আসুন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করি

মুহাম্মদ আনোয়ার শাহাদাত হোসেন

সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সুন্দরতম ও সর্বোত্তম অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। দিয়েছেন ভালো-মন্দ বিবেচনাশক্তি এবং আত্মমর্যাবোধ। মানুষের মানবিক মূল্যবোধ তাকে সৃষ্টিজগতের অন্যান্য জীব থেকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় আসীন করেছে। মানুষ যে আজ সভ্যতার চূড়ায় আরোহণ করেছে তা মানবিক গুণাবলীর উৎকর্ষতার কারণেই। মানুষ মন ও মননে মনুষ্যত্ববোধ যেমন লালন করে তেমনি পশুত্বকেও প্রশ্রয় দেয়, যার ফলে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মানুষ ভালো ও ন্যায় কাজের পাশাপাশি অন্যায়ও করে আসছে আর সৎ এবং বিবেকসম্পন্ন মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদও করে আসছে সেই অনাদিকাল থেকেই। যেখানে অন্যায় দেখেছে সেখানেই কেউ না কেউ প্রতিবাদ করেছে এবং এটি মানব-সমাজের একটি চিরায়িত ধারা। যে সমাজ বা জনপদে অন্যায়ের প্রতিবাদ হয় না সেখানে অন্যায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠে এবং ধীরে ধীরে পুরো সমাজ অন্যায়কারীদের দুষ্ট বলয়ে আবদ্ধ হয়ে যায়। প্রতিবাদের মাত্রার উপর নির্ভর করছে সমাজে অন্যায়ের পরিমাণ। প্রতিবাদ যদি সংঘবদ্ধ ও তীব্র হয় তাহলে অন্যায় সেখানে ম্রিয়মাণ হতে বাধ্য আর যদি প্রতিবাদ বিচ্ছিন্ন ও রুগ্ন হয়, অন্যায় সেখানে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সমাজকে গ্রাস করে ফেলে।
বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায় অন্যায় এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে, অন্যায়কে এখন আর অন্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ন্যায়-অন্যায় বিপরীতার্থক না হয়ে যেন সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে! অন্যায় ও অন্যায়কারীদের প্রতি মানুষের যে স্বভাবজাত ঘৃণা ছিল তা অনেকটা ভোঁতা হয়ে এসেছে। ফলে সমাজে অন্যায়কারীরা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে এবং নির্দ্বিধায় অন্যায় করে যাচ্ছে। ন্যায়পরায়ণতা যেন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝ থেকে। অন্যায়কারীরা সমাজের নেতৃত্ব দখল করে নিচ্ছে। তাদের দাপটে ব্যাহত হচ্ছে ন্যায়বিচারও। অন্যায়কারীদের প্রভাব সমাজকে গ্রাস করে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং সবকিছু যেন ধীরে ধীরে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। এই দায় কিন’ আমার-আপনার সকলের। তাদের এই জয়যাত্রা মানব সমাজের জন্য বিরাট হুমকি স্বরূপ। এভাবে চলতে দেয়া যায় না।
অন্যায়ের এই ব্যাপকতা ও অন্যায়কারীদের আস্ফালন এখনই রুখে দিতে হবে নইলে সমাজ ভালো মানুষ বসবাসের উপযুক্ততা হারাবে। নিজের চোখের সামনে গুরুতর অন্যায় সংঘটিত হতে দেখেও প্রতিবাদ করছি না। গা বাঁচিয়ে কীভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যাব প্রতিনিয়ত যেন সেই চেষ্টা করছি যা একজন বিবেকবান মানুষের ভূমিকা হতে পারে না। নিজের চারিদিকে নিত্য সংঘটিত অন্যায়ের ব্যাপারে কোন কথা না বলে গৃহকোণে বসে যদি ভাবি আমি খুব ভালো মানুষ, তাহলে সেটা নিছক ভণ্ডামি! বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন- “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে”। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা মানে তো অন্যায়কে উৎসাহিত করা। সবাই হযতো ভাবছি আমার কী দায় পড়েছে! ভাবনাটা কিন’ অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক! আমরা সমাজবদ্ধ জীব। তাই সমাজের প্রতি সকলের দায়বদ্ধতা রয়েছে। কারো প্রতি অন্যায় হতে দেখেও আজকে আপনি চুপচাপ হয়ে আছেন, ভাবছেন আপনি নিরাপদ আছেন! কিন’ আপনার উপরও এমনটি হতে পারে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই সময় থাকতে আমাদেরকে সোচ্চার হতে হবে। যে যেখানে আছি সেখান থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। কেউ প্রতিবাদ করুক না করুক আপনি শুরু করুন আপনার অবস’ান থেকে দেখবেন আরো দশজন আপনার সাথে এগিয়ে আসছেন। ব্যক্তি থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ একদিন সামষ্টিক প্রতিবাদে রূপ নেবে এবং অন্যায়কারীরা কোণঠাসা হয়ে পালাবার পথ খুঁজে বেড়াবে, সমাজ হয়ে উঠবে মানবিক ও নিরাপদ।
লেখক : কলামিস্ট