করতে পারবে। এভাবে দেখতে দেখতে ঈদের সময় হয়ে যায়। আর মাত্র সপ্তাহখানিক পরেই ঈদ।

বাবা, মোরশেদ আলী শহর থেকে শুধুমাত্র ছোট দুই মেয়ের জন্য জামা-কাপড় কেনে। তানজিলার জন্য সস্তায় দুটো জামা কিনে আনে। একটির রং লাল অন্যটির রং হলুদ। সাথে একটা নতুন হিলও কিনে আনে। অন্যদের জন্য তেমন কিছু কিনতে পারে না। নতুন জামা-জুতা দেখে তানজিলা যার পরনাই খুশি হয়। সে ভাবে- এবার ঈদের আনন্দটা আগের যেকোন ঈদের চেয়ে বেশি হবে। আগামীকাল ঈদ। ঈদের দিন সকালে তানজিলা লাল রঙের জামাটি পরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। গ্রামে তার অনেক বন্ধু-বান্ধবী ও সহপাঠী রয়েছে। অনেকের বাড়িতে সে বেড়াতে যায়। আবার দুপুরবেলায় বাসায় ফিরে আসে। বিকালে তার কয়েকজন বান্ধবী আসার কথা। তাই সে এবার হলুদ জামাটি পরে বাসাতে তার বান্ধবীদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। দুটো জামা পেয়ে সে খুব খুশি। তার খুশিতে বাড়ির সকলেই খুশি।

বিকালবেলায় পাশের গ্রাম থেকে তানজিলার দুই তিনজন সহপাঠিনী বেড়াতে আসে। রহিমা গত ঈদে কেনা জামাটি এবার ঈদে পরেছে। সে তানজিলার বান্ধবীদের জন্য সেমাই-সুজি খেতে দেয়। এদের মধ্যে মিতা নামে তানজিলার এক বান্ধবী গত ঈদেও বেড়াতে এসেছিল। সে রহিমাকে দেখে বলে : আপু আপনি নতুন জামা কেনেননি ? এটাই তো আমার নতুন জামা। রহিমা উত্তর দেয়। শুনে মিতা বলে : এটা তো পুরাতন জামা। গত ঈদে তো আপনি এই জামাটিই পরেছিলেন। রহিমা কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারে না। মিতার মুখ থেকে এরকম কথা শুনে তানজিলা খুব লজ্জা পেয়ে যায়। তার মনটাও খারাপ হয়ে যায়। বান্ধবীরা যখন আপন আপন বাসায় চলে যায় তখন তানজিলা আর বাইরে বের হয় না। সে নিজ বাড়িতেই বসে থাকে।
তানজিলা বুঝতে পারে যে, তার জিদ করে দুটো জামা কেনা ঠিক হয়নি। সে মনে মনে বলে- আমি দুটো জামা না নিলে আব্বা বড় বোনের জন্য একটা নতুন জামা কিনতে পারতো। তাহলে আর তার বান্ধবীদের কাছ থেকে বোনকে লজ্জা পেতে হতো না। বারান্দার খুঁটি ধরে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। বোনের কথা চিন্তা করে তার দু’চোখ জলে ভরে যায়। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে- আর কখনও জিদ করে বাবা-মায়ের নিকট থেকে কিছু কিনবে না।