আলোকপথের অভিযাত্রী

গোলাম কিবরিয়া ভূইয়া

বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে যে কয়জন বিশিষ্ট লেখক বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতিতে অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে আহমদ ছফা অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন বহুমাত্রিক লেখক। কবি, প্রবন্ধকার, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবে ছফা ষাটের দশক থেকে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর জীবনকাল ছিল ১৯৪৩-২০০১ পর্যন্ত। ছফার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এ’ছাড়া তিনি বেশ কিছু উপন্যাস লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে ‘সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭), একজন আলী কেনীনের উত্থান পতন(১৯৮১), ‘ওঙ্কার (১৯৯৩), অলাতচক্র(১৯৯০)। ‘গাভী বৃত্তান্ত (১৯৯৪), অর্ধেক নারী অর্ধেক ইশ্বরী (১৯৯৬) উল্লেখযোগ্য। গল্পগ্রন্থ ‘নিহত লক্ষত্র’ (১৯৬৯) ছোটগল্পে তাঁর অবদানের একটি বিশেষ উদাহরণ। ছফা প্রথাগত পেশাজীবী ছিলেন না জীবন-জীবিকার জন্য লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বৃদ্ধিজীবী ও লেখক মহলে ছফা একটি বিশিষ্ট নাম। সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে ছফা ছিলেন একজন প্রতিবাদী কণ্ঠ। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আহমদ শরীফের নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশ লেখক শিবির প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তিনি সাংগঠনিক পর্যায়ে যথেষ্ট শ্রম ব্যয় করেন। আহমদ ছফা নিজের দেশের তরুণেরা যাতে প্রগতি চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয় সে জন্যে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী একজন লেখক। মানববাদী বিভিন্ন সংগঠনের সাথে নিজেকে জড়িত রাখেন। ছফা ২০০১ সালে মৃত্যুবরণ করেন তবে তাঁর সান্নিধ্য, প্রভাবকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত মহল অদ্যাবধি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে থাকে।
সরদার আবদুস সাত্তার ছিলেন আহমদ ছফার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকা একজন শিক্ষাবিদ। আহমদ ছফার কাছাকাছি থেকে তিনি তাঁর অনেক গুণাবলীকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে দেখেছেন। বর্তমান গ্রন্থটিকে মূলত ছফাকে নিয়ে লেখকের ভালবাসার একটি মূল্যায়ন বলা যায়। ছফা লিখিত আত্মজৈবনিক উপন্যাসগুলো সম্পর্কে সরদার সাত্তার কিছু কিছু তথ্য গ্রন্থে বলেছেন যেগুলো পাঠকদের কাছে নতুন হিসেবে প্রতিভাত হবে। একজন লেখকের লেখাকে ভালোবেসে অনেকেই লেখকের মনের কাছাকাছি চলে আসেন। এমন উদাহরণ আহমদ ছফাকে নিয়েও সাত্তার দিয়েছেন। যেমন – ‘ইন্দিরা চলে যাবার অনেক পরে ফারজানার সঙ্গে ছফা ভাইয়ের একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মৃদুভাষী এই মেয়েটিও ভারি মিষ্টি দেখতে। স্বভাবের দিক থেকেও খুব স্নিগ্ধ। অনেক নারীর নিবিড় সান্নিধ্যে পৌঁছেও ছফা ভাইয়ের যে প্রেম অদেয়ই থেকে গিয়েছিল। … ছফা ভাই তার সাহিত্যে ফারজানার জন্য একটি অসামান্য আসন নির্মাণ করে রেখে গেছেন। অর্ধেক নারী অর্ধেক ইশ্বরী উপন্যাসে তিনি তার নামকরণ করেছেন ‘সোহিনী’। এই নামের অর্থ ও তাৎপর্যও তিনি সেখানে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। … ফারজানার মুখের আদল ও সৌন্দর্যকেই তিনি ওই উপন্যাসটির প্রচ্ছদে উপস্থাপন করেছেন। (পৃ. ১৭৭-৭৮)।
ছফা সামাজিকভাবে অনেক বিশিষ্ট জনের সাথে সম্পর্ক রাখতেন। কিন্তু তাদেরকে তিনি নিজের মত করে মূল্যায়ন করতেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মৃত্যুক্ষণে ছফার অনুভূতি ছিল হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার প্রতিফলন। সরদার সাত্তার লিখেছেন – ‘দোতলার ঘরটিতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিকিৎসা চলছিল। সেখানেই একটা চাদর ঢাকা অবস্থায় তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ছফা ভাই ঘরে ঢুকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আমাদের সবার চোখে পানি। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছি না। একটা শিশুর মত ছফা ভাই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলেন। অনেক দূর থেকেও তাঁর কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।… (পৃ. ৭৯)
লেখালেখির বিষয়ে আহমদ ছফা ছিলেন একজন বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী। মাঝেমধ্যেই তিনি নিজেকে পরিবর্তন করে যেতেন এবং অন্য কোন প্রসঙ্গে লেখার জন্য হাত দিতেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কন্যা অন্নপূর্ণাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি তা শেষ করেননি। আবার এরই মাঝে ছফা আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়েও লেখার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর লেখা ’পুষ্পবৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ’ আর ’যদ্যপি আমার গুরু’ প্রকাশের মধ্যবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ’শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপ্যাধ্যায়’। সাত্তার লিখেছেন, ’বইয়ের নামের মধ্যেই যেমন একটা তীব্র ঝাঁজ আছে, বইয়ের প্রতিপাদ্য বিষয় এবং বক্তব্যেও ঘাটতি নেই।… ফলে বইটি বেরুনোর পর থেকেই অনেক তর্ক বিতর্ক হয়েছে। বইটিতে পাঠক ও সমালোচকরা স্পষ্টতই দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।’ (পৃ. ১৮১) তবে ছফা ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য দিতেন। কারো ভিন্নমত থাকলেও তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখাতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। বঙ্কিমের সার্ধশত জন্মবর্ষ পালনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থের লেখক সাত্তার যখন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তখন ঢাকার ডানপন্থী পত্রিকা ও চিন্তার অনুসারীগণ তাঁদের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তখন আহমদ ছফা ঠিকই আয়োজকদের পক্ষে দাঁড়ান। আর এভাবেই তিনি জীবনের পুরো সময়ই বিপন্নদের পক্ষে থেকে লড়াই করেছেন।
রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় আহমদ ছফা নিজেকে বরাবরই প্রগতিশীল শিবিরের সাথে যুক্ত রেখেছেন। সরদার সাত্তার এর উদাহরণ হিসেবে বেশ কিছু তথ্য বর্তমান গ্রন্থে দিয়েছেন। ছফার একটি নির্মোহ দৃষ্টি ছিল। এর ফলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর অর্থনৈতিক চরিত্র তিনি সুন্দরভাবে স্টাডি করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে হাজার কোটিপতির জন্ম হওয়ায় ছফার চিন্তা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে।
একটি ছোট দরিদ্র দেশে এই পরিমাণ ধনীদের উত্থান, সেটা নির্লজ্জ লুণ্ঠনের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।… শেখ মুজিবুর রহমানের রাজত্বকালে এই কোটিপতিদের জন্ম। জিয়াউর রহমান লালন করেছেন এবং বাড়িয়ে তুলেছেন। এরশাদ সমাজ জীবনে তাদের বৈধতা দিয়েছেন। হাল আমল পর্যন্ত এসে তারা গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রটা তাদের কব্জার মধ্যে এনে ফেলেছেন। তাদের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া কোন সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারেন না।… আমাদের দেশে যেসকল মানুষ হঠাৎ ধনী হয়ে উঠেছে, জাতীয় বুর্জোয়ার অঙ্গীকার তাদের কাছ থেকে আশা করা দুরাশার শামিল। মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলাই তাদের একমাত্র অভিষ্ট লক্ষ্য। তাদের বিকাশ আমাদের জাতীয় জীবনের বিকাশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একটি সুরঙ্গ পথের ভেতর দিয়ে হেঁটে জাতির শিরোভাগে অবস্থান গ্রহণ করে তারা জাতির অগ্রগতির পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে। (সাত্তার কর্তৃক উদ্ধৃত, পৃ. ২৪৫)
ছফা মনে করেন সৎ ও মেধাবী মানুষদের রাজনীতিতে অনুপস্থিতি এবং বামপন্থীদের ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ার কারণেই এই লুটপাট বাহিনী হঠাৎ নবাবদের এমন একটা আর্থিক দৌরাত্ম্যের সৃষ্টি হয়েছে। ছফার বিশ্বাস, মেহনতি শ্রমিক যুবকের সক্রিয় অংশগ্রহণে মুখর হয়ে ওঠা বামপন্থীদের রাজনীতি এই হতাশাজনক অবস্থা থেকে দেশকে বের করে আনতে পারে। তবে তার আগে বামপন্থীদের নিজেদের দুর্বলতাসমূহকে চিহ্নিত করে কাটিয়ে ওঠার শক্তি এবং সাহস সঞ্চয়ে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। ১৯৫২ সাল থেকে ’৭১ সাল পর্যন্ত বামপন্থীরা এদেশের সকল তাৎপর্যপূর্ণ আন্দোলনের জনক, সংগঠক ও পরিচালক ছিল। কিন্তু আজ অনেকক্ষেত্রেই তারা পলায়নবাদী এবং নিষ্ক্রিয়। ছফা তাঁর প্রবন্ধে বামপন্থীদের এ দুর্বলতার ১১টি কারণ নির্দেশ করেছেন।
প্রাথমিকভাবে বর্তমান গ্রন্থটিতে আহমদ ছফার নানা বৈশিষ্ট্য তথা চারিত্রিক গুণাবলী সর্দার সাত্তারের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। বাস্তবে আহমদ ছফার উপন্যাস, প্রবন্ধ অথবা অন্যান্য বিষয়ে তাঁর লেখাগুলোর মূল্যায়নও রয়েছে। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা প্রতিটি লেখকের রচনায়ই কম-বেশি রয়েছে। ছফাও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। ছফার জীবদ্দশায় তাঁর কর্মকীর্তি মূল্যায়ন করতে গিয়ে সর্দার সাত্তার তাঁর সাথে নিজের সাহচর্যও উপস্থাপন করেছেন গ্রন্থটিতে। গ্রন্থে শিল্পী এস. এম. সুলতানের আটটি চিত্র সংযোজিত হয়েছ। ছফার মূল্যায়নে শিল্পী জয়নুল আবেদিন ও এস. এম. সুলতান আরো যেন বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন। সর্দার সাত্তার যথেষ্ট শ্রম ও নিজের আগ্রহকে পুঁজি করে আহমদ ছফাকে নতুনভাবে পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করেছেন। আহমদ ছফার জীবনপঞ্জি, তাঁর লিখিত গ্রন্থের সূচি ও কিছু আলোকচিত্র গ্রন্থটিতে সংযোজন করা প্রাসঙ্গিক ছিল। সর্দার সাত্তারের ভাষা প্রাঞ্জল এবং হৃদয়গ্রাহী হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় যদিও বেশি আবেগতাড়িত হতে তাঁকে দেখা যায়। আহমদ ছফাকে নতুন করে মূল্যায়ন করায় সর্দার সাত্তারকে অভিনন্দন। প্রচ্ছদ শোভন হয়েছে। একই সাথে প্রকাশককেও আন্তরিক ধন্যবাদ।