আসল-নকল ওষুধ চেনা দায়

সালাহ উদ্দিন সায়েম
Untitled-1

উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিন গ্রুপের ছয়টি ওষুধ। যা আসল আর নকল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এসব আসল আর নকল ওষুধের পাতার ডিজাইন, নামের ইংরেজি ও বাংলা বানান, এমনকি কোম্পানির নাম ও লোগো দেখতে একেবারে অবিকল। ফার্মেসিতে গিয়ে এসব ওষুধ কেনার সময় ক্রেতা বুঝতে পারবেন না, তিনি কি আসল নাকি নকল ওষুধ ক্রয় করছেন!
দেশের দুটি নামকরা কোম্পানির এই তিন গ্রুপের প্রচলিত ওষুধকে অতি মুনাফার লোভে অবিকল নকল করে বাজারজাত করেছে একটি অসাধু চক্র। মঙ্গলবার রাতে নগর গোয়েন্দা পুলিশ চক্রটির তিন সদস্যকে ফাঁদে ফেলে পাকড়াও করে।
নগরীর পশ্চিম ষোলশহর মোহাম্মদপুর এলাকার সুন্নিয়া মাদ্রাসা রোডের সাইকা ফার্মেসি থেকে তাদের আটক করা হয়। তারা এসব ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা থেকে এসএ পরিবহনের কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এনে এই ফার্মেসিতে মজুদ করে রাখতো।
নকল ওষুধগুলো জব্দের পর চক্রের সদস্য ২২ বছর বয়সী রাসেল বড়ুয়া ফার্মেসিতে গোয়েন্দা পুলিশকে বলেন, ‘স্যার, ওষুধগুলো খেলে রোগীদের লাভও হবে না, ক্ষতিও হবে না।’
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মো. আজহারুল ইসলাম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ফার্মেসিতে আমি তাদের প্রশ্ন করি, আপনাদের পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে এসব নকল ওষুধ কি খাওয়াবেন? তারা মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দেয়।’
নগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে গতকাল সকালে গিয়ে নকল ওষুধ এবং বাইরের ফার্মেসিতে গিয়ে একই গ্রুপের আসল কোম্পানির ওষুধ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আসল ‘সেকলো-২০ মিলিগ্রাম’ ক্যাপসুল ও ‘জিম্যাক্স-৫০০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেটের নতুন পাতার ডিজাইনে জাল আকারের ক্ষুদ্র স্তর (স্পট লেমিনেশন) রয়েছে। যা একেবারে মসৃণ। কিন্তু নকল সেকলো ও জিম্যাক্স পাতার ডিজাইনে জাল আকারের ক্ষুদ্র স্তর নেই।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের গ্রুপ কো-অর্ডিনেটর ফয়সাল জাহিদুর রহমান সুপ্রভাতকে বলেন, ‘আমাদের ওষুধের স্ট্রিপে এখন চারটি নিরাপত্তা স্তর রয়েছে। তারমধ্যে স্পট লেমিনেশন হলো একটি। এটা অনেকটা দৃশ্যমান। যা দেখে ক্রেতারা বুঝতে পারবেন এটা আসল ওষুধ।’
একমি কোম্পানির ‘মোনাস-১০ ’ ট্যাবলেটের পাতায় মোনাস ইংরেজি বানানের ‘ও’ অক্ষরের অর্ধেকাংশ কালো কালি দিয়ে মার্ক করা আছে। যা নকল মোনাস ট্যাবলেটের পাতায় নেই।
দি একমি ল্যাবরোটোরিজ লিমিটেড চট্টগ্রাম বিভাগের রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এরা খানদানি নকলবাজ। এজমার চিকিৎসায় আমাদের মোনাস ট্যাবলেটটি সর্বাধিক প্রচলিত একটা ওষুধ । তাই তারা এটাকে অবিকলভাবে নকল করেছে।’
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড কোম্পানির ‘সেকলো-২০ মিলিগ্রাম’ ক্যাপসুল দেশে গ্যাস্ট্রিক আলসারের অন্যতম একটি প্রচলিত ওষুধ। যার প্রতি ক্যাপুসলের বিক্রয় মূল্য ৫টাকা। একই কোম্পানির এন্টিবায়োটিক ‘জিম্যাক্স-৫০০ মিলিগ্রাম’ প্রতি ট্যাবলেটের বিক্রয় মূল্য হলো ৩৫ টাকা। আর দি একমি ল্যাবরোটোরিজ লিমিটেড কোম্পানির অ্যাজমার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ প্রতি ট্যাবলেটের দাম হলো ১৫ টাকা।
আসল ওষুধের এই বিক্রয়মূল্যের অর্ধেকের চেয়ে কম দামে কেনা যায় নকল ওষুধ । কিন্তু বিক্রেতারা আসল ওষুধ দামে নকল ওষুধগুলো বিক্রি করে থাকেন। তবে নগরীর সব ফার্মেসিতে এসব নকল ওষুধ বিক্রি হয় না। অসাধু চক্র দেখে শুনে এসব নকল ওষুধ বাজারজাত করে।
ডিবি পুলিশ সাইকা ফার্মেসি থেকে ১৪৮ বক্স (প্রতি বাক্সে ১২ পিস) ‘জিম্যাক্স-৫০০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেট ও ৯৪ বক্স (প্রতি বাক্সে ১০০ পিস) ‘সেকলো-২০ মিলিগ্রাম’ ক্যাপসুল এবং ৯৮ বক্স (প্রতি বক্সে ৩০ পিস) ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেট উদ্ধার করে। এসব ওষুধের সর্বমোট বিক্রয় মূল্য হলো ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
অনেকটা সিনেমার কাহিনীর মতো নকল কারবারিদের ফাঁদে ফেলে এসব ভেজাল ওষুধ উদ্ধার করে ডিবি পুলিশের সাদা পোশাকের একটি টিম।
ডিবি পুলিশ ১৫ দিন আগে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে একজন ফার্মেসির বিক্রেতার মাধ্যমে তাদেরকে এসব ঔষধের অর্ডার দিয়েছিল। যার ক্রয়মূল্য ছিল ৮০ হাজার টাকা। ওষুধগুলো অর্ডার দেওয়ার সময় তাদের ৫ হাজার টাকা অগ্রিম জমা দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার রাতে এসব ওষুধ ডেলিভারির সময় দেওয়া হয় বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারে। নগর গোয়েন্দা পুলিশের সাদা পোশাকের চার সদস্য ক্রেতা সেজে যায় এসব ওষুধ ডেলিভারি নিতে। তাদের পেছনে ওত পেতে ছিল সাদা পোশাকের আরও ৮ পুলিশ সদস্য। চক্রের সদস্য রাসেল বড়ুয়া ডিবি সদস্যদের বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের বিভিন্ন অলি-গলি একের পর এক ঘুরাতে থাকে। কাঁচাবাজার থেকে ডিবি সদস্যদের পরে নিয়ে যাওয়া হয় খতিবের হাটে। কিন্তু ওষুধ ডেলিভারি দেওয়া হয় না। একপর্যায়ে চক্রের সদস্য বাকি টাকাগুলো আগাম দিয়ে ফেলতে বলে। কিন্তু ডিবি পুলিশ ওষুধ দেয়ার আগে টাকা দিতে নারাজ। পরে ডিবি সদস্যদের পশ্চিম ষোলশহর মোহাম্মদপুর এলাকার সুন্নিয়া মাদ্রাসা রোডের সাইকা ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঔষধের কার্টনগুলো বের করা মাত্রই তাদের পাকড়াও করে ফেলেন ডিবি সদস্যরা।
রাসেল বড়ুয়াসহ ফার্মেসি থেকে আটক করা হয় মো. শহীদ উল্লাহ ওরফে সুমন ও মো. শরীফুল ইসলাম মাসুদ নামের আরও দুই যুবককে। এরমধ্যে শহীদ উল্লাহ একমিসহ আরও চারটি ওষুধ কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করেছেন। সাত বছর আগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ এলাকার একমি কোম্পানির সাবেক এরিয়া ম্যানেজার মো. জাকিরের সাথে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তারা ওষুধ কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন নামি-দামি কোম্পানির ওষুধ নকলের কাজে নেমে পড়েন। তবে জাকিরের সন্ধান পাননি গোয়েন্দারা। আটক তিনজনসহ জাকিরকে পলাতক আসামি উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে ডিবি পুলিশ।