ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গ

মোহাম্মদ মনজুরুল আলম চৌধুরী

নেশার জগতের রাজা হচ্ছে ইয়াবা। ইয়াবা সেবন করে নেশাগ্রস্থরা সপ্তম উকাশে উড়ে বেড়ায়। নিজের অর্থের পাশাপাশি শরীরের সর্বনাশ করে। সর্বনাশ ডেকে আনে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ আর জাতির। মাদক বিরোধী অভিযান চলছে, বন্দুক যুদ্ধে ব্যবসায়ীরা মারা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হচ্ছে তবুও থেমে নেই ইয়াবা ব্যবসা আর ইয়াবা পাচার। লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে জীবন যাপন না করে শর্টকাট রাস্তায় কম পুঁজিতে অতি দ্রুত ধনী, বড় লোক, সমাজপতি, জনপ্রতিনিধি হতে চায় যারা তাদের কাছে ইয়াবা ব্যবসা অত্যন্ত লোভনীয় ও আকর্ষণীয়। তাই এ ব্যবসার পেছনে সবাই লাইন ধরে ছুটে চলেছে।
সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, মজুর, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাজমিস্ত্রি, রিকশাচালক, খেলোয়াড়, গণমাধ্যমকর্মী, সমাজকর্মী, সমাজসেবক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ির ড্রাইভার, হেল্পার, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি কে নেই এই তালিকায়!
সমাজের সকল শ্রেণি পেশার অনেক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যেন অশুভ, নোংরা, ইয়াবা ব্যবসার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। হালে ধর্মীয় শিক্ষক, আলেম ওলেমারাও বাদ যাচ্ছে না এ তালিকা থেকে। খবরে আরও জানা যায়, সমপ্রতি সাপুড়ে, হিজড়া, কিশোর, নারী ও কাপড় ব্যবসায়ী সেজে ইয়াবা পাচারের সময় অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের দিন ঠিক করা হয়েছে ১৬ ফেব্রুয়ারি’১৯। ওই দিন প্রায় ১০২জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইজিপির কাছে। এসব ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নেশার ছোবলে পড়ে দেশের তরুণ, যুবক, শিক্ষার্থীসহ নানান পেশার নানান বয়সের মানুষদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে, অনেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু হয়েছে, অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে আজ পথের ভিখারি হয়েছে, হয়েছে ভিটেমাটি ছাড়া। পাশাপাশি এসব মাদক ব্যবসায়ীরা হয়েছে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। কোটি কোটি টাকার ও সম্পদের মালিক হয়েছে। অনেকেই সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি বনে গেছে শুধুমাত্র অর্থবিত্তের কারণে অন্যকোন যোগ্যতা, দক্ষতা, সক্ষমতা, শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও।
দেশকে নেশার জগতে পরিণত করেছে জঘন্য ইয়াবা কারবারীরা। দেশের বিভিন্ন পেশার মানুষকে, যুব সমাজকে ভয়ংকর নেশার জগতে হাত ধরে টেনে এনেছে এই দুষ্ট চক্র। সমাজকে ব্যাধিগ্রস্থ করেছে। করেছে কূলষিত। মানুষের মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য এরাই দায়ী। দেশে খুন-খারাবি সহ নানান অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের কারণেই। সরকার আগের মেয়াদ থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক ব্যসায়ীদের গ্রেফতার করা হয়েছে, অনেক জায়গায় সংঘর্ষে মাদক ব্যবসায়ীরা নিহতও হয়েছে। বর্তমান সরকার নতুন মেয়াদে সরকার গঠনের পর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদক বিরোধী অভিযান চলমান থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং এই অভিযান আরো জোরালো করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বা ক্রস ফায়ারে নিহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে অনেক মাদক ব্যবসায়ী, গডফাদারদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। তার আঁচ করতে পেরেছে যে বর্তমান নির্বাচিত সরকার দেশ, জাতি আর যুব সমাজকে রক্ষার তাগিদে তাদেরকে আর কোন ছাড় দেবেনা। তাই তারা লাইন ধরে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাপারে সদাশয় সরকারকে প্রচলিত আইনে অথবা নতুন আইন করে ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃত এবং আত্মসমর্পণকারী এসব গডফাদার, রাঘববোয়াল, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবৈধভাবে অর্জিত সকল অর্থ, স্থাবর, অস্থাবর সম্পদ ক্রোক করতে হবে। এর থেকে বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে মাদক নিরাময় কেন্দ্র, হাসপাতাল গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি তা থেকে বিভিন্ন কারিগরী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, দেশের অর্থনৈতিক খাতকে স্বনির্ভর করে তোলা, বিভিন্ন শিল্প কারখানা গড়ে তোলে মাদকাসক্ত বা বেকার যুব সমাজের বিভিন্নমুখী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
দেশের জেলা বা উপজেলা ভিত্তিক হাসপাতালে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র খোলার জন্যেও এই অর্থ ব্যবহার করা যায়। জাতির প্রত্যাশা, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের উপার্জিত অবৈধ অর্থ সম্পদ ক্রোক বা বাজেয়াপ্ত করা খুব জরুরি যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর মাদক ব্যবসায় জড়িত বা উৎসাহী হয়ে না উঠে। এদের অর্থের ভিত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলে এরা আর পূর্বের ইয়াবা ব্যবসায় ফিরে যেতে পারবে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক