আমি বাড়ি যাবো

মিলন বনিক

এভাবে বিদায় বলতে নেই।
রতন তলপেটের নিচে গামছাটা চেপে ধরে সাননা দিলো। বাদলকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। থেমে থেমে চোখ দু’টো ঘোলা হয়ে আসছে। মাথার ওপর আকাশটা ঘুরছে। চোখের পাতা দু’টো নাড়াতে পারছে না। শরীরে একটুও শক্তি নেই। নিঃশ্বাস নিতেও খুব কষ্ট হচ্ছে। বাদল রতনের হাত দু’টো চেপে ধরেছে। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। খুব কষ্টে একবার শুধু ঠোঁট নেড়ে বললো, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে রে রতন। শেষবারের মতো একটু ঘুমাতে দে। আমার ভাইটাকে আর দেখা হলো না। রতন চাচ্ছে না বাদল ঘুমিয়ে পড়-ক। নানান কথা বলে মনে সাহস জোগানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে আর কিছুই করার নেই। সবকিছুই ওপরওয়ালার হাতে। যা করার তিঁনিই করবেন।
জায়গাটা নির্জন। ঘন ঝোপঝাড়। কয়েকটা কড়ই, হিজল, তমাল গাছ ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। বড় অশ্বত্থ গাছটা পুরো জঙ্গলটার ওপর ছায়ার মতো ছাতা মেলে ধরেছে। এতো রাতে নদীর পাড়ে এমন ভূতুড়ে জায়গায় ওরা দুইজন মাত্র মানুষ। ভয় ডর নেই। রতনের কাঁধে রাইফেল। বাদলের রাইফেলটা কাৎ করে মাটিতে রেখে রতনের কোলে শুয়ে আছে বাদল। বাদল বাম হাতে পাশে রাখা রাইফেলটা ধরে রেখেছে।
রতনের হাতে টাটকা গরম রক্ত। রক্তের রঙ যে লাল, তা অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না। কাঁধের গামছা, গেঞ্জি চেপে ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করছে রক্ত বন্ধ করার জন্য। রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। গুলিটা লেগেছে কোমরের নিচে ডান উরু বরাবর।
বাদলের কথা বন্ধ হলেই রতন আবার কথা বলে। চুপ থাকলে মনের ভয় বেড়ে যায়। তাড়াতাড়ি নাকে, মুখে, বুকে হাত দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস আছে কি না তা পরিক্ষা করে নেয়। আর কেবল আশ্বাস বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে, এইতো ভোর হয়ে এলো। আর একটু সময় ধৈর্য ধর। পূব-আকাশটা ফর্সা হয়ে উঠলেই আমরা ক্যাম্পে চলে যাবো। ওখানে চিকিৎসার সব ব্যবস’া আছে। ডাক্তার রাতুদা আছেন ওখানে। খুব ভালো মানুষ।
বাদল চুপ। কোনো কথা বলছে না। তার কান পর্যন্ত কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। রতন বার বার হাত দিয়ে দেখছে। বুকটা ধুক ধুক করছে। জান আছে। মনে হচ্ছে জ্ঞান হারিয়েছে। অনেকক্ষণ পর বাদলের জ্ঞান ফিরলো। চোখ খুলে জিজ্ঞাসা করলো,
আমি কোথায়? আমরা জঙ্গলে কেন? রাজীব, মনির, মিজান, টুন্টু ওরা কোথায়? ওরা ঠিকমতো ফিরতে পেরেছে তো?
ওরা ভালো আছে। অপারেশন শেষ করে ওরা ক্যাম্পে ফিরে যাবে। বলল-রতন।
জানোয়ারগুলো মরেছে তো?
হুম, মরেছে। একটাও বেঁচে নেই।
ওই জানোয়ারগুলোর কী হলো?
কোন জানোয়ারগুলোর।
ওই যে, জানোয়ারের বাচ্চা জানোয়ার। নুর হোসেন, খবিরউদ্দিন। আমি সুস’ হলে আগে ওদের খতম করবো।
ওসব এখন ভাবতে হবে না।
সান্ত্বনা দিলো রতন। বাদলকে কথা বলতে দেখে রতন মনে সাহস ফিরে পেলো।
ভোরের ঝিরঝিরে হাওয়াটা বেশ ভালোই লাগছে। কিছুক্ষণ পর আবার নিরবতা। বাদলের মুখে কোনো শব্দ নেই। ঘুম না অচেতন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। রতন একহাতে বাদলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অন্য হাতে যেখান থেকে রক্ত ঝরছে সেখানে চেপে ধরেছে। চুপসে চুপসে রক্ত ঝরছে। গামছা, লুঙ্গি, গেঞ্জি সব ভিজে চুপসে গেছে।
আশেপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা চিঁচিঁ শব্দ। অশ্বত্থ গাছের আড়াল থেকে একটা তক্ষক কিছু সময় পর পর ডেকে উঠছে। মাঝে মধ্যে কয়েকটা নিশাচর পাখির এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে যাওয়ার শব্দ। রতন মনে মনে ঈশ্বরকে ডেকে বলছে, তাড়াতাড়ি যেন সকাল হয়। আমি যেন বাদলকে বাঁচিয়ে তুলতে পারি। রাত এখন কত হবে? আনুমানিক তিনটা।
রতন হিসেব মিলিয়ে দেখছে। রাত বারোটার দিকে অপারেশন শুরু করেছিলো নয়াপাড়া পাকিস্তানি ক্যাম্পে। ক্যাপ্টেন মনসুর ভাইয়ের “ফায়ার” নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে শুরু হলো প্রচণ্ড গোলাগুলি। বৃষ্টির মতো গুলির শব্দ। ক্যাম্পে আটকা পড়ে আছে বাদলের ছোট ভাই ইমরান।
ওরা ইমরানকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো বাদলের খোঁজ খবর পাওয়ার জন্য। ইমরান কিছুই জানতো না। সে বন্ধুদের সাথে ডাংগুলি খেলছিলো। এপথ দিয়েই যাচ্ছিলো নুর হোসেন আর খবিরউদ্দিন। ওদের আসতে দেখে ইমরান বন্ধুদের বললো, ঐ তো রাজাকার আসছে।
শয়তানগুলো ঠিকই ইমরানের কথা শুনে ফেলেছে। খবিরউদ্দিন ইমরানকে কাছে ডেকে বললো,
আমরা দেশের জন্য জান কোরবান করতে পারি। তোর ভাইয়েরা কয়জন মিলে দেশটারে দুইভাগ করতে চায়। এত্তো সহজ! আমরা সাচ্চা মুসলমান। এক কথার মানুষ। দুইকথা বলা আল্লাহ পছন্দ করেন না। রাজাকার হওয়া অত্যন্ত সম্মানের, ইজ্জতের এবং গৌরবের।
তোর ভাই বাদল নাকি মুক্তিযোদ্ধা হইছে? তাচ্ছিল্যের সাথে জিজ্ঞাসা করলো নুর হোসেন।
আমি জানি না।
কই আছে তোর ভাইজান?
জানি না।
ইমরানের সাথে কথাবার্তার একপর্যায়ে নুর হোসেনদের সাথে আরো তিনজন যোগ দিল। ইমরান ওদের চেনে না। এ গ্রামেও কখনও দেখেনি। এরমধ্যে ডাংগুলি খেলা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধুদের কয়েকজন আগাম বিপদ টের পেয়ে ছুটে গিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে পরিসি’তি খেয়াল করছে। রিপন একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে পরিসি’তি বুঝে খবরটা দিতে যাচ্ছিলো রতনদা’কে। তখনিই নুরহোসেন বললো,
চল, আমি জানি তোর ভাই কোথায় আছে। তোকে নিয়ে যেতে বলেছে।
একথা ইমরানের মোটেও বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা নিশ্চয় ঐ শয়তানগুলোর ছলচাতুরি। অন্যকোনো কুমতলব আছে। ইমরান প্রতিবাদ করলো,
না, আমি যাবো না। দরকার হলে ভাইয়া নিজে আসবে।
আসবে কোত্থেকে? সে তো মরতে বসেছে।
আঁৎকে উঠলো ইমরান।
ভাইয়ার কী হয়েছে?
তেমন কিছু না। পাকসেনাদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে পায়ে গুলি লেগেছে। তোকে যেতে বলেছে। হয়তো বাঁচবে না। তোকে দেখতে খুব মন চাইছে বাদলের।
ছোট্ট ইমরানের বুকটা কেঁপে উঠলো। ইমরান জানে, এ লোকগুলো শয়তান। ক’দিন আগে বন্ধু রাজীবের বাড়িটা আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। লুটপাট করেছে। রাজীবের মা-বোনদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে। রাজীবরা হিন্দু বলে ওদের শাস্তি দিয়েছে। চিৎকার করে বলছে, ঐ মালাউনের বাচ্চারা, এবার কোথায় যাবি। দেখি ইণ্ডিয়ার কোন বাপ তোদের বাঁচায়? রাজীবের কাকা, ঠাকুরদা’কে উঠোনে দাঁড় করিয়ে পেছনে হাত বেঁধে গুলি করে মেরেছে। কী নির্মম সেই দৃশ্য! ইমরান দূরে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে এই নির্মম দৃশ্য দেখেছে।
ইমরান জোর দিয়ে বললো-
তোমরা খারাপ। আমি তোমাদের সাথে যাবো না।
তুই যাবি না, তোর বাপ যাবে।
এই বলে ওরা ইমরানকে ঘাঁড় ধরে টেনে নিয়ে গেলো। যাবার সময় ইমরান বন্ধুদের উদ্দ্যেশে চিৎকার করে বললো, আমি গেলাম। ফিরে না আসলে মনে করবি, ওরা আমাকে মেরে ফেলেছে।
রিপনের মুখে খবরটা শুনে বাদল আর সি’র থাকতে পারেনি। এপাড়া ওপাড়া মিলে খবরটা চাউর হতে বেশি সময় লাগেনি। বাদলও তার সঙ্গী যোদ্ধাদের নিয়ে ইমরানকে উদ্ধার করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো।
বাদল কতক্ষণ ঘুমিয়েছে কে জানে। রতন বার বার নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখছে। হালকা নিঃশ্বাস এখনও আছে। ধীরে ধীরে পুবের আকাশটা ফর্সা হয়ে আসছে। ভোর হবার আগে যেভাবে হোক এই স’ান ত্যাগ করতে হবে। রতন বার বার ভাবছে, বাদলের অতটা সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। শত হোক আদরের একমাত্র আপন ছোটো ভাই। ছোট ভাইকে বাঁচানোর জন্য হুট করে এমন ঝুঁকি নিতে হলো।
বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্যও ঘায়েল হয়েছে। রতন ছিল বাদলের কাছাকাছি অবস’ানে। গুলি লেগে বাদল যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়লো, কমান্ডারের নির্দেশে বাদলকে নিয়ে এই নির্জন জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়েছে। এর পর কী হলো, এখনও কেউ কিছু জানে না।
হঠাৎ একটা বড় ঢেঁকুর তুলে বাদল মাগো বলে কঁকিয়ে উঠলো। রক্ত কিছুটা ধরে এসেছে। তবে বাদলের শরীরটা মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা। একেবারে নিস্তেজ। বুকে হাত দিয়ে দেখলো, একটু একটু ধুক ধুক করছে। অন্ধকারও একটু একটু কাটতে শুরু করেছে। এবার বাদল পরিষ্কার কথা বললো।
আমার ভাই কই? আমার ভাই। ওর সামনে পরীক্ষা। কত করে বলেছি, পরীক্ষায় ভালো করতে হবে। কিছুই শোনে না। সারাক্ষণ শুধু মার্বেল, ডাংগুলি, ঘুড়ি ওড়ানো, কানামাছি এসব নিয়ে আছে।
তোর ভাই আছে। দেখিস ও ঠিকই লেখাপড়া করে অনেক বড় হবে।
তাইতো। হবে না আবার? দেখতে হবে না কার ভাই? ঐ জানোয়ারের বাচ্চাগুলো আমার জন্য আমার ভাইকে মারতে চেয়েছিলো। আমার ভাইকে নিয়ে আয়। আমি একটু দেখি।
ও ঠিকই আসবে। আগে তোকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।
আমার কিচ্ছু হয়নি। প্লিজ, আমার ভাই ইমরানকে এনে দে। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
আগে তুই সুস’ হয়ে বাড়ি যা। দেখবি ও ঠিকই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি বাড়ি যাবো। আমি বাড়ি যাবো।
এই বলে ছোট্ট শিশুর মতো কেঁদে উঠলো বাদল। তারপর আর কোনো সাড়া শব্দ নেই। পর পর আরো ক’টা ঢেঁকুর উঠলো।
পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের পানিতে হঠাৎ ছপাৎ ছপাৎ শব্দ শুনতে পেলো রতন। ভাবলো শত্রুসেনা নয়তো? খুব সাবধানে নিজের কোল থেকে বাদলের মাথাটা নামিয়ে রাখলো। রাইফেলটা হাতে নিয়ে সতর্ক অবস’ানে থেকে খালের পাড়ে উঁকি দিলো। নাহ! মুক্তির দলের লোকেরা ফিরছে। নৌকা থেকে জয়বাংলা ধ্বনি উঠলো। রতন আরো কাছে খালের পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নৌকা থামানোর জন্য ইশারা করলো। নৌকা ভিড়লো। নেমে আসলো সবাই। ধরাধরি করে বাদলকে নৌকায় তোলা হলো।
নৌকার পাটাতনে আরও একটা মানুষ শুয়ে আছে। তার শরীরটা লাল সবুজের চাদরে ঢাকা। পাশে শুইয়ে দেওয়া হলো বাদলকে। দুই ভাই পাশাপাশি শুয়ে আছে। কেউ কাউতে চিনতে পারছে না। নৌকা ছুটে চলছে পূবের স্রোতে। যেদিকে আকাশটা সবেমাত্র লাল হয়ে আসছে।