ইমনের ঘোড়ার গাড়ি

বাসুদেব খাস্তগীর
Untitled-1

‘বাবা আমাকে একটা গাড়ি কিনে দিতে হবে’।
বলিস কী তুই? এইটুকু বয়সে গাড়ি চালাবি,?
‘ না বাবা’।
শোন, আগে পড়ালেখা কর। দেখবি সব হবে। ঐ যে জানিস না, লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে,।
‘তুমি যে গাড়ির কথা বলছো সেটার কথা বলছি না বাবা। বলছি খেলনার গাড়ি, সেটা ঘোড়ার গাড়ি’।
‘ও সেটা বলবি তো। দেখা যাবে পরে’।
‘পরে না বাবা, আজই বিকেলে কিনে দিতে হবে। নদীর ওপাড়ে মেলা হচ্ছে বিকেলে মেলায় নিয়ে যেতে হবে’।
বাবা ও ছেলের এ কথোপকথন শুনে মা আড়াল থেকে হাসে। ইমনদের বাড়ি নদীর পার ঘেঁষে। ওপারে প্রতিবছর একটি দিনে মেলা বসে। মেলায় প্রচুর লোকের সমাগম হয়। হরেক রকমের বাহারী জিনিষ মেলায় পাওয়া যায়। শিশুদের নানা ধরনের খেলনার জিনিষে মেলা ভরে যায়। শিশুকিশোরদের পদচারণায় মেলা মুখরিত হয়ে ওঠে। আজ সেই মেলার দিন। নদী হেঁটেই পার হওয়া যায়। ইমনদের বাড়ি থেকে নদী পার হয়ে মেলায় যেতে আট দশ মিনিটের মত লাগে। ইমন সবে মাত্র ক্লাস ফাইভে ওঠেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে ইমন বন্ধুদের সাথে সকালেই একবার মেলায় ঘুরে আসে। মেলা তখন জমে ওঠে না, উদ্দেশ্য মেলায় কী কী ওঠলো একটু দেখে আসা। বিকেলে বাবায় মেলায় নিয়ে যায়। এটা সেটা কিনে দেয়। এবারও সকালে বন্ধুদের সাথে মেলায় ঘুরে আসে ইমন। মেলায় দেখে একটি স্টলে সুন্দর সুন্দর সাজানো বেশ কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি সাজানো। পিছনে চারটি চাকা, সামনে ঘোড়াকে জুড়ে দেয়া হয়েছে। দেখতে খুব সুন্দর। ইমন দেখে ভাবে, একটা ঘোড়া গাড়ি তার চাই ই। দেখে পছন্দ করেই ইমন বাড়ি ফেরে এবং বাবাকে তার পছন্দের ব্যাপারটি সরাসরি না বলে অনেকটা আকার ইঙ্গিতে বুঝাবার চেষ্টা করে। ভয় বাবা যদি আবার বকা দেয়। বাবা মুখে সরাসরি এ ব্যাপারে কিছু বলে না। ইমন ভাবে বাবা একটু মেজাজী হলেও তার প্রতি ভালোবাসার কোন কমতি নেই। সত্যি বিকেলে মেলায় গিয়ে ঘোড়ার খেলনা গাড়িটা হয়তো কিনে দেবে বাবা। বড় উৎকণ্ঠায় দিন কাটে ইমনের। কখন বিকেল হবে, কখন বাবা মেলায় নিয়ে যাবে, সময় যেনো ফুরায় না। ভাবে আবার মেলায় যেতে যেতে খেলনাটা থাকবে তো, নাকি বিক্রি হয়ে যাবে। এসব চিন্তা করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। বাবা ডাক দিলেন ‘দেখো ইমন কাজ শেষে শরীরটা তেমন ভালো ঠেকছে না, তোমার মাকে নিয়ে মেলায় যাও’ । ইমন মন খারাপ করে। মা কোন কিছু কিনে দিতে চায় না । সে ভাবে মাকে নিয়ে গেলে মা হয়তো ঘোড়ার গাড়িটা কিনে দেবে না। কিন্তু বাবাকে সে সহজে ছাড়ে না। বাবাও চিন্তা করেন প্রতিবছর তিনিই তো ছেলেকে মেলায় নিয়ে যান। অনেক চিন্তা করে বলেন ‘তৈরি হও বাবা, চলো মেলায় যাবো’। ইমন আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে। যে বলা সেই কাজ। বাবার সাথে রওনা দিলো ইমন। মেলায় পৌঁছে ইমন যেতে চাইলো খেলনার সেই স্টলের দিকে। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। সকালে ভিড় কম ছিলো। বিকেলে মেলা লোকে লোকারণ্য। ইমনের বাবা ইমনের হাত ধরে রাখে। ইমন বাবাকে মেলায় ঘোড়ার গাড়ির খেলনার স্টলের দিকে নিয়ে যেতে চায়। মেলায় কতো রকমের খেলনা। ইমনের ইচ্ছে করে সব কিনে ফেলতে। কিন্তু ঐ ঘোড়ার গাড়িটার প্রতি তার দুর্বলতাই বেশি। কিন্তু স্টলটি খুঁজে পাচ্ছে না। কোন স্টলে যে গাড়িটি রাখা ছিলো তা খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট হচ্ছে । মানুষের ভিড় ঠেলে স্টলের কাছে যাওয়াই দায়। ইমনকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে। বাবা বলে, ‘ইমন গাড়িগুলো বোধ হয় বিক্রি হয়ে গেছে’। ইমন নিশ্চুপ। মন খারাপ। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর হঠাৎ চোখে পড়ল সেই গাড়িটির স্টল। এ যেন ইমনের হাঁফ ছেড়ে বাঁচা। বাবাকে নিয়ে দেখালো। বললো’ ঐ যে গাড়িটা বাবা। গাড়িটা কিনে দাও’। বাবা দোকানির সাথে দরদাম করে। ছেলের পছন্দ দেখে দোকানীও বেশি দাম হাঁকে। কী আর করা। ছেলের আগ্রহে ইমনের বাবা গাড়িটি কিনে দিলেন ইমনকে। খুশিমনে ইমন বাবার সাথে নদী পার হয়ে বাড়ি ফেরে। গাড়িতে রশি বেঁধে ইমন ঘোড়ার গাড়ি টানে। গাড়ির পিছনে ঝুড়িতে খেলনার মালপত্র নিয়ে ইমন ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে কত খেলাই না খেলে। সাথে যোগ দেয় পাশের বাড়ির ছোট্ট বন্ধুরাও। বাড়ির উঠোনে ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে খেলে ইমন। গাড়িটার প্রতি তার ভালোবাসা দেখে বাবা মার ও ভালো লাগে। আবার গাড়িটার প্রতি বেশি অনুরাগী হয়ে পড়ালেখায় যাতে বিঘ্ন না ঘটে সেদিকেও খেয়াল রাখেন বাবা মা। ইমন খেলা ও পড়া শেষে রাতে ঘুমাতে যাই। কতো রকম স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন দেখে ইমন, এক রাজার কুমার এসে তার কাছে ঘোড়ার গাড়িটা চাচ্ছে। ইমন না করতে পারে না। ইমনের ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে টগবগিয়ে রাজার কুমার চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। ইমন কাঁদছে ঘোড়ার গাড়ির জন্য। ডাকছে বাবা মাকে। কিন্তু কেউ তার কথা শুনছে না।