ইমন কিরোয়ানী ও আহির ভৈরব

স্বর্ণময় চক্রবর্ত্তী

২৯ জুলাইয়ের পর

সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় এঁদের পৃষ্ঠপোষকতা ভারতবর্ষব্যাপী স্বীকৃত ছিল। তাঁদের মধ্যে একজন মহারাজা কৃষ্ণরাজ নিজে শিল্পী ছিলেন এবং বহু সংগীত রচনা করেছেন। আরেক মহারাজা চামারাজা ছিলেন কর্ণাটক সংগীতের দিকপাল বীণাবাদক।
চিত্রকলায় মাইষুর পেইন্টিং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এটিও এই রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় উন্নতি লাভ করে।
রাজবাড়ির রীতি অনুযায়ী বাড়ির বিশাল আঙিনা সুরক্ষিত রাখার প্রয়াশে যে প্রাচীর রয়েছে তাতে প্রবেশদ্বার রয়েছে চারটি। কোনটি দিল্লী গেইটের আদলে আর কোনটি শ্রীরঙ্গনাথ মন্দিরের আদলে তৈরি। প্রবেশপত্র নিয়ে রাজবাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করার পর দুর থেকে রাজবাড়িতো এই রকমই হবে। কিন্তু নিয়মমতো জুতা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে যতই অগ্রসর হচ্ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি এই ভেবে যে এইভাবেও বাড়ি তৈরি করা যায়, সাজানো যায়। বাড়ির ভেতরটা সম্পর্কে কোন রকম ধারণাই করা যাবে না বাইরেরটা দেখে। মহল গাত্রের প্রত্যেকটা অংশে অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন শিল্পকলার নিদর্শন যা কয়েকদিনব্যাপী দেখতে হবে তার রূপ-মাধুরী নিংড়ে নিতে হলে। পাথরের গায়ে খোদাই করা দেওয়াল, দরজা, জানালা, অথবা স্তম্ভগুলোর উৎকীর্ণ, ফুল, লতা-পাতার কাজ অথবা সুন্দর মূর্তিগুলো দেখে মনে হবে বর্তমান আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের কল্যাণে এত সুযোগ-সুবিধে থাকা সত্ত্বেও তখনকার দিনের নির্মান শিল্পীদের হাতের এমন নিপুন কারুকাজ কি এখন আর সম্ভব হবে! এছাড়া সেখানে রং তুলির অনুপম রেখা এই অবস্থাটাকে চিত্তাকর্ষক করেছে। বর্তমানে যাদুঘর-এ রূপ দেওয়া এই বাড়িটিতে রাজাদের ব্যবহৃত সব জিনিসপত্র সংরক্ষন করা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাতশত পঞ্চাশ কেজি ওজনের একটি স্বর্ণ নির্মিত পালকি। দুটো রৌপ্য নির্মিত চেয়ার ও দুটো ড্রেসিং টেবিল। এতোসব দর্শনীয় দ্রষ্টব্যের মধ্যে আমার মেয়ের মন কেড়েছে সাজিয়ে রাখা বেশ কিছু তৈলচিত্র। এতে রাজা-রানী ও তাঁদের সন্তানদের চিত্রগুলো স্থান পেয়েছে। চৌকোনা বিশিষ্ট দ্বিতল বাড়ির মাঝখানে একটা ছোট উঠন। আর বাড়ির একদিকে মনে হল জলসা ঘর। তাতে বেশ কিছু ঝাড়্‌বাতি এবং এর উপরিভাগে তিনতলার সমান উচ্চতায় শুধুমাত্র বিভিন্ন রঙিন আয়নায় ঢাকা। যার ফলে সহজেই পুরো জায়গাটি আলোকিত থাকে দিনের বেলায় এমনকি রাতে জ্যোৎস্নার আলোরও প্রবেশে বাধা নেই। নীচতলা থেকে দোতলায় সবটুকু দেখে নিলাম অল্প সময়ের মধ্যে। কারণ আমাদের আরো বেশ কিছু জায়গায় যেতে হবে। অতএব অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজবাড়ি দর্শন সমাপ্ত করতে হলো। বেলা প্রায় শেষের দিকে। এবার রাতে থাকার জন্যে আবাসিক হোটেল খুজতে হবে। সঙ্গী ড্রাইভার একটা হোটেলে নিয়ে গেলেন। কিংস এল গ্র্যান্ড নামের এই হোটেলটিতে উঠে তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম। এবার যাত্রা বৃন্দাবন গার্ডেন। একটা পাহাড়ী জায়গাতে বাঁধ দিয়ে, সবুজ বৃক্ষরাজি ও বিভিন্ন রকমের ফুল গাছের সমন্বয়ে সত্যি এক অপূর্ব জায়গা তৈরি করা হয়েছে। এখানে দর্শনার্থীরা বেশিরভাগ আসেন সন্ধ্যাবেলা। তার কারণ, বাহারী বিজলি বাতির অপূর্ব ব্যবহারে একে এক স্বপ্নপুরীর রূপ দেওয়া হয়েছে। এখানে থাকলাম বেশ কিছুক্ষন। এবার ক্লান্ত শরীরে হোটেলে ফিরলাম। পরেরদিন মহিষুর থেকে ভোরবেলায় ওটি যাত্রা। মহিষুর থেকে ওটি’র দুরত্ব একশত চল্লিশ কিলোমিটার। এই যাত্রাপথটি বিশেষ কারণে উল্লেখযোগ্য। এর কিছু অংশ কর্ণাটক রাজ্যের অধীনে আর বাকি অংশ তামিলনাডু রাজ্যের অধীনে। এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। শুনেছিলাম তাতে হরিণ, বানর, হনুমান, হাতি, বাঘ, ময়ুর প্রভৃতির দেখা মিলবে যাত্রাপথে। এই কারণে সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। কখন কার দেখা পাই এই আশায় রাস্তায় মাঝে মধ্যে সতর্কবাণী লিখে দেওয়া রয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে ছবি তোলা বারণ ইত্যাদি। শংকাযুক্ত দেখার আকুলতায় কিছুদূর গিয়েও কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছিলনা বলে নিরাশ হবার উপক্রম হতে হতে কিছু হরিণ ও বানর বেরিয়ে এল। এই করতে করতে একটি হাতিও দেখা গেল একটু দূরে। গাড়ির ভেতর থেকেই যতটা সম্ভব গতি কমিয়ে ছবি তোলা চলছিল। কিন্তু যার জন্যে ব্যাকুলতা অত্যধিক অর্থাৎ ময়ুর যার স্থানীয় নাম মোরগান তার দেখা মিলছিলো না। ড্রাইভার জানালো প্রচণ্ড রোদের কারণে হয়তো এদের দেখা যাচ্ছে না।
অবশেষে অতৃপ্িতসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল পেরিয়ে নিকট দুরত্বে দেখা মিলল পরবর্তী গন্তব্য নীলগিরি। যার চূড়ায় অবস্থিত দক্ষিন ভারতের সুইজারল্যান্ড খ্যাত ওটি। তামিলনাড়ু রাজ্যের একটি জেলা শহর ওটি। বিপজ্জনক পাহাড়ি আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে কিছুদূর উপরে ওঠার পর গাড়িচালকের কথা শুনে গাড়ির বন্ধ কাঁচ খুলতেই শীতল বাতাস অনুভব করলাম। আরো কিছুদূর উপরে উঠে দেখলাম স্থানীয়দের গায়ে সোয়েটার এবং চারিদিকে মেঘের আনাগোনা। অবশেষে সর্ব্বোচ্চ শিখর যেটি নীচে থেকে, অনেক অনেক উপরে মনে হয়েছিল তাতেই পৌঁছে গেলাম। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। শীতল আবহাওয়া, গা ঘেষে মেঘের আথিতেয়তায় বরন করে নেওয়া দেখে সত্যি মুগ্ধ হতে হয়।

প্রথম গেলাম সরকারি বোটানিক্যাল গার্ডেন-এ। এখানে ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা হয়েছিল রাজবাড়ি যা গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হত। আমার দেখা বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। এমনভাবে সাজানো যেন মনে হবে হাতে আঁকা কোন ছবি। সারাটি দিন এখানেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। রাস্তার সব ক্লান্তি এইখানটায় এসে দুর হয়ে যাবে নিমিষেই। বেশ কিছু সময় এখানে কাটিয়ে দুপুরে খাওয়া পর্ব শেষে রাতের আশ্রয়স্থল খোঁজা। গরমের দিনে ওটিতে প্রচুর পর্যটক। তাই বেশ কিছু হোটেল ঘুরে অবশেষে একটি রুম পাওয়া গেল রয়েল সেন্ড রিসোর্ট নামের হোটেলটিতে। আবার বেরিয়ে পড়লামা। এবার গন্তব্য চা কারখানা দর্শন। কিভাবে কাঁচা চা পাতা থেকে খাওয়ার উপযোগী চা পাতায় রূপান্তর করা হয় তার প্রতিটি ধাপ দেখবার ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বশেষ পর্বে বিনামূল্যে এক কাপ চাও দেওয়া হয় খেতে পর্যটকদের। ইচ্ছে হলে কিছু চা-পাতা কিনেও নিয়ে আসা যায়। এর সাথে লাগোয়া চকোলেট তৈরির কারখানা। এই পাহাড় থেকে ওটি শহরটার অনেকটাই দেখা যায়। এবারে চললাম ওটি লেক দর্শনে। পাহাড় শীর্ষে লেক সত্যি মনোরম।
এখানে শিশুদের জন্য ছোট্ট খেলনা পার্কের আয়োজনও রাখা হয়েছে। এই খানেই বেলা প্রায় শেষ হয়ে এল। এরইমধ্যে বৃষ্টি বললো, কি হে পরদেশী আমার সাথে কথা হবেনা? সানন্দে বৃষ্টির সাথে আলাপন শেষে হোটেলে ফেরা। আগের দিন রাতে হোটেলে শীতল বাতাসের যন্ত্র চালাতে হয়েছিল মহিষুরে আর আজ গায়ে দিতে হল কম্বল। রাতের আরামের ঘুম শেষে পরেরদিন সকালে আমরা প্রস্তুত হয়ে পথ নির্দেশকের অপেক্ষায় রইলাম। কারণ আমরা জানিনা – সে আর কোথায় নিয়ে যাবে। এবার যেখানে যাওয়া হল, তার নাম বলা হল শ্যুটিং স্পট। আসলে এটি আরেকটি বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে লেক। এখানে মেঘেরা এবার যেন গায়ে-গা লাগিয়ে সরাসরি কথা বলতে চাইছে। আমরা তো এই আবাহনে আত্মহারা। এতে আমার মেয়ের উচ্ছলতায় যুক্ত হল মেয়ের মাও। অনেকক্ষণ ঘুরে মেঘের সাথে কোলাকুলি শেষে মনে হল বেলা অনেকদুর গড়িয়েছে। এরপর আরো কিছু সুন্দর পাহাড়ে সময় কাটিয়ে ফেরার পালা। আবার সংরক্ষিত বনাঞ্চল। আজকে নতুন আশায় তাকিয়ে রয়েছি সবাই ট্যাক্সির জানালা দিয়ে। আশার কারণ আজ মেঘলা রয়েছে সারাটা দিন। কিছুদুর যাওয়ার পর অনেক দূরে অবশেষে দেখা মিললো সেই আরাধ্য মোরগা মানে ময়ূরের। আরো এগিয়ে চললাম।

অবাক করে দিয়ে এবারের ময়ূরটি যেন আগের দিনের অভিমান ভাঙ্গাতে রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সুন্দর লম্বা লেজটুকু একটু বাঁকা করে। ছবি তুললাম অনেক। এর সাথে বিচিত্র রকমের হরিণ, বানর, হনুমান, শুকর, হাতি, বিভিন্ন রকমের পাখি এসবতো রয়েছেই। মনে হচ্ছে সবাই যেন বিদায় সম্ভাষণ জানানোর জন্য উপস্থিত হয়েছে আজ। সে কি আনন্দ। সেই অসম্ভব সুন্দর ময়ূরের দেখা পেলাম আরো অনেক। অবশেষে সেই বন পেরিয়ে পূনরায় রাত্রি বারোটার দিকে পৌঁছালাম মহিষুর হয়ে ব্যাঙ্গালোর বিমান বন্দরে। সরাসরি বিমান-বন্দর আসবার কারণ, পরদিন সকাল ৭টায় কোলকাতার উদ্দেশ্যে ছাড়বে আমাদের নির্দিষ্ট বিমান। এতে উপস্থিতির জানান দিতে হবে তারো আগে অর্থাৎ ৪.৩০ এ। ভাবলাম এই এক ঘণ্টা বিমান বন্দর বিশ্রামাগারে কাটিয়ে দেবে। কিন্তু বিশ্রামটা যে এমন মধুময় হয়ে উঠবে সেটি প্রথম যে দিন এই বিমান বন্দরে এসে ছিলাম সেদিন বুঝতে পারিনি। হয়তোবা উৎকণ্ঠার কারণে রাতের খাবার পর্ব শেষে যখন চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছি তখন খুব পরিচিত একটি রাগের সুর সমগ্র বিমান বন্দর জুড়ে সেতার আর বাঁশির যুগল পরিবেশনায় উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গ সংগীত দুই ভাগে বিভক্ত । এর মধ্যে আদান প্রদান হয়েছে। কোন রাগ নেয়া হয়েছে নাম অপরিচিত রেখে আর কোনটা দুই ধারাতেই পাওয়া যায় তবে আলাদা নামে । সে যাই হোক রাগ ইমন শুনলাম অনেকক্ষণ । এরপরে এবার যন্ত্র ও বাদন কিরোয়ানী রাগে । ততক্ষণে আমার সহধর্মণী আর আত্মজা একদিনের অবিশ্রান্ত ঘোরাঘুরিতে ঘুমে এলিয়ে পড়লেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম থেকে জেগে সংগীত শ্রবনে শামিল হল তারাও। ইতোমধ্যে আমাদের উপস্থিথির জানান দিয়ে বিমানের প্রবেশপত্র সংগ্রহের হয়ে এল । এরপর বাকি সময়টুকু যতক্ষণ পর্যন্ত বিমানে উঠিনি ততক্ষণ আনন্দে কাটলো। কিরোয়ানীর পর সানাইতে রাগ আহির ভৈরভ। এটি শেষ হবার পূর্বেই বিমানে ওঠার ডাক পড়লো । ব্যাঙ্গালোর থেকে যাত্রা শেষে নামলাম কোলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস বিমান বন্দরে। এখানে অপেক্ষা করতে হল চট্টগ্রামের বিমানের জন্য । এখানেও সুর ভেসে আসছে কি যেন একটা তবে মনটা বলে উঠলো ভারতবর্ষে উচ্চঙ্গ সংগীতের রাজধানী খ্যাত কোলকাতার এই বিমান বন্দর কি তার বাইরে। নাকি এই অভিধা ক্রমাগত পাল্টাচ্ছে। সন্দেহ হল হাওরাইয়ান গিটারে কি যেন ভেসে যাচ্ছিল ক্রমাগত একটাই কামনা। কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনতে গেলাম এতেই হলো গণ্ডগোল মাথার এক কোণায় মনে হচ্ছিল যেন বা যন্ত্রণা হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন