আমাদের বন্ধু

দীপক বড়ুয়া

আমরা সবাই এক স্কুলে পড়ি না।
খেলার মাঠে সবাই এক সাথে খেলি। আমি, জহির, বিপুল, অমিত, মারুফ, আজিজ, কামাল, উৎপল সবাই বন্ধু। ভারি দল, সবাই বলে। আমরা সবাই এখনো ছোট। দুষ্টুমিতে সেরা।
আমাদেরকে পাড়ার সবাই ভালোবাসে।
পাড়ার প্রতিটি কাজে আমরা সাহায্য করি। যেমন কারো ঘরে পানি নেই, ওয়াসা থেকে পানি এনে দেই। বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ অফিসে খবর দিই। এভাবে অনেক কাজে সাহায্য করি।
আমরা বন্ধুরাও সবাই ভালো।
কেউ পরীক্ষায় পাশ করলো। আনন্দ করি। ফেল করলে কেউ তাকে সান্তনা দিই।
বয়সে বড়ো জহির। ফর্সা। সারাক্ষণ হাসি মুখ। কথায়, কাজে, খেলায় সবকিছুতে। বয়সে বড়ো হলে কি? বন্ধুর মতো চলে। সেদিন শুক্রবার।
জহিরের বাসার ছাদে গল্প হচ্ছিলো। কতো কী?
বিপুল জহিরেরও বড়ো। তাই সবাই বিপুলদা ডাকে। আমিও। বিপুলদের বাড়তি একটি গুণ আছে। সবাইকে তুমি বলে না। জহিরকে তুমি বলে কথার ফাঁকে বিপুল দা বলে, জহিরকে লক্ষ্য করে।
– জহির একটা কথা বলবো?
– কি কথা?
– চলো, আজ সবাই স্বপ্নের কথা বলবো। প্রত্যেকেই স্বপ্নের কথা বলবো। সবাই শুনবো।
স্বপ্নের কথায় জহির উপরে লাফ দেয়। সহাস্যে- দারুণ তো।
– বিপুল। শোনো। আমি আমার স্বপ্নের কথা বলি। সবার আগে কিন্তু! আজিজ, কামাল, অমিত, উৎপল রেগে বলে-
– কেন? তুমি আগে বলবে?
ওদের কথায় আমি বলি, থাকনা। জহির ভাই যখন আগে বলতে চায় বলুক। সবাইতো বলবো। ক্ষতি কি?
আমার কথার গুরুত্ব দেয় সবাই। চুপ হয়ে যায়। ফাঁকে বিপুল দা বলে,
– জহির বলো?
আমতা আমতা করে লাজে ভয়ে বলে, আমার খুব ইচ্ছে- থেমে যায় জহির। সবাই হাসে। বিপুল দা বলে, সবাই হাসছো? হাসার কি আছে?
টুক করে জহির বলে, আমি স্বপ্নের কথা বলবো, কিন্তু তারপরও একটি কথা আছে।
কামাল প্রশ্ন করে- পরে আবার কি কথা?
অমিত বলে ওঠে- সব দুষ্টুমি ওর।
আমি বলি, আমরা সব সময় জহিরকে বকাঝকা করি। এটা ঠিক নয়। বিপুল দা বলে তুই থাম। মাঝপথে তোর কথা বলার প্রয়োজন কি?
জহির বলো, কি বলতে চাও?
– আমার প্রথম স্বপ্ন একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক হবো। কি বলো? দ্বিতীয় স্বপ্ন- যেহেতু স্বপ্ন বইয়ের সম্পাদক আমি, তাই স্বপ্ন বের হবার পর, আমাকে স্বপ্ন দা ডাকবে। কি খুব মজা হবে না?
হো: হো: হো: হা: হা: হা: মজা! না ছাই!
কথা শুনে সবাই হাসতে শুরু করে। লজ্জায় জহির লাল হয়ে যায়। বিপুলদা সবাইকে থামিয়ে বলে- এটা তো ভালো কথা। এমনিতে জহির ভাই সবার বড়ো। তাছাড়া স্বপ্নদা, মিষ্টি নাম। সবার ডাকতে কষ্ট হবে। ঠিক আছে, আজ থেকে সবাই জহিরকে স্বপ্নদা ডাকবো।
বইমেলার দিন স্বপ্নের ম্যাগাজিন, স্বপ্ন ওড়ে ডানা মেলা বের হবার আগে থেকেই স্বপ্নদা ডাকতে শুরু করি। জহিরের কি যে খুশি। আমি বই মেলায় যাবার সময় জহির ভাইয়ের বাসায় পৌঁছে দোর বেলের সুইচে হাত দিই। বাজে না। বিদ্যুৎ নেই হয়তো। বাইরে থেকে চিৎকার করি, স্বপ্নদা স্বপ্নদা স্বপ্নদা, এ্যাই স্বপ্নদা।
আমার চিৎকারে দরজা খোলেন জহিরের মা। দেখে ধমক দেয়। বলে, স্বপ্নদা কে। দীপক, স্বপ্নদা কে? এই নামে কেউ থাকে? তোরা জানিস না। অসময়ে চিৎকার করছিস। স্বপ্নদা স্বপ্নদা।
ততক্ষণে জহির কাপড় পরে দরজায় দাঁড়ায়।
জহিরকে দেখে মা বলে, কোথায় যাচ্ছিস। জহির?
– বই মেলায় মা।
– এখানে স্বপ্নদা কে?
– আমি মা। বন্ধুরা সবাই আমাকে, সবার বড়োতো, তাই স্বপ্নদা নামে ডাকে।
– সুন্দর সম্বোধনতো। ভারি মিষ্টি। ঠিক আছে, ঠিক আছে।
– মা, তাছাড়া বই মেলায় স্বপ্নের একটি ম্যাগাজিন বের করছি আমার সম্পাদনায়। নাম- স্বপ্ন ওড়ে ডানা মেলে।
– ও তাই, আজ থেকে তুই স্বপ্নদা হয়ে গেলি? ভালো! খুব মজার।
আমি, স্বপ্নদা মুচকি হেসে মেলার দিকে পা বাড়াই।