আশ্রয়হারা শিশুর মায়াভরা ঠিকানা

কামরুন নাহার সানজিদা
upolobdhi-(5)

পিতৃ-মাতৃহীন বা পথে থাকা যেসব শিশুর কোনো আশ্রয় নেই, তাদেরকে আমরা বলি পথশিশু। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এসব পথশিশুকে আশ্রয় দিতে বিভিন্ন সময় নানাজন এগিয়ে এসেছেন। এদের জন্য কাজ করা অধিকাংশ সংগঠনই নির্ভরশীল বিদেশি অর্থ সহায়তার ওপর।
তবে একটি শিশুর জন্য যে তারা টানা অর্থ সহায়তা দিতে থাকে, এমনটি হয় না। কখনো দুই তিন বছরের একটি প্রকল্প, কখনো সর্বোচ্চ ১৫ বা ২০ বছরের প্রকল্প। এরপরেই এসব প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। আর যেসব শিশু এসব সংস্থার সাহায্য পেতে থাকে, প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পর হুমকির মুখে পড়ে তাদের পুরো জীবন। তখন আর নিজের পায়ে দাঁড়ানো হয়ে ওঠে না। নিজের জন্য চলার পথ আর চেনা হয় না।
পথশিশুর প্রতি মায়া থেকে তাদের জন্য কাজ করছেন, এমন একজন মানুষ- শেখ ইজাবুর রহমান। নিজের চাকরির পাশাপাশি একটি বেসরকারি সংস্থার শেল্টার হোমে শিশুদের পড়াতেন। এর জন্য কখনো কোনো ফি তো নেননি, বরং শেল্টার হোমটি বন্ধ হওয়ার পর নিজ উদ্যোগে তখনো তাদের
পড়াতে থাকেন তিনি। তাদের পড়াশোনার জন্য নিজেই দিতেন খরচ।
ধীরে ধীরে পথশিশুদের জন্য তিনি আরো বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েন। আজ তিনি নিজেই একটি শেল্টার হোমের দায়িত্বে আছেন। সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান ‘উপলব্ধি’র প্রতিষ্ঠাতা শেখ ইজাবুর রহমানের এই ড্রপ-ইন-সেন্টার এখন সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের ঠিকানা। আর এই সেন্টারের মেয়েদের দেখাশোনায় বিদেশি সহায়তার দিকে চেয়ে নেই এ মানুষটি। প্রতিটি মেয়ের জন্য তিনি জোগাড় করেছেন একটি করে ডোনার।
‘বেশিরভাগ সংস্থা বিদেশি সহায়তার দুই-তিন বছরের প্রজেক্টনির্ভর। প্রজেক্ট শেষ হলে, টাকা আসাও বন্ধ।’ বলছিলেন শেখ ইজাবুর রহমান। ‘কিন্তু এই দুই বছর পর আমার আশ্রয়ে থাকা শিশুগুলো কোথায় যাবে? এজন্যই আমি দেশীয় সচ্ছল ডোনারদের কাছে গিয়েছি। প্রত্যেকটি শিশুর জন্য একজন করে ডোনার। ৫ জন ডোনার চলে গেলেও আমার সমস্যা হচ্ছে না। বাচ্চাদের বড় করা তো আর দুই-চার বছরের প্রজেক্ট না।’
বিদেশি অর্থসহায়তা মানে নিজের কোনো দায়বদ্ধতা না থাকা। ইজাবুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবসময় অন্যের ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে দিতে চাই। যখন বাইরে থেকে টাকা আসে, আমরা পুরোপুরি সে টাকার ওপর নির্ভর হয়ে পড়ি। টাকা এলো, কাজ হলো। টাকা নেই তো কাজও বন্ধ।’
তার ড্রপ-ইন-সেন্টারের ৪৫ জন মেয়ের জন্যই চট্টগ্রামের বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তি সাহায্য করছে বলে জানা যায়। আরো অনেক সচ্ছল ব্যক্তিই এখানকার মেয়েদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে প্রায়ই আগ্রহ জানান। তাই নতুন কোনো মেয়ে সেন্টারে এলেও তার কোনো সমস্যা হবে না।
ফিরিঙ্গবাজার মোড়ে একটি বহুতল ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় উপলব্ধি’র ড্রপ ইন সেন্টার। মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য পঞ্চম তলাতেই একটি গেইট স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে সার্বক্ষনিকভাবে তালা লাগানো থাকে। কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই প্রবেশ করতে পারেন।
এসব শিশুকে দেখাশোনা করা নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন এ ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘কোনো না কোনোভাবে এদের সাথে আমাদের রক্তের সম্পর্ক আছে। এই পথশিশুগুলো পথে ঘাটে অনেক ঠেকে ঠেকে জীবনকে শিখেছে। তাই তাদেরকে ভালোভাবে পরিচর্যা করা গেলে এরা একসময় অনেক বড় হবে। নিজের গর্ভজাত সন্তানকে আমরা যেভাবে লালনপালন করি, এদেরকে সেভাবে পরিচর্যা করলে, এরা আমাদের নিজের গর্ভজাত সন্তানের চেয়ে বেশি দেবে।’
‘একসময় এ বাচ্চাগুলো যখন নতুন এসেছিলো, তখন নতুন কোনো লোক দেখলেই পালিয়ে যেত। এখন তারা বলে আমরা পারি, আমরা পারবো। আমরা আকাশ ছুঁবো।’ পালিত এসব শিশুদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চোখ জ্বলজ্বল করছিলো তাঁর।
অনাথ এসব শিশুর পরিচর্যার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাই করা হয়েছে এ সেন্টারে। পৃথক ৬ জন গৃহশিক্ষক আছেন, শুধু একাডেমিক পড়াশোনার জন্য। এখানে তাদের জন্য আছে উপলব্ধি’র নিজস্ব চিকিৎসা কেন্দ্র। যেখানে দুই জন চিকিৎসক নিয়মিত চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এছাড়া গানের জন্য, নাচ শেখার জন্য, শারীরিক শিক্ষার জন্য, আবৃত্তির জন্যও পৃথক পৃথক শিক্ষক আছেন।
যাদের জন্য এত আয়োজন, তারাও কখনো নিরাশ করেনি ইজাবুর রহমানকে। দুই জন মেয়ে এবার নিজ নিজ শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এর মধ্যে তাহমিনা নামে তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে শুধু ৫ নম্বর কম, বাকি সবগুলো বিষয়ে ১০০ তে ১০০ নম্বর পেয়েছে।
এ বছর বিতর্কে জেলা প্রতিযোগিতায় রানার্স আপ হয়েছে উপলব্ধি’র একটি মেয়ে। খেলাধুলায়ও সবার দৃষ্টি করেছে তারা। মাসের পর মাস যারা অনুশীলন করে আর্চারি প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়, স্কোর করে, সেখানে এখানকার একটি মেয়ে মাত্র ১৫ দিনেই স্কোর করেছে। আবৃত্তির জন্যও প্রশংসিত হয়েছে তারা। প্রয়াত বিশিষ্ট আবৃত্তিকার কাজী আরিফ ড্রপ-ইন-সেন্টারে বড় হওয়া এসব মেয়েদের কন্ঠে আবৃত্তি শুনে বেশ প্রশংসা করেছিলেন।
বই পড়ানোর অভ্যাস করাতে সেন্টারে ছোটখাটো একটি লাইব্রেরিও তৈরি করা হয়েছে। বই পড়ায় কৃতিত্ব দেখানোয় সেন্টারের একটি মেয়ে এ বছর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে বিশেষ পুরস্কারও পেয়েছে।
এছাড়া সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় যেখানেই অংশ নিয়েছে, সেখানেই তারা সবার নজর কেড়েছে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ১৫টি পুরস্কারের মধ্যে ১০টি পুরস্কারই ঘরে তোলে উপলব্ধি’র মেয়েরা। তবে এসব আশ্রিত শিশুকে শেখানোর কাজে থাকা অধিকাংশ শিক্ষকই কোনো ফিস নেন না। এর মধ্যে মেয়েদের ডোনারও আছে। আছে চাকরিজীবীও। প্রতিদিন ঠিক সময়ে এসে তারা নিয়মিত পাঠদান করান। যে দুইজন চিকিৎসক তাদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন, জানা গেলো, তারাও এই সেবার জন্য কোনো অর্থ গ্রহণ করেন না।
ফিরিঙ্গিবাজারের আশেপাশে বিভিন্ন স্কুলে এখানকার মেয়েরা পড়াশোনা করে। কেউ ফিরিঙ্গিবাজার প্রাইমারি স্কুল, অপর্ণাচরণ সিটি কর্পোরেশন স্কুল, ওডেপ এর সাসটেইন স্কুলে। তবে যেসব মেয়েশিশু ১০-১২ বছরের বেশি বয়স, কিন্তু কখনো স্কুলে পড়াশোনা করেনি, তাদেরকে প্রথমে সাসটেইন স্কুলে পাঠানো হয়। যেখানে বছরে দুই তিনটি শ্রেণি শেষ করে নির্দিষ্ট একটি সময়ে তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্কুলে ভর্তি করানো হয়।
এসব মেয়েকে কিভাবে পেলেন? জানতে চাওয়া হয় ইজাবুর রহমানের কাছে। তিনি জানান, ‘কোনো শিশুকে কোথাও থেকে যদি পুলিশ উদ্ধার করে, তাহলে থানা থেকে আমাদের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়। কখনো কখনো রাস্তায় তেমন কাউকে পেলে বা আমাদের আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত কেউ যদি এমন অনাথ মেয়ে পান, তাহলে আমাদের কাছে তাদের দিয়ে যান। আমরা অন্য কোথাও থেকে কাউকে গ্রহণ করলে থানায় জানিয়ে তারপর নিই।’
উপলব্ধি’র কাজ কিভাবে শুরু হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে আমি অপরাজেয় বাংলাদেশ এর ষোলশহর দুই নম্বর গেইটের একটি শেল্টার হোমে বাচ্চাদের পড়াতাম। তখনো আমি চাকরি করি। সেখানে সকালে ও রাতে বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থা ছিলো। আমি সেখানে দুপুরেও খাবারের ব্যবস্থা করি। অপরাজেয় বাংলাদেশ ছিলো ইউনিসেফের অর্থে পরিচালিত একটি সংস্থা। একসময় ইউনিসেফ অর্থ সহায়তা কমানো শুরু করে। তখন ওই শেল্টার হোমটি বন্ধ হয়ে যায়।
আমি তখনও সেখানকার বাচ্চাদের পড়াতাম। ওই বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য কখনো বেতন নিইনি। বরং ৩০-৪০ হাজার টাকা আমি নিজেই দিতাম। প্রথমে ব্যক্তিগতভাবে আমি পথশিশুদের জন্য কাজ করলেও ২০১০ সাল থেকে উপলব্ধি’র কাজ শুরু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করি ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে।
ইউনিসেফের সাহায্য বন্ধ হয়ে গেলে অপরাজেয় বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানুর সাথে আলোচনা করি। চট্টগ্রামে তাদের মেয়েদের শেল্টার হোমে যারা ছিলো তাদের সাথে আমার কিছু মেয়ে ছিলো, তাদেরকে একসাথে এইখানে নিয়ে আসি।’
‘সবার মাঝেই সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে। আর পরিবেশ পেলে সবার মধ্যে থাকা সেই প্রতিভা বিকশিত হওয়া সম্ভব। আমাদের যেসব মেয়ে পথে ঘাটে থাকে, কয়েক মাস পর তারা হারিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ তারা। সমাজেও তাদেরকে বোঝা হিসেবে দেখা হয়। তাই তাদেরকে নিয়েই কাজ করছি।’
এসব মেয়েদের নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী? ‘বয়সসীমা পার হওয়ার পর তাদেরকে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেলে রাখা হবে। যারা পড়াশোনায় ভালো, তারা চাইলে আরো চালিয়ে যাবে। যারা কাজ শিখতে চায়, তাদের কাউকে বুটিকের কাজ শেখানো হবে। কাউকে নার্সিং হোমে পাঠিয়ে কাজ শেখানো হবে। যে যেদিকে যেতে চায়, সেখানেই তাকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সবরকম সহায়তা করা হবে। তবে বয়সসীমা বলতে শুধু ১৮ বছর নয়। অনেকে কিশোরি বয়সী আছে। যারা এখনো নিচু ক্লাসে পড়াশোনা করছে। যারা মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করবে, তাদেরকেই আমরা স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেলে নেবো।’
এছাড়া চট্টগ্রামে দুই কানি জমির বন্দোবস্ত করার চেষ্টায় আছেন ইজাবুর রহমান। যেখানে তিনি মেয়েদের জন্য স্থায়ী একটি সেন্টার খুলতে পারবেন। সেখানে মেয়েশিশুর পাশাপাশি ছেলেশিশুর জন্যও থাকবে ব্যবস্থা। এছাড়া আর যতো পরিকল্পনাম, সেই জমিতেই তিনি তা গড়ে তুলতে চান।
তিনি একটি বৃদ্ধাশ্রমও গড়তে চান। যারা বৃদ্ধ বয়সে ভীষণ একা হয়ে যান, অথচ সন্তানের অভাব সবসময়ই অনুভব করেন, আবার যেসব অনাথ শিশু তাদের বাবা-মায়ের অভাব ভুলতে পারে না, এই দুই প্রজন্মকে একটি বন্ধনে নিয়ে আসার পরিকল্পনাও করছেন তিনি।
ইজাবুর রহমানের সেন্টারটিতে শুধু অনাথ মেয়েদের আশ্রয় নয়। অক্ষম বাবা বা মায়ের কন্যাশিশুরাও এখানে আশ্রিত। কারো বাবা আছে, কিন্তু মা নেই, কারো মা আছে, কিন্তু বাবা নেই। যেখানে সমাজের অবহেলিত পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েশিশু আছে, তাদেরকে উপলব্ধি’র ঠিকানায় নিয়ে আসার জন্য বার বার অনুরোধ করেছেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে শেখ ইজাবুর রহমান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছেন। নিজের দক্ষতা ও পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে এই মেয়েদের জন্য জোগাড় করেছেন একেকজন দাতা। নিজে সমাজসেবামূলক সংগঠন লায়ন্স ও রোটারিতে জড়িত ছিলেন। সেখান থেকেও চট্টগ্রামের স্বচ্ছল ও দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে পেয়েছেন সহযোগিতা।
১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছেন শেখ ইজাবুর রহমান। ১৯৮৪ সালে যোগ দেন পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তার স্ত্রীও একই প্রতিষ্ঠানে জ্যৈষ্ঠ কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।