‘আমি গুরুতর অসুস্থ এটা কোর্টকে জানাবেন’

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম

‘আমি গুরুতর অসুস’ এটা কোর্টকে জানাবেন’, তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তাঁর আইনজীবী দেখা করতে গেলে তিনি একথা বলেছিলেন। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা প্রদানের কথা বলে আসছে । তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা প্যারালাইসিস ও দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশংকা করে একই কথা বলেন। সম্প্রতি ব্যক্তিগত চিকিৎসকেরা তাঁর সাথে আবার দেখা করতে গেলে খালেদা জিয়ার স্ট্রোকের ব্যাপারে জানতে পারেন। হঠাৎ বেহুঁশ হয়ে ফ্লোরে পড়ে কিছুক্ষণ অজ্ঞান ছিলেন। তখন কি ঘটেছিল মনেও করতে পারছেন না তিনি।
দেশের একটি বৃহৎ দলের চেয়াপার্সন ও তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এক্ষেত্রে জেলকোডের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব। ওয়ান ইলেভেনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন । খালেদা জিয়ার পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়াটা সরকারের উদারতার পরিচয় বহন করবে। বেগম খালেদা জিয়া সেনা শাসনের সময়ও জেল খেটেছেন তবে এমন নাজুক পরিসি’তির শিকার হননি। বয়স, রোগ, দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকা এসবের চিন্তা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। তিনি জেলে, তাঁর ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘদিন মামলার খড়গ নিয়ে লন্ডনে বাস করছেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে প্রায় বারো বছর ক্ষমতার বাইরে । মামলা -গ্রেফতার, জেলের কারণে আন্দোলনে তেমন জোর নেই। তাঁর কারারুদ্ধতার সময়ও দল তেমন জোরালো ভূমিকা নিতে পারেনি। ঈদের পর কঠোর আন্দোলনের কথা কতটুকু বাস্তব তা দেখতে আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ অথবা আইনের পথে মুক্তি । যদিও আইনের পথে মুক্তি সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া সম্ভব নয়। তবে ভেতরে ভেতরে যদি সরকারের সাথে একটি ঐক্য হয়ে যায় সেটি ভিন্ন কথা। বাংলাদেশে ‘অসুস’’ সংস্কৃতির প্রচলন তেমন সুখকর নয়। ৫ জানুয়ারির আগে এরশাদ অসুস’ নয় দাবি করেও সিএমএইচ এ ভর্তি হতে হয়েছিল। বিচারপতি এস কে সিনহা অসুস’ নয় দাবি করেও অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিতে বাধ্য হন। আমাদের দেশের অনেক দাগী আসামি অসুস’ না হয়েও মাসের পর মাস হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আয়েশী জীবন যাপন করেন। সেখানে বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত (তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মতে) করতে অসুবিধা কোথায়।
নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আমাদের দেশের রাজনীতির চরিত্রটা বেশ জটিল হয় ও রং অবিশ্বাস্য গতিতে পাল্টায়। মানুষের মনে শংকাটাও বেড়ে যায়। রাজনৈতিক নেতা ও দলের দৌড়-ডিগবাজিও বেড়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পাল্লাভারি করতে ছোট বড় দলগুলোকে নিজেদের দলে ভেড়াতে তৎপরও হয়। জোটের রাজনীতি নতুনত্ব পায়। এবারও ব্যতিক্রম নয়। এরশাদ ৫৮ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোটের নামে শোডাউন করেছেন। তবে এরশাদের জোট ও সরকারের শরীক, বিরোধী দল এসব নিয়ে দেশের মানুষ, নিজ দল, সরকার, জোটের নেতাদের মধ্যে রয়েছে সমালোচনা ও শংকা । তিনি কখন কি বলেন, করেন বোঝার উপায় নেই।
বড় দুটি দল ছোট ছোট দল ও নেতার পাহাড়সম আবদার মেটাতে গিয়ে বিব্রতকর পরিসি’তির সম্মুখিন। ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দোজা, মান্না, ড জাফর উল্লাহদের যুক্তফ্রন্ট তাদের সঠিকভাবে যুক্ত করতে পারেনি। দেশবাসী কতটা সে যুক্তফ্রন্টে যুক্ত হবে তা সহজে অনুমেয়। আছে বামপনি’দের জোটের তৎপরতা। বামপনি’রা জোট করুক আর একা থাকুক তাঁরা কখনো হালে পানি পাবে বলে মনে হয় না। বড় দলের সিঁড়ি বেয়ে কয়েকজন বামপনি’র ক্ষমতার স্বাদ নেয়াটা তাই প্রমাণ করে। অরাজনৈতিক দল হয়েও হেফাজত যে নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর তা অস্বীকার করার উপায় নেই। দোয়া কামনায় হেফাজতের আমীরের কাছে দলীয়, নেতা, মন্ত্রীদের দৌঁড়ঝাঁপ তা বলে দেয়। ধর্মনিরেপক্ষ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সমমনা বামপনি’দেরর সমালোচনা উপেক্ষা করে হেফজতকে অনেকটা অনুকূলে এনেছে।
আমাদের দেশের নির্বাচনে ভারতের একটি প্রভাব রয়েছে । তাই নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বড় দুটি দলের ভারত দর্শন বেড়ে যায়। আওয়ামী লীগের বড় একটি প্রতিনিধি দল ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর এবং ভারতবিরোধী বলে খ্যাত বিএনপির তিন নেতার হঠাৎ ভারত সফরে মানুষের মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে। দলের চেয়ারপার্সন দুর্নীতির দায়ে জেলে, তারেক রহমান লন্ডনে ।
তারেক রহমানের পাসপোর্ট ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে তুমুল বিতর্কে বিএনপি শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে যে তারেক রহমান লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন । তাহলে দীর্ঘদিন চিকিৎসার কথা বলে মানুষকে ভুল বুঝানো কেন?। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতার যুগে এভাবে মিথ্যার আশ্রয় কিছু অন্ধভক্ত ছাড়া জনগণ ভালভাবে নেয়নি। আর রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়া মানে দেশের নাগরিকত্ব বর্জন নয়। নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও এখনো নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কোন সমঝোতা না হওয়ায় বড় দুটি দলের মাঝে সাংঘর্ষিক অবস’া যেমন বিরাজ করছে তেমনি আবার পর্দার আড়ালে সমঝোতার কথাও ভাসছে। বড় দুটি দল নির্বাচনের দৌড়ে বেশ এগিয়ে আছে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে যেভাবে সরকার চাপে ছিল, তারানকো হাতে ফাইল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন বর্তমানে তেমন চাপ ও পরিবেশ নেই।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারকে চিঠি লিখে প্রশংসা করেছে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীন, জাপান, ভারত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া সহ বিশ্বের রথী মহারথীদের সাথে সরকারের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। মুসলিম দেশগুলোর সাথে বর্তমান সরকারের সাথে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে ভাল সম্পর্ক বিরাজ করছে । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন, মানবতার কথা উচ্চারিত হচ্ছে, প্রশংসায় ভাসছে সরকারি দল, তাতে আগের মত চাপ প্রয়োগ করবে বলে মনে হয় না।
তাছাড়া বিএনপিও আগের সেই অবস’ানে নেই যে দেশ বিদেশ যোগাযোগ করে দেশের ভেতরের নেতা, কর্মীদের উজ্জীবিত করে আন্দোলনে ফেরাতে পারবে। এখন প্রশ্ন হল বিএনপি যদি আন্দোলন করে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করতে না পারে তাহলে দেশে কি নিরেপক্ষ নির্বাচন হবে না?। বিএনপি ছাড়া জেনারেল এরশাদকে বিরোধী দল বানিয়ে একটি নির্বাচন কি দেশে সম্ভব? নৈতিকতায় সায় দেবে?। আওয়ামী লীগ কি সেই পুরোনো পথে হাঁটবে?। উন্নয়নের গণতন্ত্র কি একটি দেশের অবকাঠামোগত ও মৌলিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। এ কথা ঠিক, বিএনপি’র শক্তি নেই যে আন্দোলন করে দেশে নিরেপক্ষ নির্বাচনে সরকারকে বাধ্য করবে। দলের অস্তিত্ব রক্ষা, একযুগ ক্ষমতার বাইরে থাকার টেনশনে অসি’র দল। শুধুমাত্র বিএনপি’র জন্য দেশে নির্বাচন?। মোটেও নয়, আমরা যদি গত দশ বছরে আলোচনা করি, বিএনপি জনগণের ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারেনি। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এখন আছে নেত্রীর মুক্তি ও নির্বাচনের ট্রেন ধরার কূটকৌশলে।
গণতন্ত্রের একটি দেশে নিরেপক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই। নির্বাচন মানে আমরা স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গিবাদ, দুর্নীতিবাজদের নির্বাচিত করব তা নয়। তবে কারো জোর করে ক্ষমতায় থাকার জন্য বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়নি। বঙ্গবন্ধু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাতকোটি বাঙালিকে নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামে নেমেছিলেন প্রবল দেশপ্রেম ও গণতন্ত্রের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তাঁর হিমালয়সম দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। যে দেশে দীর্ঘ নয় মাসের বিরল সশস্ত্র সংগ্রামে স্বাধীনতার অর্জন আছে সে দেশে একটি সুষ্ঠু, নিরেপক্ষ ও অংশগ্রহণমুলক নির্বাচন কামনা মোটেও অমূলক নয়।