ঈদের জন্যে অপেক্ষা

শামসুদ্দীন শিশির = রাফিউ আহমেদ

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ….
দীর্ঘ একমাস রোজা রাখার পর যখন মাইকে বা টিভি রেডিওতে ঘোষণা করা হয়,” শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে, আগামীকাল পবিত্র ঈদ। ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক’। উচ্ছ্বল আনন্দ আর হাসি ছড়িয়ে পড়ে মানুষ থেকে মানুষে। দীর্ঘ একমাস সংযমের পর একজন রোজাদার অর্জন করে আত্মশুদ্ধি,উদারতা, মহানুভবতা,মানবিকতা। তিনি আরো অর্জন করেন ধৈর্য ধারণ করার ক্ষমতা, বুঝতে পারেন অনাহারীর কষ্ট যা তার চারিত্রিক গুণাবলীর মৌলিক পরিবর্তন সাধন করে। একজন পরিচ্ছন্ন ও আদর্শ মানবিক গুণে গুণান্বিত হবার শপথ নিয়ে তারা ঈদকে উষ্ণ হৃদয়ে আহ্বান জানায়। আর এই পবিত্রতার আনন্দ তাই বহুগুণে বেড়ে যায়। সবচেয়ে অনন্দিত হয় শিশুরা।
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে উৎসব। আর ঈদের আনন্দ শুরু হয় রোজাতেই, দিন গণনার মধ্য দিয়ে। যদিও ঈদ আসছে শুনেই সবার মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে যাবার কথা, বর্তমানে তার কিছু বৈপরীত্য দেখা যায় বেকি।
রোজা আসার আগেই প্রায় প্রতিটি পরিবারই রোজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভোগেন। কারণ রোজা আসলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কম বেশি বাড়ার ব্যাপারটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আর হচ্ছেও তাই। যথাযথ কর্তৃপক্ষ যতই পদক্ষেপ নিক না কেন, দাম অল্পবিস্তর বাড়েই। তবে এখানে আমরা নৈতিকতা আর অর্থনীতির সূত্রের দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। কিন’ ভয়টা অনৈতিক ও অন্যায়ভাবে দাম বাড়ানো নিয়েই।
ঈদকে আরো বর্ণিল করতে আমরা ঈদে নিজের নতুন পোশাক কিনি ও প্রিয় মানুষদের উপহার দিতে পছন্দ করি। ঈদের পবিত্র দিনে নতুন জামা পরে নামাজ আদায় করে শোকরিয়া আদায় করা অবশ্যই আনন্দের ব্যাপার। তাছাড়া প্রিয়জনকে উপহার দিলে তারা খুশি হোন, সম্পর্ক দৃঢ় হয়। তবে এখন আমাদের আচরণে বেশ খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। আমরা সবসময় চেষ্টা করছি অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করে বেশি দাম দিয়ে জামা কিনতে, কিংবা দামি উপহার দিতে। আমরা ভুলে যাচ্ছি কোন দামি পণ্য ব্যবহার করলেই বেশি আনন্দ পাওয়া যায়না। কিংবা দামি উপহার দিলেই প্রিয়জনের প্রতি বেশি ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়না। বরং এদ্বারা অপচয় হয় এবং মাহে রমজানের শিক্ষাটাই ব্যর্থ হয়ে যায়।
আমাদের আনন্দ, আমাদের ভালোবাসা অর্থ দিয়ে বিচার করা ঠিক না। বরং আমরা আমাদের প্রয়োজনেরটুকু রেখে বাকি টাকা দিয়ে অসহায় দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নতুন জামা বা প্রয়োজনীয় কিছু দান বা উপহার হিসেবে দিয়ে দিতে পারি। আপনি যদি আপনার ও আপনার প্রিয়জনকে দেয়া উপহার থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে অন্তত ৫জন দরিদ্র মানুষকে নতুন জামা কিনে দেন, তবে আপনি ও আপনার প্রিয়জন যে সুখটুকু পাবেন, যে আনন্দ পাবেন তা অনেক বেশি দামি কাপড় পরেও পাবেন না।
যাকাত ও ফিতরার পাশাপাশি আমরা চাইলেই আরেকটু বেশি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। কারণ আপনি যখন ঈদের দিন দামি জামা পরে ঘুরবেন, ভাল খাবার খাবেন তখন আপনার পাশের কোন ঘরেই হয়ত কোন মা তার সন্তানকে নতুন জামা কিনে দিতে না পারার কষ্টে গোমড়া মুখে ঈদ কাটাবেন। এই মানুষগুলোকেও আমাদের পরিবারের সদস্য ভাবা যায়। পরিবারের সদস্য বলেই তাদের কষ্টে ব্যথিত ও তাদের ভাল কিছুতে আমরা আনন্দিত হই।
এছাড়া আজকাল বিভিন্ন অর্গানাইজেশন বা সংগঠনের বিশাল পরিসরে ইফতার মাহফিল আয়োজন করার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এটাকে “ইফতার পার্টি” নামেও অভিহিত করা হচ্ছে। সবাই মিলে ইফতার করায় ভাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়, মানুষে মানুষে মধ্যকার বিভেদ কমে আসে, সম্পর্ক সুন্দর হয়। তবে এখন ইফতার মাহফিলের প্রকৃত উদ্দেশ্য অনেকাংশেই বিলীন হতে চলেছে। এটা যাতে কখনোই লোক দেখানো না হয়, এতে টাকা ও খাবার দুটারই অপচয় হয়। এর চেয়ে বরং অল্প টাকা বাঁচিয়ে আপনাদের সাথে কয়েকজন গরিব মানুষকে ইফতার করাতে পারেন। এতে কিছু মানুষ যেমন উপকৃত হবে, আপনার বা আপনাদের সম্মানও বৃদ্ধি পাবে।
ঈদ হোক ধনী গরিব সকলের। রোজা ও ঈদ আমাদের সাম্যের শিক্ষাটাই দেয়। ঠিক যেমন একসাথে রোজা রাখা, একই কাতারে নামাজ পড়া, ধনী গরিব নির্বিশেষে সবার সাথে কোলাকুলি করা। আমরা যদি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টাতে পারি, পুরো সমাজ পালটে যাবে।
আমরা স্বপ্ন দেখি এমন একটা ঈদের, যখন ঈদ হবে ধনী গরিব সকলের, যেখানে কোন বেষম্য থাকবে না, ঈদে সবাই একই জামা পরবে, সবার ঘরে একই খাবার রান্না হবে। সবাই সবাইকে ভালবাসতে শিখবে, ক্ষমা করতে শিখবে, ঝগড়া হওয়ার পরেও ঈদের নামাজের পর সবাই কোলাকুলি করবে। বড়দের দেখে ছোটরা শিখবে দান করতে, ক্ষমা করতে, সম্মান করতে ও ভালোবাসতে। এমন একটা ঈদের জন্যে অপেক্ষায় রয়েছি।