আমাদের পরিবহন পরিবেশ

ঞ্যোহলা মং

বড় শহরে বাস করেন, কিন্তু রিকশাচালকদের সাথে ঝগড়া করেননি খোঁজ পাওয়া বেশ কঠিন হবে। নিম্নমধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের প্রধান বাহন রিকশা। অফিস বা কাজে যাওয়ার জন্য যেমনি রিকশা ব্যবহার করতে হয় তেমনি নিত্যদিনের বাজার করা থেকে শুরু করে কাছাকাছি বেড়ানোর কাজেও রিকশার বিকল্প নেই। দিনে যতবার বের হতে হয়, ততবার রিকশার ভাড়া ঠিক করতে হয় আর গন্তব্যে পৌছে ভাড়া নিয়ে অনেক সময় ঝগড়াও হয়।
সাপ্তাহিক ছুটি আর দিনের কিছু সময়ে রিকশা পাওয়া সহজ হলেও বৃষ্টির দিন, অফিস সময়ে, অসময়ে রিকশা পাওয়া সহজ নয়। সুযোগ বুঝে রিকশাওয়ালারা ভাড়া বাড়িয়ে দেন। অনেক সময় ভাড়া ঠিক করে যাওয়া হলেও পৌঁছার পর বেঁকে বসেন। নানা অজুহাতে অধিক ভাড়া চেয়ে থাকেন। আবার নিত্যদিনের যাওয়া আসা রয়েছে, এলাকায় ভাড়াটি সবাই জানে, যেখানে এক রকম নির্ধারিত হয়ে আছে ভেবে, ভাড়া জিজ্ঞেস না করে উঠলে পৌছার পর ভাড়া মেটাতে গিয়ে আবিস্কার করবেন মানছেন না, দিতে হবে দশ থেকে বিশ টাকা বেশি। এমন দৃশ্য শহরে সর্বত্র দেখা যাবে। রিকশাচালক আর যাত্রীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি নানা অভিযোগ শুনা যায়। রিকশাচালকরা বলেন, যাত্রীরা ভাড়া ঠিকমত দেয় না, পৌঁছার পর কৌশলে অনেকে পালিয়ে যান, ভাংতি নেই আসছি বলে আর আসেন না, অনেকক্ষণ দাঁড় করে রেখে ভাড়া ঠিকমত মেটানো হয় না ইত্যাদি। অনেককে পাওয়া যাবে যত্নশীল, শিক্ষিত এবং নির্ধারিত ভাড়াই নিয়ে থাকেন। সমাজে বিরাজমান বাস্তবতার কারণে দারিদ্র হয়ে কিছু লোক শহরে রিকশা চালক হতে আসেন। অনেক রিকশাওয়ালাদের থাকে না কোন প্রশিক্ষণ, ট্রাফিক জ্ঞান, শহরের পরিবেশ আর যোগাযোগের অভিজ্ঞতা।
শুধু রিকশাচালকদের সাথেই বা কেন, প্রায় প্রতিটি গণপরিবহনের যাত্রীদেরকে প্রতিনিয়ত ঝগড়া, বাকবিতণ্ডা করে যেতে হয়। সিএনজি চালকরা তাদের মতো না হলে যেতে চায় না। অনেক সময় অধিক ভাড়া দিয়েও পাওয়া যায় না। লেগুনাতে গেলেও একই চিত্র, তিন থেকে চারজন বসার জায়গায় বসতে হয় ছয়জনকে আর বাস ভাড়া নিয়ে ঝগড়া যাত্রীদের জন্য একটি বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে নারীদের জন্য বাস এখন এক আতংকের নাম। দেশে গণপরিবহণ নিয়ে কোন নীতিমালা, আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় সবাইকে প্রায় প্রতিদিন কথা কাটাকাটির মধ্যদিয়ে যেতে হয়। নীতিমালা থাকলে ভাড়া নির্ধারণ করা থাকলে যাত্রীদের সময় শুধু নয়, অনেক অর্থ অপচয় রোধ হতো, মানুষের সাথে মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় থাকতো, যানজট নিরসনেরও সহায়ক হতো। ফিলিপাইনে ঐতিহ্যবাহী জিপনী একজন মাত্র চালিয়ে থাকেন। ভাড়া নিয়ে তর্ক হতে দেখা যায় না। যেখানে সেখানে হর্ন বাজানো হয় না। বড় বড় শপিং মলের সামনে ট্যাক্সি লাইন করে আসতে থাকে আর যাত্রীরা একে একে যেতে থাকেন। অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ডে গণপরিবহনগুলো আরো উন্নত আরো সহজ। ভাড়া নিয়ে তর্ক করার সুযোগ থাকে না। সবকিছুই নির্ধারণ করা থাকে। প্রতিবেশি দেশ ভারত ও নেপালেও ট্যাক্সি সার্ভিস আমাদের দেশের চাইতে অনেক ভাল বলতে হবে। তবে কেন আমাদের পরিবহন ব্যবস্থাকে নিয়মনীতির আওতায় আনা হবে না? রিকশাওয়ালাদের যেহেতু শারীরিক পরিশ্রম বেশি হয় সেহেতু তাদের একটি নির্দিষ্ট জোন করে দেয়া উচিত। জোনভিত্তিক রিকশাগুলো চলাচল করতে ভাড়াও নির্ধারণ করে দেয়া দরকার। অনুরূপভাবে সিএনজি, বাস আর ট্যাক্সিগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। ভাড়ায় চালিত প্রত্যেক বাহনগুলোকে একটি নিয়মের মধ্যে আনতে মালিক সমিতিগুলোরেও এগিয়ে আসা উচিত। নিয়মনীতির মধ্যে পরিচালিত না হওয়ার ফলে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আমাদের শহরগুলোকে বাসযোগ্য পরিবেশ করতে অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে ধার্বিত হওয়া শুধু নয়, দোকানদার আর হকারদের দ্বারা দখল হওয়া পথচারীদের রাস্তা উদ্ধারের পাশাপাশি সকল গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নিরাপদ, দুর্ভোগমুক্ত পরিবেশ তৈরীতে আশু পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।

লেখক: উন্নয়নকর্মী।