আমেরিকান হাসপাতালের এমন করম্নণ অবস্থা!

৬৭ বছর আগের অর্গানোগ্রাম ও অবকাঠামোতে চলছে সেবা প্রতিদিন গড়ে ৫০০ রোগীকে চিকিৎসা দেন মাত্র চারজন মেডিক্যাল অফিসার ১ বছর ধরে খালি সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদ খসে পড়ছে ভবনের ছাদের পলেসত্মরা

সালাহ উদ্দিন সায়েম

আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী লোকজনদের অনেকে চর্মরোগে আক্রানত্ম হয়ে দেশে আসলে চিকিৎসা নিতে ছুটে যান নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার ‘আমেরিকান হাসপাতালে’। ঢাকা থেকে শুরম্ন করে দেশের বিভিন্ন এলাকার রোগীরাও ছুটে আসেন চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য খ্যাত এ হাসপাতালে। কিন’ রোগীরা যখন গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তখন জীর্ণশীর্ণ
হাসপাতালের চেহারা দেখে বিস্মিত হয়। এরপর হাসপাতালে ঢুকে যখন টিকেট কাটে তখন তাদের চোখ যেন কপালে উঠে! আমেরিকান হাসপাতালের টিকেটের মূল্য যে পাঁচ টাকা!
আমেরিকান হাসপাতাল নামে পরিচিত হলেও এটির মূল নাম ‘কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস’্য কেন্দ্র’। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এটি। সরকারি এ হাসপাতালে আউটডোরে কেবল চর্ম ও যৌন রোগের সেবা দেওয়া হয়।
জানা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রানত্ম থেকে রাতে চট্টগ্রাম শহরে এসে পরদিন ভোরে হাসপাতালের গেইটে গিয়ে লাইনে দাঁড়ান রোগীরা।
গতকাল এ হাসপাতালের আউটডোরে চিকিৎসা নেয় ৪৯৯ জন । প্রতিদিন সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ জন রোগীর সেবা দেওয়া হয় চর্ম রোগের চিকিৎসার জন্য খ্যাত হাসপাতালে।
কুমিলস্না থেকে আসা শাসুন্নাহার বেগম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘শুনেছি, আমেরিকান হাসপাতালে চর্ম রোগের ভালো চিকিৎসা দেওয়া হয়। গতরাতে কুমিলস্না থেকে এসে শহরে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছি। ভোরে হাসপাতালে এসে লাইন ধরেছি। মাত্র পাঁচ টাকা টিকিটের দাম শুনে অবাক হয়েছি। কিন’ হাসপাতালটার চেহারা দেখে খারাপ লাগলো।’
সুনামের কারণে সেবা নিতে রোগীরা ছুটে আসলেও ঐতিহ্যবাহী এ হাসপাতালের এখন করম্নণ অবস’া।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে হাসপাতালটির করম্নণ চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম চলছে ৬৭ বছর আগের সেই অর্গানোগ্রামে। যে অর্গানোগ্রামে রয়েছে মাত্র পাঁচজন চিকিৎসক। এরমধ্যে একজন সিনিয়র কনসালট্যান্ট আর চার জন মেডিক্যাল অফিসার। কিন’ বর্তমানে চিকিৎসক আছেন চারজন। এক বছর ধরে সিনিয়র কনসালটেন্ট পদটি খালি আছে।
এ চার জন চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ জন রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় তাদের। দুটি রম্নমে বসে চারজন চিকিৎসককে সেবা দিতে হয়। রম্নমে চিকিৎসকদের চেয়ার-টেবিলগুলো ভাঙাচোরা ও নড়েবড়ে। এ চেয়ার-টেবিলগুলো সেই পাকিসত্মান আমলের। চিকিৎসকের কড়্গে রোগীদের বসারও চেয়ার নেই; দাঁড়িয়ে থেকে সেবা নিতে হয়।
রোগীদের পরীড়্গা-নিরীড়্গার জন্য যে ল্যাব রয়েছে তা আছে কেবল নামেই। কারণ এখানে কোনো মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নেই।
হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. সুরজিত দত্ত সুপ্রভাতকে বলেন, ‘রোগীরা এখনো আমেরিকান হাসপাতাল নাম শুনে এখানে আসে। তারা মনে করে, হাসপাতালটির অবকাঠামো অত্যাধুনিক। কিন’ রোগীরা হাসপাতালে এসে এর চেহারা দেখে হতাশ হয়ে পড়ে। মাত্র পাঁচ টাকা টিকিটের দাম শুনেও রোগীদের অনেকে আশ্চর্য হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘ভাঙাচোরা চেয়ারে বসে আমাদের চিকিৎসা দিতে হয়। হাসপাতালে যত আসবাপত্র রয়েছে সব পাকিসত্মান আমলের। শহরের ভেতর হাসপাতালের এমন চিত্র আমাদের ভাবিয়ে তুলে।’
ৎকরম্নণ অবস’া ভবনটিরও। ৬৭ বছর আগে প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো যেমন ছিল এখনো তেমনই রয়েছে। সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি। হাসপাতালের ভবনের ছাদের পলেসত্মরা খসে পড়ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকার হয়ে যায় হাসপাতালের কড়্গগুলো। রোগীদের টয়লেট কয়েক বছর ধরে অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়ে আছে। এতে বেকায়দায় পড়েন সেবাপ্রার্থীরা। একটু বৃষ্টি হলেই ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে আর চারদিকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে সীমানাপ্রাচীর ও নৈশপ্রহরী না থাকায় পুরো হাসপাতাল এলাকাটি অরড়্গিত অবস’ায় আছে। দুপুরে হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মাদকসেবীদেরও ঢুকে পড়তে দেখা যায়।
জানতে চাইলে স্বাস’্য অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক ডা. আবুল কাশেম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘আমেরিকান হাসপাতালটির অবকাঠামো ও অর্গানোগ্রামের বিষয়টি স্বাস’্য মন্ত্রণালয় অবগত আছে। মন্ত্রণালয় কেন এ হাসপাতালটির আধুনিকায়নে পদড়্গেপ নিচ্ছে না তা জানি না। তবে শিগগিরই হাসপাতালটিতে একজন সিনিয়র কনসালটেন্টসহ কিছু জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে।’
জানা যায়, পাকিসত্মান আমলে ১৯৫২ সালে বিশ্ব স্বাস’্য সংস’া দড়্গিণ-পূর্ব এশিয়ায় চর্ম ও যৌন রোগ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ৪টি স্বাস’্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। তারই একটি হলো আমেরিকান হাসপাতাল। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় আড়াই একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় একতলা ভবনের এ হাসপাতাল।
প্রথম দিকে কেবল বিদেশি জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের চর্ম ও যৌন রোগের চিকিৎসার ব্যবস’া ছিল এখানে। পরে সর্বসাধারণের জন্য হাসপাতালটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তখন আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এখানে স্বাস’্যসেবা দিতেন। তবে এটি পরিচিতি পায় আমেরিকান হাসপাতাল নামে।