আমাদের প্রাণের মেলা ‘অমর একুশে বইমেলা’

রায়হান আহমেদ তপাদার

অমর একুশে বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। বাংলাদেশে হাজারো মেলার মাঝে বইমেলার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সাহিত্য ও বুদ্ধিভিত্তির বিকাশ ঘটছে মূলত এ মেলাকে কেন্দ্র করে। বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি বোধ ও ঐতিহ্য হলো অমর একুশে বই মেলার ভিত্তি। লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের কাছে অমর একুশে বইমেলা এক সেরা উৎসব। সবারই মিলন মেলা বাংলা একাডেমির বই মেলা। এদেশের সকল শ্রেনীর পাঠক সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে কখন বসবে অমর একুশে বইমেলা কবে বসবে বাঙালির মিলন মেলা।ভাষা আন্দোলন, বাংলা একাডেমি আর একুশের বইমেলা একই সূত্রে গাঁথা। একুশের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ফসল বাংলা একাডেমি। একুশে বইমেলা বিকশিত হয়েছে বাংলা একাডেমিকে কেন্দ্র করে। নবগঠিত বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক সাহিত্যিক জাগরনের প্রথম প্রকাশ অমর একুশে বইমেলা। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ একটি দিন একুশে ফেব্রুয়ারি কে ঘিরে রয়েছে বাঙালির দীর্ঘকালের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের এই মাসেই ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রস্তুত হচ্ছিল ছাত্রজনতা। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সমর্থন দিয়েছিল আপামর বাঙালি। দিন যত যেতে থাকে ভাষা আন্দোলন তত গতি পেতে থাকে। বায়ান্নর অমর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার দামাল ছেলেরা বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। গড়ে তুলেছিল প্রবল প্রতিরোধ। শুরু করেছিল আমরণ সংগ্রাম।
এছাড়া বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষায় রূপ দিতে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল অনেকে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ দিবসে যোগ হয় ভিন্ন মাত্রা। দিনটি পালিত হতে থাকে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, ব্যাপক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে। দেশ-বিদেশে অবস’ানরত বাঙালি ও তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালে মহান একুশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। একই বছর ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। ফলে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের নাম। এরপর ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে ভাষাশহীদ দিবসের মর্যাদা। বেগবান হয় আবহমান বাংলার ঐতিহ্য; একুশে ফেব্রুয়ারি হয় বিশ্বনন্দিত। ২০০০ সাল থেকে সারা বিশ্বে একুশে ফেব্রুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে।
আন্তর্জাতিকভাবে বাংলা ভাষা আজ বিশ্বে চতুর্থ স’ানে অবস’ান করছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পর থেকে একুশের গ্রন’মেলাও এক নতুন ধারায় প্রবেশ করতে থাকে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং অমর একুশের গ্রন’মেলা একই সূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৮ বইমেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কালপর্ব ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে বইমেলা ততদিনে মাসব্যাপী একটি উৎসবে রূপ পেয়েছে। তবে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে এসে মেলার বারোয়ারি রূপটি এতটাই প্রকট হয়েছিল যে স্টলগুলো থেকে উচ্চস্বরে বাজানো কবিতা ও গানের ক্যাসেটে কান পাতা দায় ছিল। ভেঁপু-বাঁশির সুর শোনা যেত টিএসসি কিংবা দোয়েল চত্বরে পৌঁছার আগেই । পুরো শাহবাগ থেকেই শুরু হয়ে যেত শিল-পাটা থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের পসরা।
সম্ভবত ১৯৯৭ সালে বইমেলা কে শুধুই বইয়ের মেলায় রূপান্তরের একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমির সেই সময়কার মহাপরিচালক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনকে উদ্যোগটা সফল করতে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যায়। আমিও ঠিক ওই বছর বইমেলা প্রতিবেদন লিখে ভোরের কাগজে চাকরি পাওয়ার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হই। আমার মনে আছে বাংলা একাডেমির ছোট্ট চত্বরেই সেবার বইমেলাটি বেশ বড় লাগছিল। মেলা শুরুর দু-চার দিনের মধ্যেই আমি একটা প্রতিবেদন লিখেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল কোকিলেরও ডাক শোনা যায়। মহান ভাষা আন্দোলনের স্বাক্ষর হিসেবে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি জুড়ে চলবে একুশের বইমেলা। এ মাসটির জন্যই যেন পুরো একটি বছর অপেক্ষা করে দেশের বাংলা ভাষাপ্রিয় মানুষ। লেখক, প্রকাশকরাও একুশের মেলায় তাদের শ্রেষ্ঠ বইটি উপহার দিতে নিরন্তর কাজ করে যান।
একুশের গ্রন’মেলায় বিভিন্ন স্টলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অংশের প্রবীণ-নবীন লেখকের নানাধরনের বইয়ের পসরা বসে। মেলায় সমবেত হন বাংলাদেশের বাংলাপ্রেমী লেখক, পাঠক। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তারপরও স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা বায়ান্নর আত্মত্যাগের অভিযাত্রার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি; বরং ধীরে ধীরে হারাতে বসেছি আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য, কৃষ্টি। পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণে আমাদের অর্জিত গৌরবও অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে আগ্রহী নতুন প্রজন্ম। বাংলা গান, বাংলা চলচ্চিত্রে তাদের তেমন উৎসাহ কম। বছর ঘুরে আবার এলো বাঙালির প্রিয় মাস ফেব্রুয়ারি; শুরু হলো অমর একুশে গ্রন’মেলা।
এবার বেশকিছু আগেই প্রকাশকদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের নির্ধারিত স্টল বা প্যাভিলিয়ন। অমর একুশের গ্রন’মেলার পরিধি সমপ্রসারিত হয়ে বাংলা একাডেমির চত্বর ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অবধি বিস্তৃত হয়েছে।অমর একুশের গ্রন’মেলাকে এ অবস’ায় পৌঁছতে পেরোতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সেকালের বর্ধমান হাউজ আজকের বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের বটতলায় একটুকরা চটের ওপর চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত আজকের মুক্তধারা প্রকাশনী কলকাতা থেকে আনা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতে অবস’ানকারী বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা মাত্র ৩২টি বই নিয়ে যে একুশের বইমেলার শুভযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ অনেক বিস্তৃত। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি ১৫ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি এক সপ্তাহের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে বই বিক্রি করে একুশের বইমেলার ধারা অব্যাহত রাখে এবং ১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একাডেমি জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করে, যা উদ্বোধন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রকাশকদের জন্য স’ান নির্দিষ্ট করে একুশের বইমেলার আয়োজন করা হয় এবং ১৯৭৯ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। সময়ের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহান একুশের বইমেলা আজকের স্বকীয়তা নিয়ে দেশব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করে। এবার একুশে গ্রন’মেলা বাংলা একাডেমি চত্বর ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমপ্রসারিত হওয়ায় এর ব্যাপকতা সব বাংলা সাহিত্যপ্রেমীর মনে আশার সঞ্চার করে।
উল্লেখ্য সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি বাংলাদেশের অফিস-আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে। উপরন’ কখনও বাংলা ভাষা হচ্ছে অনাদৃত, অবহেলিত। দেশজুড়ে আজ সর্বত্র ইংরেজি সাইনবোর্ডের ছড়াছড়ি। তাছাড়া বিজ্ঞাপন, প্রচারপত্রে বাংলা ব্যবহারে চরম উদাসীনতা লক্ষণীয়। দেশে প্রকাশিত, মুদ্রিত বাংলা বইয়ে অসংখ্য ভুলভ্রান্তি এবং অসংগতি চোখে পড়ে। বাংলা বানানেও আজ অবধি প্রতিষ্ঠিত হয়নি একটি জাতীয় মান। তারপরও ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া ভাষাশহীদদের কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করার নানা আয়োজন, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের গ্রন’মেলা থেকে বয়সনির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের অগণিত বাংলা বই কেনা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া বাংলার ঐশ্বর্যের মূল্য অনেক।
আগামীতে বইমেলার গুণমানে বৃদ্ধি পাবে এর বিশালতা। দিন দিন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বাংলা সাহিত্যচর্চা।বাংলা ভাষা সাহিত্যে দেশে অনেক বিশ্বমানের লেখক থাকা সত্ত্বেও আমাদের সাহিত্য এখনও বিশ্বে তেমন সুপরিচিত নয়। তাই বাংলা ভাষার সাহিত্যকে বিশ্বের পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দিতে মাতৃভাষা চর্চা, গবেষণাসহ বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলায় লিখিত ভালো বইগুলো বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় অনুবাদের ওপর জোর দিতে হবে। তেমনি বিদেশি বিভিন্ন উন্নতমানের বইকে বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ নিতে হবে। বালাদেশের একুশের গ্রন’মেলাকে আন্তর্জাতিক বইমেলায় রূপ দিতে এখানে বিদেশি প্রকাশকদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমির বিশেষ উদ্যোগের বিকল্প নেই।
শুরু হওয়ার পর থেকে অমর একুশে বইমেলা আপামর বাঙালীর কাছে প্রাণজোয়ার সৃষ্টিকারী এক মেলায় পরিণত হয়েছে।বাঙালী লেখক, প্রকাশক এবং পাঠকদের কাছে বইমেলা এক মিলনমেলা। বইমেলায় জড়ো হতে থাকে দুর-দুরান্তের চেনা মুখগুলি। ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারী পার হলে ভাঙে এ মিলন মেলা। বইমেলা আমাদের অন্তরে যে বন্ধন তৈরি করে তা ভাঙে না কখনই। দেশের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। অনুপ্রেরণা জোগায়। বাঙালি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে অমর একুশে বইমেলা আবার কবে ফিরে আসবে এই অপেক্ষায়।