আরও ৩৪ মামলার কব্জায় খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা এবং কারাবাসের আশংকা আগেই করেছিলেন আইনজীবীরা। কারাবন্দি হয়ে পড়লেও উচ্চ আদালতে আপিল এবং জামিনের মাধ্যমে বিএনপি নেত্রীকে মুক্ত করার প্রস’তিও নিয়ে রেখেছিলেন। কিন’ আইনজীবীদের সব প্রস’তিতে যেন গুড়েবালি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া অন্য মামলাগুলি যেভাবে সচল হতে শুরু করেছে, তাতে তিনি সহসাই মুক্তি পাচ্ছেন না বলেই ধারণা তার আইনজীবীদের। বিশেষ করে এক-এগারোর সময়ে খালেদার বিরুদ্ধে আরও যে চারটি দুর্নীতির মামলা হয়েছিলো,
সেগুলোর বিচারও শেষপর্যায়ে। বর্তমান সরকারের আমলে দায়ের হওয়া ৩০টি মামলার দিকেও নজর পড়েছে প্রশাসনের। বাসে পেট্রল বোমা ছুড়ে আগুনে পুড়িয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় গতকাল গ্রেফতার দেখানো হয় বিএনপি চেয়ারপারসনকে। এর মধ্য দিয়ে বাকি মামলাগুলিও আলোচনায় আসতে শুরু করেছে।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান গতরাতে জানান, চলতি সপ্তাহেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার আশা ছিলো। কিন’ পরিসি’তি যা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে বিএনপি নেত্রীকে দীর্ঘমেয়াদে কারাবাসের আয়োজন চলছে। বিশেষ করে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ঘটনায় আমরা ধারণা করছি, সহসা তাকে মুক্ত করানো সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে আদালত চাইলে যে কোনো কিছুই হতে পারে।
এই আইনজীবী আরও জানান, নিম্ন আদালতের রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পেলে উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়ার বেকসুর খালাস চেয়ে আবেদন করা হবে। পাশাপাশি জামিনে মুক্তির আবেদনও করার প্রস’তি আছে। কিন’ গতকাল পর্যন্ত সেটি মেলেনি। ফলে উচ্চ আদালতে আবেদনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন মামলায় খালেদাকে গ্রেফতার দেখানোয় ওই মামলায়ও আলাদা করে জামিনের আবেদন করতে হবে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস’া ফেরানোর দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ওই নির্বাচন বর্জন করে দলটি। ফলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। পরে ওই সরকারকে ক্ষমাতচ্যুত করতে আন্দোলন অব্যাহত রাখে ২০ দলীয় জোট। নির্বাচনের আগে ও পরের ওই আন্দোলনে টানা কয়েক মাস জ্বালাও-পোড়াওয়ে অসি’র ছিলো গোটা দেশ। বিভিন্ন নাশকতার ঘটনায় বহু হতাহতের ঘটনাও ঘটে। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলন্ত বাসে পেট্রল ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। পেট্রলের আগুনে দগ্ধ হয়ে আটজন যাত্রী মারা যান। সেই ঘটনায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে মামলা হয়। পরবর্তীতে ওই মামলায় খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। গতকাল সেই পরোয়ানা কার্যকর হয়। নড়াইলে দায়ের হওয়া একটি মামলায়ও খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি আছে। সেটিও কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বিএনপির স’ায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান গতকাল বলেন, ‘দল পরিচালনার জন্য খালেদা জিয়া যথেষ্ঠ পরামর্শ দিয়ে রেখেছেন। আমরা তার নির্দেশনা অনুযায়ী দল চালাচ্ছি। পাশাপাশি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) তো আছেনই।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর ঘটনায় প্রমাণিত হলো সরকার তাকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে। কিন’ বিএনপি আগামী নির্বাচনে যাবেই। কোনো ষড়যন্ত্রেই সরকার বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, খালেদা জিয়াকে নিয়েই নির্বাচন করবে বিএনপি। এর জন্য তাদের যথেষ্ঠ আইনি মোকাবিলার প্রস’তি থাকার কথা জানান তিনি।
আদালতের নথিপত্র দেখে জানা যায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরও চারটি মামলা চলমান রয়েছে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট, নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতির মামলা চারটি দায়ের হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচার শেষপর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। আগামী ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস’াপনের দিন ধার্য আছে।
এ ছাড়া ২০১৪ সালের পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হয় ৩০টি মামলা। রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা, ইতিহাস বিকৃতি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি, ভুয়া জন্মদিন পালনের অভিযোগে এসব মামলা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ২৫টি, কুমিল্লায় তিনটি এবং পঞ্চগড় ও নড়াইলে একটি করে মামলা রয়েছে। সবমিলিয়ে বিএনপি নেত্রীর ১৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বাকি মামলাগুলিও সচল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।